সংসদে প্রথম আলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যা বললেন

জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অধিবেশনে আজ সোমবার সমাপনী ভাষণে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ৫০ বছর পূর্তিতে বিশেষ অধিবেশনে সমাপনী ভাষণ দেন। ছবি: পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু। প্রথম আলো গণতন্ত্রের শত্রু। প্রথম আলো দেশের মানুষের শত্রু।'

জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অধিবেশনে আজ সোমবার সমাপনী ভাষণে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

ভাষণে স্বাধীনতা দিবসের দিন দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'একটা ছোট্ট শিশুর হাতে ১০টা টাকা দিয়ে তাকে দিয়ে একটা মিথ্যা বলানো। শিশুর মুখ থেকে কিছু কথা বলানো। কী কথা! ভাত-মাছ-মাংসের স্বাধীনতা চাই। একটা সাত বছরের শিশু। তার হাতে ১০টা টাকা তুলে দেওয়া এবং তার কথা রেকর্ড করে সেটা প্রচার করা- স্বনামধন্য এক পত্রিকা। খুউবই পপুলার। নাম তার প্রথম আলো। কিন্তু বাস করে অন্ধকারে।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি এটা অত্যন্ত দু:খের সাথে বলি- যে এরা এই দেশে কখনোই স্থিতিশীলতা থাকতে দিতে চায় না।'

ওয়ান ইলেভেনে প্রথম আলো ও আরেকটি পত্রিকার ভূমিকার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, '২০০৭ সালে যখন ইমার্জেন্সি হয়, তখন তারা উৎফুল্ল। ২টি পত্রিকা। আদাজল খেয়ে নেমে গেল। বাহবা কুড়ালো।'

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'আর তার সঙ্গে আছে একজন সুদখোর। বড়ই প্রিয় আমেরিকার। আমেরিকা একবারও জিজ্ঞাসা করে না- যে একটা ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক; এটা তো একটা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। সরকারের বেতন তুলত যে এমডি, সে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কোথা থেকে পেল যে আমেরিকার মতো জায়গায় সামাজিক ব্যবসা করে, বিনিয়োগ করে দেশে-বিদেশে। এই অর্থ কোথা থেকে আসে? এটা কী জিজ্ঞাসা করেছে কখনো তারা? জিজ্ঞাসা করেনি।

'এদের কাছ থেকে দুর্নীতির কথা শুনতে হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ। এদের কাছ থেকে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়। যারা গরিবের রক্ত চোষা টাকা পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করে নিজেরা শতকোটি টাকা মালিক হয়ে আবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়ে যায়। এই সব লোক এদেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আওয়ামী লীগ সরকার এসে কিছুই নাকি দেয়নি। দেশ নাকি ধ্বংস হয়ে গেছে।'

প্রসঙ্গ ৭০ অনুচ্ছেদ

৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনীর দাবির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেকেরই আপত্তি। যারা এই আপত্তির কথা তুলছেন তাদের বোধহয় অভিজ্ঞতার অভাব আছে। এই ৭০ অনুচ্ছেদটাই কিন্তু আমাদের দেশে সরকারের একটা স্থায়ীত্বের সুযোগ এনে দিয়েছে। যার ফলে দেশটা উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ফ্লোর ক্রস করার কারণে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার টিকতে পারেনি। এর আগে ১৯৪৬ সালেও একই খেলা হয়েছিল, যার কারণে আমাদের পূর্ব বাংলাটা যেভাবে গঠন হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি।

'এটা ১৯৫৬ সালের নির্বাচনেও হয়েছিল। পরে মার্শাল ল এসে ক্ষমতা দখল করে। কাজেই এই ৭০ অনুচ্ছেদটাই একটি সুরক্ষা দেয় গণতন্ত্রকে সমুন্নত করতে, সংহত করতে। আর এর ‍সুফল জনগণ পেতে পারে। জানি না কেন কিছু কিছু সদস্যের এর ওপর এত রাগ। কারণ হচ্ছে সরকার ভাঙতে-গড়তে বা খেলাটা খেলতে তারা সক্ষম হচ্ছে না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি, দেশের মানুষও বিশ্বাস করে, ১৪ বছর একটানা ক্ষমতায় আছি বলেই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছি।'

'আমেরিকা চাইলে যেকোনো দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে'

ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে সরকার প্রধান বলেছেন, 'তারা (যুক্তরাষ্ট্র) দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, আবার দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষ হয়েই তো ওকালতি করে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে এখানে এমন একটা সরকার আনতে চাচ্ছে- তার গণতান্ত্রিক কোন অস্তিত্ব থাকবে না। অগণতান্ত্রিক ধারা। আর সেই ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী, সামান্য কিছু পয়সার লোভে এদের তাবেদারি করে। পদলেহন করে।'

সংসদনেতা তার বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত না দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্র সফরে একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে সরকার প্রধান বলেন, 'আমেরিকায় যখন প্রথমবার যাই সেখানকার আন্ডার সেক্রেটারির সাথে আমার মিটিং হয়েছিল। বলেছিলাম, "আমি একটি মনুমেন্ট দেখে এসেছি। সেখানে লেখা আছে গভর্মেন্ট অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল। আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি সে দেশটি হচ্ছে গভর্মেন্ট অব দ্য আর্মি, বাই দ্যা আর্মি, ফর দ্য জেনারেল।"

'বলেছিলাম- "আমেরিকা গণতন্ত্র চর্চা করে তাদের আটলান্টিকের পাড় পর্যন্ত। এটা যখন পার হয়ে যায় তখন কী আপনাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা বদলে যায়? কেন আপনারা একটা মিলিটারি ডিকটেটরকে সমর্থন দিচ্ছেন?" আমি এই প্রশ্নটি করেছিলাম।'

বিভিন্ন দেশের বিষয়ে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, 'আজকেও আমি বলি যে দেশটা আমাদের কথায় কথায় গণতন্ত্রের ছবক দেয়। আর আমাদের বিরোধী দল থেকে শুরু করে কিছু কিছু লোক তাদের কথায় খুব নাচন-কোদন করছেন, উঠবস করছেন, উৎফুল্ল হচ্ছেন। হ্যাঁ, তারা যেকোনো দেশের ক্ষমতা উল্টাতে পারেন, পাল্টাতে পারেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো তো আরও বেশি কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যারাব স্প্রিং (আরব বসন্ত), ডেমোক্রেসি বলে বলে, সমস্ত ঘটনা ঘটাতে ঘটাতে এখন নিজেরা নিজেদের মধ্যে একটা প্যাঁচে পড়ে গেছেন। যতদিন ইসলামিক কান্ট্রিগুলোর ওপর চলছিল, ততদিন কিছু হয়নি। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পরে এখন সারা বিশ্বই আজকে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে গেছে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।'

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'তারা আমাদেরকে এখন গণতন্ত্রের জ্ঞান দিচ্ছে। কথায় কথায় ডেমোক্রেসি আর হিউম্যান রাইটসের কথা বলছে। তাদের দেশের অবস্থাটা কী?'

তিনি বলেন, 'আমেরিকায় প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় অস্ত্র নিয়ে স্কুলে ঢুকে যায়। বাচ্চাদের গুলি করে হত্যা করছে। শিক্ষকদের হত্যা করছে। শপিং মলে ঢুকে যাচ্ছে। হত্যা করছে। ক্লাবে যাচ্ছে সেখানে হত্যা করছে। এটা প্রতিনিয়ত, প্রতিদিনেরই ব্যাপার। কোনো না কোনো রাজ্যে অনবরত এই ঘটনা ঘটছে।'  

প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৫ আগস্টে যারা হত্যা করেছে সেই খুনি রাশেদ (রাশেদ চৌধুরী) আমেরিকায় আশ্রয় নিয়ে আছে। সেখানে যত প্রেসিডেন্ট এসেছে সকলের কাছে আমি আবেদন করেছি। আইনগতভাবে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আমরা ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালিয়েছি। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছি যে, এই খুনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তাকে আপনারা আশ্রয় দেবেন না। শিশু হত্যাকারী, নারী হত্যাকারী, রাষ্ট্রপতির হত্যাকারী, মন্ত্রীর হত্যাকারী। এটা মানবতা লঙ্ঘনকারী। এদেরকে আপনারা আশ্রয় দিয়েন না। ফেরত দেন। কই তারা তো তাকে ফেরত দিচ্ছে না। খুনিদেরকে লালন-পালন করেই রেখে দিচ্ছে।'

Comments

The Daily Star  | English
Awami League's peace rally

Relatives in UZ Polls: AL chief’s directive for MPs largely unheeded

Awami League lawmakers’ urge to tighten their grip on the grassroots seems to be prevailing over the party president’s directive to have their family members and close relatives withdraw from the upazila parishad polls.

7h ago