মেঘ ছাপিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নবান স্থপতি ফজলুর রহমান খান

মেঘ দেখতে দেখতে কী করে যেন মেঘের সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেল তার সৃষ্টি। না কোন কল্পনায় নয়, বাস্তবেই। মেঘ দেখতে দেখতে কী করে যেন মেঘ ছোঁয়া হয়ে গেল তার। শৈশবে পাঁচ তলা ভবন দেখলে যে কিনা ঘাড় ঘুরিয়ে মাপতে মাপতে ঘাড় ব্যথা করে ফেলত, পরম বিস্মিত চোখে দেখতে দেখতে ভাবতো এ কি করে বানিয়েছে! এও কি সম্ভব!
ফজলুর রহমান খান। ছবি: সংগৃহীত

মেঘ দেখতে দেখতে কী করে যেন মেঘের সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেল তার সৃষ্টি। না কোন কল্পনায় নয়, বাস্তবেই। মেঘ দেখতে দেখতে কী করে যেন মেঘ ছোঁয়া হয়ে গেল তার। শৈশবে পাঁচ তলা ভবন দেখলে যে কিনা ঘাড় ঘুরিয়ে মাপতে মাপতে ঘাড় ব্যথা করে ফেলত, পরম বিস্মিত চোখে দেখতে দেখতে ভাবতো এ কি করে বানিয়েছে! এও কি সম্ভব! 

সেই ছেলের হাতেই কিনা একটা সময় মেঘের উচ্চতার সমান ভবন নির্মিত হলো। নির্মিত হলো টানা ২৫ বছর সর্বোচ্চ সুউচ্চ ভবনের স্থান দখল করে রাখা সিয়ার্স টাওয়ার। নির্মিত হলো তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর। সে ছেলের হাত ধরে জন্ম নিলো সুউচ্চ ভবন নির্মাণের অভিনব পদ্ধতি "টিউব ইন টিউব"। ১০০ তলা ভবন বানানোর ফর্মুলার জন্মই তার হাতে। তার পদ্ধতি অনুসরণ করেই পরবর্তীতে নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। আজও সারা পৃথিবীতে স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইনে এখন পর্যন্ত তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি কালের বিবর্তনে হয়ে উঠেছিলেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন।

তিনি ফজলুর রহমান খান। জন্ম ঢাকায় ১৯২৯ সালে। বাবা বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের গোল্ড মেডেলিস্ট। কলকাতায় প্রথম মুসলমান এ ডি পি আই ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন আবদুর রহমান খান। ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তানের সভাপতিও।

ফজলুর রহমান খানের শৈশবের অনেকটা সময় কাটে ফরিদপুর জেলার ভাণ্ডারীকান্দি গ্রামে (বর্তমানে মাদারীপুর জেলা)। এরপর ফের ঢাকায় চলে আসেন তার পরিবার। ঢাকায় ফিরে আরমানিটোলা স্কুলে ভর্তি করানো হয় তাকে। ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি। স্কুলে থাকা অবস্থাতেই তার বাবা কলকাতায় চলে যান চাকরির সুবাদে। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ই চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন তারা বাবা। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর ফজলুর রহমান খান ভর্তি হয়েছিলেন শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া হয়নি সেখানে। ফাইনাল পরীক্ষার আগে পঞ্চাশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ঢাকায় ফিরে তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বুয়েট) থেকে বাকি শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন৷ কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে দেয়া পরীক্ষা আর  আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরীক্ষা- দুইয়ের ফলের ভিত্তিতে তাকে বিশেষ বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এই অবস্থার মধ্যেও ফজলুর রহমান খান ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন।

এরপরই যোগ দিয়েছিলেন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে প্রভাষক পদে। কিন্তু তখনই পেয়ে যান দারুণ এক সুযোগ। ১৯৫২ সালে ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি এর জন্য চলে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেইন থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ও ফলিত মেকানিক্সে যুগ্ম এমএস করার পর ফজলুর রহমান পিএইচডি ডিগ্রি পান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে।

১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের স্কিডমোর, ওউইং ও মেরিল নামের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ছিলেন ফজলুর রহমান খান।

ডক্টরেট শেষে ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে চাকরিতে প্রবেশ করে দেখলেন এখানে তার মেধার যথাযোগ্য মূল্যায়ন হবে না। তাই আবার ফিরে গেলেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিড মোরের  আমন্ত্রণে এ কোম্পানির শিকাগো শাখার ডিরেক্টর করা হয় তাকে। পাশাপাশি  ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির স্থাপত্য বিভাগে পড়াতে শুরু করেন তিনি।

স্কিডমোর ও উইং ও মেরিলে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে থাকার সময় বেশ কয়েকটি ভবনের নকশা করেছিলেন ফজলুর রহমান খান।

১৯৬৯ সালে নির্মিত হলো পৃথিবীর প্রথম শত তলা ভবনের জন হ্যানকক সেন্টার। মাত্র চার বছরে এই ভবনের কাজ শেষ হয়েছিল পুরদস্তুর। এই ভবনের অন্যতম স্থপতি ছিলেন ফজলুর রহমান খান। যদিও প্রধান স্থপতি ছিলেন প্রখ্যাত স্থপতি ব্রুস গ্রাহাম। ১১২৮ ফুট বা ৩৪৩ মিটার উচ্চতার এই ভবন একই সঙ্গে ছিল পৃথিবীর  সর্বোচ্চ সুউচ্চ ভবন আর একই সঙ্গে প্রথম শততলা বিশিষ্ট ভবন। জন হ্যানকক সেন্টার ও সিয়ার্স টাওয়ার প্রজেক্টে স্থপতি হিসেবে অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন এফ আর খান। এই গগনচুম্বী দুই ভবন তাকে এনে দিলো বিশেষ সম্মান। সিয়ার্স টাওয়ারের কাজ চলাকালীন সময়ে ১৯৭২ সালে ইঞ্জিয়ার নিউজ রেকর্ডে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ মনোনীত হয়েছিলেন ফজলুর রহমান খান। আর ১৯৭৩ সালে তিনি নির্বাচিত হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এর সদস্য। এর পরের বছর বিশ্বখ্যাত নিউজ উইক ম্যাগাজিন তাকে মার্কিন স্থাপত্য প্রকৌশলে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তাদের প্রচ্ছদে স্থান দেয়। ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ড ম্যাগাজিন পাঁচ বার স্থাপত্যে সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনোনয়ন দেয়। পরবর্তীতে মুসলিম স্থাপত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ও অসামান্য অবদানের জন্য "আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার" এ  ভূষিত করা হয় তাকে। এফ আর খান আন্তর্জাতিক গগণচুম্বী ও নগরায়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন তখন৷

১৯৮১ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় নির্মিত হয় সৌদি আরবের সর্ববৃহৎ ও বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনাল। এই হজ টার্মিনালের নকশা করেছিলেন এফ আর খান। বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়েরও স্থাপত্য নকশা করেছিলেন এফ আর খান।  কম্পিউটার এইডেড ডিজাইনের সূচনা হয়েছিল ফজলুর রহমান খানের হাত ধরে। সত্তরের দশকের প্রথম ভাগে কম্পিউটার উন্মুক্ত ছিল না উন্নত বিশ্বের প্রকৌশলীদের কাছে। তখন প্রকৌশল বিদ্যায় আধুনিকতা এনেছিলেন এই বাঙ্গালী সন্তান।

১৯৯৮ সালে শিকাগো শহর কর্তৃপক্ষ শহরের সিয়ার্স টাওয়ারের নিচে জ্যাকসন সড়ক পশ্চিম পাশে এবং ফ্রাঙ্কলিন সড়কের দক্ষিণ পাশে সংযোগস্থলটিকে নামকরণ করে ফজলুর রহমান খান সড়ক নামে।

ছবি: সংগৃহীত

এতো কিছুর মধ্যেও স্বদেশের প্রতি অসম্ভব টান ছিল ফজলুর রহমান খানের।  নিয়মিত খবর রাখতেন নিজের জন্মভূমির। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে কিংবদন্তি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে সিয়ার্স টাওয়ারের নকশার কাজে। অথচ তখনই  স্বদেশের টানে অজস্রবার কাজ ফেলে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন স্বাধীনতার সপক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে নিক্সন সরকারের সমর্থনের বিরোধিতা করেছিলেন এফ আর খান। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার নেতৃত্বে প্রবাসীদের নিয়ে গঠিত হয় দুটি সংগঠন: ‘বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি ওয়েলফেয়ার আপিল’, যার উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে প্রচার-প্রচারণা এবং রিলিফ সংগ্রহ এবং ‘বাংলাদেশ ডিফেন্স লীগ’, এই সংগঠনটি কূটনৈতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিল। মূলত এই সংগঠনের তৎপরতায় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে সৈন্য পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করে।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনও তিনি। "সিয়ার্স  টাওয়ার নির্মাণে আমার যুক্ত থাকা  আমাকে যে পরিমাণ  আনন্দ আর সম্মান দিয়েছে তার চেয়ে বেশি আমি সম্মানিত বোধ করব যদি দেশীয় সম্পদে স্কাইস্ক্র্যাপার তৈরি করতে পারি।"

যদিও দুর্ভাগ্যবশত সেই সময়টা আর পাননি এফ আর খান। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ সৌদি আরবের জেদ্দা যাওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন স্থাপত্যের প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তি। মৃত্যুর পর তার দেহ শিকাগোতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গ্রাস ল্যান্ড কবরস্থানে দাফন করা হয়। এফ আর খানসহ শিকাগোর বিখ্যাত প্রায় ৫০ জনের কবর নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা রয়েছে ওই কবরস্থানে।

ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথকে আত্মায় ধারণ করতেন এফ আর খান। প্রায়ই পারিবারিক গানের আসরে নিজেই গাইতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। ছোটভাই ড. জিল্লুর রহমান খানের পিয়ানোতে সুর তুলতেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের। তাইতো তার শেষ ঠিকানাতেও লেখা আছে তার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুটি চরণ।

"তোমার হল শুরু

আমার হল সারা

তোমায় আমায় মিলে

এমনি বহে ধারা।"

ফজলুর রহমান খান চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন তার সৃষ্টিতে, থাকবেন লাখো স্থপতির অনুপ্রেরণা হয়ে।

আজ স্থপতি ফজলুর রহমান খানের জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধা তার প্রতি।

সূত্র:

Fazlur Khan (1929–1982): reflections on his life and works. by Aftab A. Mufti and Baidar Bakht

স্কলার্স বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত জার্নাল "এফ আর খান"

ফজলুর রহমান খানের উপর নির্মিত ওয়েবসাইট।  

American Architecture: A History, Leland M. Roth, Westview Press, 2003

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

আরও পড়ুন-

সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমেদ আজও প্রাসঙ্গিক

এক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিবেটি কাঁকন হেনইঞ্চিতা

‘যদি চলেও যাই, কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না’

স্বাধীনতাই একমাত্র গন্তব্য পূর্ব পাকিস্তানের: মওলানা ভাসানী

যার ওভারকোটের পকেট থেকে বেরিয়েছিল আধুনিক রুশ সাহিত্য আর সাহিত্যিকেরা

Comments