পুলিশের প্রতিবেদনে ইরফান সেলিমকে অব্যাহতির সুপারিশ

জব্দ আলামতের ভিত্তিতে এজাহার তৈরি করা হয়েছে: র‍্যাব ডিজি

রাজধানীর চকবাজার থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র আইনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নং ওয়ার্ডের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রসঙ্গে র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে যেসব জিনিস পেয়েছি এর ভিত্তিতে মামলা করেছি।’
irfan selim
ইরফান সেলিম। ছবি: প্রথম আলোর সৌজন্যে

রাজধানীর চকবাজার থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র আইনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নং ওয়ার্ডের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রসঙ্গে র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে যেসব জিনিস পেয়েছি এর ভিত্তিতে মামলা করেছি।’

আজ মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে র‍্যাবের সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

গতকাল চকবাজার থানা পুলিশ র‌্যাবের করা দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাতে ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, র‌্যাবের অভিযান সাজানো ছিল কি না— এ প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘তদন্ত করে পুলিশ যা পেয়েছে তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন এটা আদালতের বিচার্য। আদালতের বিচার্য বিষয় নিয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছি না।’

একই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে র‌্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব এই অভিযান পরিচালনা করে। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আমরা যেসব আলামত উদ্ধার করি, তার ভিত্তিতে নিয়মিত মামলার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। যেসব বিষয় র‌্যাবের অভিযানে উঠে আসে, সেসব উল্লেখ করে চকবাজার থানায় এজাহার দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন, সে বিষয় সম্পর্কে আমরা অবহিত না। তদন্তকারী কর্মকর্তা তার উপলব্ধি ও তার বস্তবতায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে এ বিষয়ে বলতে পারবো।’

এ ঘটনায় র‌্যাবের অভিযান প্রশ্নের মুখে পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘র‌্যাব যে অভিযান পরিচালনা করেছে তা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে। ওই সময় যে আলামত পাওয়া গিয়েছিল, তার ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা যে বিষয়ে তদন্ত করেছেন, সে বিষয়ে র‌্যাব পুরোপুরি অবহিত না। আরেকটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, র‌্যাব পুলিশের একটি বিশেষায়িত বাহিনী। র‌্যাবের অভিযানে যেসব আলামত পাওয়া গেছে, সেগুলো স্পষ্ট করে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা যে বিষয়ে তদন্ত করেছেন, সে বিষয়ে র‌্যাব পুরোপুরি অবহিত না। পুলিশের প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা স্পষ্ট ধারণা দিতে পারবেন।’

গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাতে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান বাদী হয়ে ইরফান সেলিমসহ (৩৭) চার জনের নামে এবং দুই-তিন জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে ধানমন্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইরফান ছাড়া বাকি তিন অভিযুক্ত হলেন— ইরফানের সহযোগী এবি সিদ্দিক দিপু (৪৫), ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মো. জাহিদ (৩৫) ও গাড়িচালক মো. মিজানুর রহমান (৩০)।

এজহারে বলা হয়, গত ২৫ অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে নীলক্ষেত থেকে পাঠ্যবই কিনে লেফটেনেন্ট ওয়াসিফ ও তার স্ত্রী মোটরসাইকেলে ঢাকা সেনানিবাসে ফিরছিলেন। পথে ল্যাবএইড হাসপাতালের কাছে রাস্তায় একটি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ ১১-৫৭৩৬) তাদের পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। পরিচয় দেওয়ার পরও গাড়ি থেকে নেমে এক ব্যক্তি তাদের গালিগালাজ করেন ও হত্যার হুমকি দেন।

এরপর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের কাছে সেই গাড়িটিকে থামিয়ে নৌ কর্মকর্তা আবারও পরিচয় দিলে গাড়ির আরোহীরা সবাই নেমে এসে তাকে কিলঘুষি মেরে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যান।

মামলার পর দিন ২৬ অক্টোবর রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার থানাধীন দেবিদাস ঘাট লেন হাজী সেলিমের পৈত্রিক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। অভিযানে তাদের বাসা থেকে বিদেশি মদ ও অবৈধ ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। পরে অবৈধ ওয়াকিটকি ও মাদক রাখার দায়ে ইরফান সেলিমকে দেড় বছর এবং ওয়াকিটকি বহন করার দায়ে তার দেহরক্ষী জাহিদকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ইরফান সেলিমকে ২৭ অক্টোবর কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর ২ ও ১৩ ধারার অধীনে নৈতিক স্খলন ও অসদাচরণের বিধানে কাউন্সিলর ইরফানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় এই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।

প্রশ্নোত্তর পর্বে র‌্যাবের বন্দুকযুদ্ধে নিয়ে প্রশ্ন উঠে— বলা হলে আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘র‌্যাবের সব অভিযান এক ধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। গতকাল ময়মনসিংহের মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক চোরাকারবারিদের হামলায় র‌্যাবের একজন সদস্য গুরুতর আহত জয়েছেন। মাদক চোরাকারবারি সরাসরি তাকে মাথায় ধারলো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছেন। তাকে একটি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যে বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে র‌্যাব আনতে চায়, যে কোনো মাদকবিরোধী অভিযান অত্যন্ত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। কেবল আসামিপক্ষ না, র‌্যাবের সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।’

র‍্যাবের সেবা সপ্তাহ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে গত ১ জানুয়ারি থেকে র‌্যাব সেবা সপ্তাহ শুরু হয়েছে। এই এক সপ্তাহে আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারের সাফল্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্পর্শকে পৌঁছে দেওয়া। সেবা সপ্তাহে র‌্যাব সদস্যরা চার হাজার বৃক্ষ রোপন করেছেন। এগুলো তারাই পরিচর্যা করবেন। ৩২ হাজারের বেশি হতদরিদ্র পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। আজ রক্তদান কর্মসূচিতে সারা দেশে পাঁচ র‌্যাব সদস্য রক্তদান করেছেন। আগামী ৭ জানুয়ারি রংপুরের চরাঞ্চলের র‌্যাবের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণ করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থেকে আমাদের উদ্যোগকে আলোকিত করবেন বলে আমরা আশা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেশকে জঙ্গিবাদ মুক্ত করেছি। নতুন বছরে মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাবের সক্ষমতা দেখা যাবে।’

Comments