৫ আগস্ট ১৯৭১: মার্কিন প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনায় দুই সিনেটর
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৫ আগস্ট গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন মার্কিন কংগ্রেসে পাকিস্তানকে সব ধরনের সামরিক সাহায্য বন্ধ সংক্রান্ত বিল পাস করায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসের প্রতি ধন্যবাদ জানানো হয়।
দেশব্যাপী এদিন
৫ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর রংপুর জেলা সেক্রেটারি মওলানা কাজী নজমুল হুদা সৈয়দপুর, নীলফামারী, ডোমরা, জলঢাকা, পীরগাছা ও গাইবান্ধা সফর করেন। এসময় তিনি বেশ কয়েকটি রাজাকার শিবির পরিদর্শন করেন এবং রাজাকারদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, 'রংপুর জেলায় ৬ হাজারেরও বেশি রাজাকার সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।'
পাকিস্তানে এদিন
৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তান সংকট সম্পর্কে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। জাতীয় পরিষদ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের এই বিবরণীতে (শ্বেতপত্র) বলা হয়, 'পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের ২৫ দিনের অসহযোগ আন্দোলনের ফলে সরকারি দপ্তরগুলোতে কর্ম পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং দেশদ্রোহীদের হামলায় বিনষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং আওয়ামী লীগের কর্মী বাহিনীর বিদ্রোহীরা সংগঠিত হয়ে সন্ত্রাসবাদী কায়দায় পাকিস্তানিদের নিধন করেছে। সশস্ত্র ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের সক্রিয় সাহায্যসহ আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চ ভোর থেকেই সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিল। ইতিমধ্যে তারা পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি শহরে আক্রমণাত্মক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু ২৬ মার্চ রাতের মধ্যে তাদের সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে।'
আন্তর্জাতিক মহলে এদিন
৫ আগস্ট মার্কিন সিনেটের দুই প্রভাবশালী সিনেটর পাকিস্তানকে সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কড়া সমালোচনা করেন। এদিন ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বলেন, 'পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী পরিস্থিতি নিয়ে এবং পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয়। এই অবস্থায় শরণার্থী সমস্যা জিইয়ে রেখে কোটি ডলার ব্যয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অর্থহীন। মার্কিন কংগ্রেসে যে প্রস্তাব উঠেছে তা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।'
৫ আগস্ট মার্কিন সিনেটের অধিবেশনে সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য ও প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চ বলেন, নিক্সন প্রশাসন অযৌক্তিকভাবে ১৮ মিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন। অথচ মার্কিন প্রশাসনের উচিত পাকিস্তানের উপর সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে পাকিস্তানকে দেওয়া অস্ত্র সহায়তা ও প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বক্তব্যের প্রতিবাদে হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বেশ কয়েকটি সংগঠন।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেংকু আব্দুল রহমান বাংলাদেশ বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্কট সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং-এর সাথে বৈঠকে মিলিত হন।
৫ আগস্ট ইরানের তেহরান থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী আরব দৈনিক 'কায়হান ইন্টারন্যাশনাল' এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দৈনিক কায়রানের রাজনৈতিক সম্পাদক আমির তাহেরি বলেন, 'আওয়ামী লীগের সাবেক এক জাতীয় পরিষদ সদস্যের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ এখন প্রচন্ড আকারে চলছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের আইন-শৃঙ্খলা মোটেও স্বাভাবিক নয়। সেখানে বিদ্রোহীরা সামরিক বাহিনীর উপর গুপ্ত হামলার কারণে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছি।'
৫ আগস্ট হাউস অব কমন্সের অধিবেশনে প্রভাবশালী ব্রিটিশ এমপি জন স্টোনহাউস শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে একটি বিশেষ বিল উত্থাপন করেন। এসময় তিনি বিলের উপর উত্থাপিত এক বক্তব্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়ে ও পূর্ব পাকিস্তানে চলমান গণহত্যা বন্ধে, উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করার আহ্বান জানান।
অধিবেশনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ এই বিশেষ বিলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, আমরা এই বিষয়ে কোনো বৈঠক পাকিস্তানের সাথে করতে পারি না। কারণ বিষয়টি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ। আর শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের নাগরিক। সুতরাং শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক ও মুক্তির বিষয়টিও পাকিস্তানের নিজস্ব বিষয়। তবে যুক্তরাজ্য তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছে এবং পাকিস্তানকেও পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকে সমঝোতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
৫ আগস্ট লন্ডনে নিযুক্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও অধ্যাপক ড্রেপারকে এদিন লন্ডন থেকে জেনেভায় পৌঁছান। অধ্যাপক ড্রেপারকে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে রেডক্রস ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। রেডক্রস ইন্টারন্যাশনাল বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করেন। একই দিন অধ্যাপক ড্রেপার ও আবু সাঈদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইসিজের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
৫ আগস্ট লন্ডনের পাকিস্তান দূতাবাসের হিসাব নিরীক্ষা বিভাগের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বাঙালি কূটনীতিবিদ আকবর লুৎফুল মতিন। এদিন তিনি একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
৫ আগস্ট পূর্ব বাংলার প্রথম গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক চালমার্স বোর্ন এক বক্তব্যে বলেন, 'পাকিস্তানের সংহতির জন্যে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। আমি আরও বিশ্বাস করি যে, পাকিস্তানের শত্রুরা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে সাধারণ মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে বিদেশি শক্তির কাছে মাথানত করেছিল।
দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ
৫ আগস্ট ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার রাঙ্গামাটিতে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষে ৩৫ হানাদার সৈন্য নিহত হয় এবং ১৭ জন আহত হয়।
৫ আগস্ট কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নয়নপুর ঘাঁটি আক্রমণ করে। এ অপারেশনে বহু হানাদার সেনা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান শেষে নিরাপদে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নাটুদহ কোম্পানি সদর দপ্তর আক্রমণ করলে দুপক্ষের তুমুল যুদ্ধ হয়। বেশ কয়েক ঘণ্টা ব্যাপী চলা এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হাসান, আলাউল, ইসলাম খোকন, আবুল কাশেম, রওশন আলম, তারিক, রবিউল, আফাজ উদ্দিন ও কেয়ামুদ্দিন শহীদ হন।
৫ আগস্ট দক্ষিণ কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের উপর বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা করে। বিকেল সাড়ে ৪টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল রাঙ্গামুরা বাজারের সামনের রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়, এসময় হানাদার বাহিনীর আরেকটি দল সেই ব্যারিকেডকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মার্চ করে আসার সময় মুক্তিবাহিনী দুই হানাদার দলের উপর গুলি চালিয়ে ২ হানাদার সেনাকে হত্যা করে। এদিন বিকেলে কোটেশ্বরে মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের ৪ সৈন্য নিহত হয়।
৫ আগস্ট নোয়াখালীর সেনবাগে মুক্তিবাহিনী চার রাজাকারকে হত্যা করে। চৌরালার যুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে শত্রুপক্ষের তিনটি বাঙ্কার ধ্বংস হয় এবং দুজন নিহত হয়। অন্যদিকে মুক্তিফৌজের এন কে আব্দুস সাত্তার, এন কে মুজাহিদ এবং মোহাম্মাদ আলি আক্কাস শহীদ হন।
৫ আগস্ট সিলেটের দক্ষিণ ভাগে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের কাছে সেজামুরা, ধর্মঘর, চৌরাস্তা ইত্যাদি এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেনাদের জড়ো হওয়ার খবর শুনে মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের উপর মেশিনগান ও মর্টার নিয়ে হামলা করে। এসময় ৬ হানাদার সেনা নিহত হয়।
৫ আগস্ট সুনামগঞ্জে সুরমা গ্রাম থেকে রসদ নিয়ে আসা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি জিপ ও ৩ টনের ট্রাক আক্রমণ করে উড়িয়ে দেয় মুক্তিবাহিনী।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার সিদলাইয়ের পশ্চিমে মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে ১৫ হানাদার সেনা নিহত হয়।
৫ আগস্ট চট্টগ্রাম সেক্টরের সাতকানিয়া কলেজ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় হানাদার বাহিনীর ৪০ সৈন্য নিহত হয়। এদিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল মেহাব বাজারে ডিনামাইট লাগিয়ে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। একই এলাকায় মুক্তিবাহিনী হানাদারদের একটি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ৩ হানাদার সৈন্যকে হত্যা করে। এসময় পাঁচ হানাদার সৈন্য আহত হয়।
৫ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা সীমান্তবর্তী মহাজনপুর গ্রামে শেল্টার ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। এসময় বাগোয়ান গ্রামের ২ জন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এসে অভিযোগ করে রাজাকারেরা তাদের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এ খবর পাওয়া মাত্রই মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হাসানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা বাগোয়ান গ্রামের মাঠে দক্ষিণ-পশ্চিমে দু'দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় পাকিস্তানি হানাদাররা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠের আখখেতে অ্যামবুশ করে রাখে। মুক্তিযোদ্ধারা ফাঁদে পা দিলে হানাদারেরা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এসময় মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে। আড়াইঘণ্টা ব্যাপী এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা রবিউল, কাশেম, খোকন, কিয়ামুদ্দিন, হাসান, রওশন, আফাজ ও তারিক শহীদ হন। এসময় বেশ কয়েকজন হানাদার সেনা নিহত হয়। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে যান। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের লাশগুলো পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী জগন্নাথপুর মাঠে নিয়ে চাপা দেয়।
তথ্যসূত্র-
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র তৃতীয়, সপ্তম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ৬ আগস্ট ১৯৭১
দৈনিক পাকিস্তান, ৬ আগস্ট ১৯৭১
দ্য গার্ডিয়ান, ৬ আগস্ট ১৯৭১
আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]