এবার বিশ্ব দরবারে মিয়ানমারের মিথ্যাচার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ অং সাং সু চি বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন। সমালোচনা এড়াতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন তিনি। কিন্তু নিজে না গেলেও গত মঙ্গলবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি যেসব মিথ্যাচার করেছেন সেই একই মিথ্যাচার এবার বিশ্ব দরবারে করল তার সরকারের উপরাষ্ট্রপতি।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন মিয়ানমারের উপরাষ্ট্রপতি হেনরি ভ্যান থিও। ছবি: এএপফি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ অং সাং সু চি বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন। সমালোচনা এড়াতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন তিনি। কিন্তু নিজে না গেলেও গত মঙ্গলবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি যেসব মিথ্যাচার করেছেন সেই একই মিথ্যাচার এবার বিশ্ব দরবারে করল তার সরকারের উপরাষ্ট্রপতি।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সু চির বদলে যোগ দিয়েছেন উপরাষ্ট্রপতি হেনরি ভ্যান থিও। আজ বৃহস্পতিবার তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে রাখাইন রাজ্যের চলমান অবস্থা ও লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নিয়ে তিনি যেসব কথা বলেছেন তাতে মিয়ানমারের অবস্থানের এক চুলও নড়চড় হয়নি। সু চি মঙ্গলবার তার ভাষণে যেসব অসত্য কথা বলেছেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হেনরি ভ্যান থিও সু চির সেই ভাষণেরই প্রতিধ্বনি করেছেন মাত্র।

প্রথমত, হেনরি ভ্যান থিও সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, রাখাইন ছেড়ে মুসলিমরা কেন বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে তাদের সরকার এর কারণ তারা খুঁজে বের করতে চান। তবে অধিকাংশ মুসলমানই তাদের নিজেদের গ্রামে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

গত মঙ্গলবারও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সু চি বলেছিলেন, রাখাইনের মুসলমানরা কেন দেশত্যাগ করছে তার কারণ খুঁজে বের করতে চায় মিয়ানমার সরকার। এই সংকটের মূল কারণ সম্পর্কে সরকার কিছু জানে না এমন কথাও বলেছেন তিনি।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। রাখাইনে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখলেও মিয়ানমার সরকার নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের কথা চেপে রাখতে পারেনি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবিতেও রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এ সম্পর্কে জাতিসংঘ বলেছে, “জাতিগত নিধনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে এই ঘটনা।” গত আগস্টে প্রকাশিত আনান কমিশনের রিপোর্টেও রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপরিচয়হীন রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্বহীনতা, রাখাইন রাজ্যে আর্থসামাজিক সংকট, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর অভিযানকে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের মূল কারণ হিসেবে আনান কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে উপ রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেনি।”

সু চি’র মঙ্গলবারের ভাষণেরই প্রতিধ্বনি এই কথা।

এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ওই তারিখের পর কয়েক ডজন গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেখানে আগুন দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আগস্টের ২৫ থেকে সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখের মধ্যে কমপক্ষে ৬২টি রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হেনরি ভ্যান থিও সু চি’র প্রতিধ্বনি করতে গিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে আরেকটি মিথ্যাচার করেছেন। তিনি বলেছেন, মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বড় একটি অংশই দেশত্যাগ না করে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মঙ্গলবার সু চি তার ভাষণে বলেন, মুসলিমদের ৫০ শতাংশ গ্রাম এখনো অক্ষত রয়েছে। তবে সু চি পুরো ভাষণে রোহিঙ্গা শব্দটি একবারও উচ্চারণ করেননি। তাই এটি অস্পষ্টই রয়ে যায়  যে, তিনি পুরো মিয়ানমারের মুসলিমদের কথা বলছেন নাকি রাখাইনের রোহিঙ্গাদের কথা বলছেন।

রাখাইন রাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ, তার মধ্যে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। গত বছর সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগেও বিভিন্ন সময় সেনা অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে ছিল। আর জাতিসংঘের নিজস্ব হিসাব বলছে, শুধুমাত্র গত এক মাসে নতুন করে চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে।

মিয়ানমার সরকারের মিথ্যাচার নিশ্চই বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছে। তাই মিয়ানমার কোনো ছলচাতুরী করে সংকট নিরসনে সময়ক্ষেপণ করতে না পারে সে ব্যাপারে জাতিসংঘের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।

Comments

The Daily Star  | English
New School Curriculum: Implementation limps along

New School Curriculum: Implementation limps along

One and a half years after it was launched, implementation of the new curriculum at schools is still in a shambles as the authorities are yet to finalise a method of evaluating the students.

10h ago