দ্য আউটসাইডার : সাহসিকতার সমাচার  

ফরাসি লেখক, নোবেল ইতিহাসের দ্বিতীয়-কনিষ্ঠতম জয়ী আলবেয়ার কাম্যুর সাড়াজাগানো উপন্যাস 'দ্য আউটসাইডার' যার ফরাসি নাম L'Étranger (The Stranger). ১৯৪২ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় যা পরবর্তীতে ‍‍‍‍‍Stewart gilbert ১৯৪৬ সালে ইংরেজিতে অনুবাদের মাধ্যমে হৈচৈ ফেলে দেয়। কী আছে এই বইয়ে?

ফরাসি লেখক, নোবেল ইতিহাসের দ্বিতীয়-কনিষ্ঠতম জয়ী আলবেয়ার কাম্যুর সাড়াজাগানো উপন্যাস 'দ্য আউটসাইডার' যার ফরাসি নাম L'Étranger (The Stranger). ১৯৪২ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় যা পরবর্তীতে ‍‍‍‍‍Stewart gilbert ১৯৪৬ সালে ইংরেজিতে অনুবাদের মাধ্যমে হৈচৈ ফেলে দেয়। কী আছে এই বইয়ে?

উত্তর সহজে বলা মুশকিল। তার চেয়েও বেশি মুশকিল বইটি পড়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করা। আর দশটা সাধারণ উপন্যাসের মত 'ভালো' কিংবা 'খারাপ' বলে এটিকে যাচাই করা একপ্রকার অসম্ভব। বইটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে কেঁপে উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ। জাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, 'মঁসিয়ে কাম্যুর আউটসাইডার ছাপাখানার বাইরে আসতে না আসতেই বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। সকলে বলতে লাগল 'যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে এইটাই শ্রেষ্ঠ বই'। সমসাময়িক সাহিত্যসৃষ্টির নামে উপন্যাসটি নিজেই একটি আউটসাইডার।'

অনেক সাহিত্যবোদ্ধার মতে, আউটসাইডার বুঝতে চাইলে কাম্যুর দর্শন সম্পর্কে জানা দরকার। বিশেষ করে 'The Myth of Sisyphus' 'Absurdity' or 'Absurdism' and 'Nihilism'; এই তিনটি বিষয় জেনে উপন্যাসটি পড়লে এর গভীরতা, ব্যাপকতা এবং নিবিড় উপলব্ধি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সহজ হয়। বইটিতে  'দ্য মিথ অব সিসিফাসের' সংশ্লিষ্টতাও দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে গ্রিক মাইথলজির 'সিসিফ' চিরকাল একটি পাথর পাহাড়ের উপর দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে এবং সেই পাথরটা আবার গড়িয়ে নিচে পড়তে থাকবে। এই চলমান নিত্যতাকেই কাম্যু অ্যাবসার্ড বলেছেন যার মানে দাঁড়ায় অর্থহীন কাজ।

'মাসরো' উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। উত্তম পুরুষের জবানীতে লেখা এই উপন্যাসে লেখক মাসরোর মাধ্যমে চারপাশের জগত এবং তার গতিময়তা দেখিয়েছেন। মাসরোর আশপাশের প্রতিটি দৃশ্যের খুঁটিনাটি বর্ণনা বইটিকে বুঝতে আরও সহজ করেছে। মাসরো একটি নির্লিপ্ত, উদাসীন চরিত্র যে কিনা ভান করতে জানে না। সমাজে টিকে থাকতে এই ভান করতে না পারাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। উপন্যাসের শুরু হয় মাসরোর মায়ের মৃত্যুর খবরের মধ্য দিয়ে। শুরুর লাইন ক'টি ছিল এমন- 'মা আজ মারা গেছেন, হয়ত গতকালই; ঠিক ধরতে পারছি না।'

উপন্যাসের শুরুর অংশই বুঝিয়ে দেয় ব্যক্তি হিসেবে মাসরো কতটা বিকারহীন আর নির্লিপ্ত। তার মা ছিলেন বৃদ্ধাশ্রমে এবং সে ব্যাপারে তার কোনো অনুতপ্ত ভাব ছিল না। মায়ের মৃত্যুতে চোখের পানি না ফেলা, মৃত মায়ের মুখ দেখতে না চাওয়া এমনকি আর দশটা সাধারণ দিনের মতই কফি খাওয়া ও ধূমপান যেন মাসরোকে করে ফেলেছে অন্য সবার চেয়ে আলাদা। পরবর্তীতে ন্যূনতম শোক পালন না করে প্রেমিকা মারির সাথে হাসির সিনেমা দেখা,সময় কাটানো কিংবা অন্যান্য প্রাত্যহিক কাজে থাকা মাসরোর চরিত্রে এনেছে ভিন্নতা। তবে গল্পের প্রথম ভাগে এই ভিন্নতার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। লেখক গল্পের পটভূমি পুরোপুরি বদলে যায় দ্বিতীয় ভাগের মাধ্যমে, ইংরেজিতে যাকে বলে 'টুইস্ট'।

মূলত উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগই মাসরো-কে সত্যিকার অর্থেই আউটসাইডার হতে সাহায্য করেছে। এক ছুটির দুপুরে সমুদ্রের পারে কাকতালীয়ভাবে মাসরোর গুলিতে খুন হয় এক আরবীয় যুবক। এরপর থানা,পুলিশ, কাঠগড়া আর জেলের একঘেয়ে সময় নামক শাস্তি। মাসরোকে তার পক্ষের উকিল নিযুক্ত করতে বলা হলে সে তাতে আপত্তি জানায়। পরবর্তীতে তার পক্ষে একটি সরকারি উকিল নিযুক্ত করা হয় কিন্তু উকিলের শিখিয়ে দেয়া কোনো কথাই মাসরো বলে উঠতে পারে না। খুনের তদন্তে তার খুনের অপরাধকে ছাপিয়ে গেছে তার মায়ের মৃত্যুতে শোকাহত না হওয়ার অপরাধ। সেই একটি অপরাধ দিয়েই মাসরোকে পুরো আদালত, তার চারপাশের মানুষ বিচার করতে লাগলো। যার ফলস্বরূপ তাকে জনসম্মুখে শিরশ্ছেদ করার রায় দেওয়া হয়।

তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় মায়ের মৃত্যুর পর না কাঁদা ছিল প্রথা বিরোধী এবং এই জন্য একজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ারও বিধান ছিল। কামু বলেছেন, 'In our society any man who doesn't cry at his mother's funeral he is liable to be condemned to death. I simply meant that the hero of the book is condemned because he does not play the game. The answer is simple: he refuses to lie. Lying is not only saying what is not true… Meursault doesn't want to make life simpler.'

তবে লেখক আলবেয়ার কাম্যু কেবল একজন মানুষের নির্লিপ্ততা এবং তার ফলভোগের মধ্যেই উপন্যাসটিকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কাহিনীর গভীরতা এবং ব্যাপকতা আরও বিস্তৃত। লেখক দেখাতে চেয়েছেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভান করতে না জানা মানুষের পরিণতি এমনই হয়। সমাজ তাদের নিয়ে বিচারসভা বসায়, যার বিচার হচ্ছে তাকে বহিরাগত করে দিয়ে নিজেরাই নিজেদের যুক্তিবিতর্ক উপস্থাপন করে এবং তাদের মতামতের ওপরই সেই ব্যক্তির শাস্তি হয়। বইটি পড়া শুরু করার পর থেকেই আমি একজন আগন্তুকের অপেক্ষায় ছিলাম যার নামে বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয়ভাগে এসে বুঝতে পারলাম, সেই আউটসাইডারটি গল্পের নায়ক নিজে। এই আউটসাইডারের সাথে আমরাও নিজেদের জীবনকে মিলিয়ে নিতে পারি। মাসরোকে যখন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, আসামি পক্ষ, বাদী পক্ষ এবং বিভিন্ন সাক্ষীদের সাক্ষ্য শুনে মাসরো বুঝতে পারে এখানে তার কোনো ভূমিকাই নেই। প্রত্যেকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মাসরোর জীবনকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে অথচ সেখানে তারই কথা বলার কোনো স্থান নেই। লেখক উপন্যাসে আরও একটি চমৎকার বিষয় দেখিয়েছেন আর তা হলো মানুষের জীবনের প্রতিটি ঘটনাই একটি অন্যটির সাথে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে জীবনে কিছু হয় না। মাসরো আরবীয়কে খুন করলেও তাকে বিচার করা হয়েছিলো মায়ের মৃত্যু পরবর্তী প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে। মাসরোর প্রতিটি পদক্ষেপই যেন ছিল তার জীবনের মরণকাল স্বরূপ।

তবে বইয়ের শেষভাগে মাসরোকে ততোটা নির্লিপ্ত মনে হয় নি যতটা শুরুর দিকে মনে হচ্ছিলো। তার জেলখানায় কাটানো প্রতিটা দিনের বর্ণনা লেখক খুব মর্মস্পর্শী করে উপস্থাপন করেছেন। যেমন, মাসরো ভাবতো শিরশ্ছেদ করার জিলেটিন যদি কাজ করা বন্ধ করে দেয় তবে কী হতে পারে, এমন নজির ইতিহাসে আছে কিনা। জেলকক্ষে বসে বসে একটুকরো আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতো মারীর কথা, জীবনের খুঁটিনাটির কথা। মাসরো আশাবাদী হতে চাইতো এই ভেবে যে, কখনো যদি একজন ফাঁসীর আসামীও দণ্ডের আগে পালাতে পারে, তাহলে সে-ও এমন স্বপ্ন দেখতে পারে। দিন গুনতো আপিল কার্যকর হয়েছে এমন সংবাদের। ''The Shawshank Redemption" মুভির মত শেষভাগে আমিও চাইছিলাম, মাসরো জেল থেকে পালিয়ে যাক। কিন্তু লেখকের এমন ইচ্ছা ছিল না, তাই উপন্যাসের একেবারে শেষে মাসরো মৃত্যুকেই বরণ করেছে বুক পেতে। তার শেষ ইচ্ছা ছিল, তার মৃত্যুর সময় যেন প্রচুর লোকসমাগম হয়,তাদের প্রবল ধিক্কার শুনতে শুনতে সে যেন মৃত্যুর দিকে মাথা পেতে দিতে পারে। এ যেন রবিঠাকুরের, 'ভালোমন্দ যাহাই আসুক সত্য রে লও সহজে।'

'দ্য আউটসাইডার' উপন্যাসের মত আলবেয়ার কাম্যু সমাজের প্রচণ্ড ভণ্ডামির দিকে ভর্ৎসন ছুঁড়ে দিয়েছেন নায়ক মাসরোর মাধ্যমে। সমাজের রায়ে তার মৃত্যদন্ড হলেও জীবনের শেষভাগেও সে ভণিতা করেনি, মাথা নত করে মিথ্যাকে সঙ্গী করে নেয়নি বরং মৃত্যুর দিকেও তাকিয়েছে প্রচণ্ড সাহসিকতার সাথে। যুগে যুগে মাসরোরা সমাজে আউটসাইডার বলে বিবেচিত হলেও নিজের ব্যক্তিত্বের কাছে তারা প্রত্যেকেই নায়ক।

Comments

The Daily Star  | English
Dhaka Airport Third Terminal: 3rd terminal to open partially in October

HSIA’s terminal-3 to open in Oct

The much anticipated third terminal of the Dhaka airport is likely to be fully ready for use in October, enhancing the passenger and cargo handling capacity.

9h ago