প্রচ্ছদ কাহিনী

অভিনেতা যখন নেতা

আসাদুজ্জামান নূর একাধারে একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অভিনেতা। ১৯৭৩ সালে তিনি থিয়েটার গ্রুপ নাগরিকে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘কোথাও কেউ নেই’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। এছাড়াও তার অয়োময়, বহুব্রীহি, প্রিয় পদরেখা, আজ রবিবার-এর মতো দর্শকসমাদৃত নাটক রয়েছে অনেক। ‘আগুনের পরশমণি’ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা। এটি ছাড়াও তিনি অভিনয় করেছেন হুলিয়া, দহন, শঙ্খনীল কারাগার, চন্দ্রকথা এবং দারুচিনিদ্বীপ সিনেমাতে। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী ডা. শাহীন আকতার, ছেলে সুদীপ্ত তার স্ত্রী কাজলী এবং একমাত্র নাতনি মধুরিমা ও মেয়ে সুপ্রভাকে নিয়ে তার সংসার। বর্তমানে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন।

আসাদুজ্জামান নূর একাধারে একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অভিনেতা। ১৯৭৩ সালে তিনি থিয়েটার গ্রুপ নাগরিকে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘কোথাও কেউ নেই’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। এছাড়াও তার অয়োময়, বহুব্রীহি, প্রিয় পদরেখা, আজ রবিবার-এর মতো দর্শকসমাদৃত নাটক রয়েছে অনেক। ‘আগুনের পরশমণি’ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা। এটি ছাড়াও তিনি অভিনয় করেছেন হুলিয়া, দহন, শঙ্খনীল কারাগার, চন্দ্রকথা এবং দারুচিনিদ্বীপ সিনেমাতে। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী ডা. শাহীন আকতার, ছেলে সুদীপ্ত তার স্ত্রী কাজলী এবং একমাত্র নাতনি মধুরিমা ও মেয়ে সুপ্রভাকে নিয়ে তার সংসার। বর্তমানে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। তার বর্ণিল জীবনে রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চা সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন রাফি হোসেন


রাফি হোসেন : নীলফামারীতে কীভাবে এলেন আপনার বাবা?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার জন্ম জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে নীলফামারীতে আসি। তখন আমার বাবা জমির মালিকানা বদলে এখানে এসেছিলেন। কেউ একজন আমাদের জমিতে গিয়ে উঠেছে আর তার জমি আমাদের দিয়েছে। এভাবে পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের বর্তমান এই বাড়িতে আসা। তখন আসলে এমন ঘটনা প্রায়ই হতো। সেভাবেই আমাদেরটাও হয়েছিল। আর বাবা এমন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন তা নিয়ে কখনো তার সঙ্গে কথা হয়নি। এভাবে জমি পরিবর্তন ছাড়াও বাবার এখানে একটি চাকরিও হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সেটাও একটা কারণ।


রাফি হোসেন : আপনার বাবা কী করতেন?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার বাবা-মা দুজনেই গার্লস স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমার মা ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা আর বাবা ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক। যদিও আমার বাবা প্রধান শিক্ষক হতে পারতেন কিন্তু যেহেতু মেয়েদের স্কুল তাই বাবা-মা দুজন মিলেই এই সিদ্ধান্ত নেন। এটি তাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল নয়, কিন্তু এটা গড়ে তোলা এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার পেছনে তাদেরই অবদান সবচেয়ে বেশি। এর পরে আমার বাবা আরো স্কুল করেছেন। এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তারা অনেক কাজ করেছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার বিষয়ে তাদের অবদান অনেক বেশি। এই অঞ্চলের যেকোনো বাড়িতে গেলে দেখবেন সেখানকার দাদী-নানী বা বাড়ির বৌ আমার বাবা-মায়ের ছাত্রী। আমার নির্বাচনেও এটা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে।


রাফি হোসেন : ছোটবেলা থেকেই কি আপনি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার বাবা এই ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। আর মা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা থাকায় স্কুলের নানান অনুষ্ঠান দেখতাম। তিনিও খুব উৎসাহী ছিলেন। আমার বাবা এবং মায়ের মধ্যে একটা বিষয়ে পার্থক্য ছিল। বাবা সবসময় বাহিরমুখী ছিলেন। তিনি সবাইকে নিয়ে হৈচৈ করতে বেশি পছন্দ করতেন। আর মা ছিলেন অন্তর্মুখী। তিনি তার স্কুল এবং শিক্ষকতাতেই বেশি সময় দিতে পছন্দ  করতেন। বাবা পড়ানোতে আগ্রহী ছিলেন না তা নয়। কিন্তু পড়ানোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিকে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন এবং এর জন্য সময় দিতেন। বাবার কাছ থেকেই আমার আবৃত্তি শেখা। আমার স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলে বাবাই বলতেন যাও অভিনয় কর। হাই স্কুলে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন সুনীল ব্যানার্জী, সবাই তাকে খোকনদা বলে ডাকত। তিনি ছিলেন ক্রীড়া শিক্ষক। ক্রীড়া শিক্ষক, কিন্তু স্কুলের সব সাংস্কৃতিক বিষয় তিনিই দেখতেন। আমার ভেতরে সাংস্কৃতিক মানসিকতা বেড়ে ওঠার পেছনে তাঁরও বিপুল অবদান আছে।


রাফি হোসেন : আপনি এখানে পড়াশোনা করেছেন কোন ক্লাস পর্যন্ত?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি এখানে হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি। পাস করার পর নীলফামারী কলেজেই ভর্তি হয়েছিলাম। এই কলেজটা এলাকার অভিভাবকরা মিলে করেছিলেন। তাদের কথা ছিল নিজেদের সন্তানরা যদি এখানে না পড়ে তাহলে তো মুশকিল। এই কারণে আমি এখানেই ভর্তি হলাম। এই কলেজে তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন এমাজউদ্দীন সাহেব। আমরা থাকাকালীন একবার কলেজে বেশ গোলমাল হয়ে ওনাকে বিদায় করে দিল। আমরা কয়েকজন ছিলাম ওনার খুব কাছের। আর উনিও অনেক ভালো শিক্ষক ছিলেন বলে ছাত্ররাও ওনার ভক্ত ছিল। আমরা তখন কয়েকজন রাগ করে কলেজ ছেড়ে দেই। নীলফামারী কলেজ ছেড়ে দিয়ে ভর্তি হই কারমাইকেল কলেজে। সেখানে একটি হোস্টেলে উঠে পড়াশোনা শুরু। কিন্তু বাবা-মার থেকে দূরে থেকে কোনো শাসন-বারণ ছাড়া অবস্থায় পড়াশোনা আর কী হয়? মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতাম। হোস্টেলের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে আমরা সবাই আড্ডা দিতাম। একসময় রেডিওতে কাজ করত আবৃত্তিকার আশরাফুল আলম ছিল আমার সহপাঠী। সে তখনই বেশ ভালো আবৃত্তি করত। এই নিয়ে ছিল আড্ডা। খেলাধুলার মধ্যে টেবিল টেনিস খেলতাম। আরেকটা কাজ করতাম সেটা হলো শহরে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। পরীক্ষার ফল প্রত্যাশা মতোই খারাপ হলো। আর্টস বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে টেনেটুনে পাস করলাম। এরপর বাবা আবার ধরে নিয়ে এলেন এখানে। নীলফামারীতে এসে বিএ ভর্তি হলাম আর জড়িয়ে গেলাম ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে। তখন আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। কলেজে জিএস নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিতলাম। আর এসবের পাশাপাশি কোথাও নাটক বা আবৃত্তি হলে সেখানে তো আমার অংশগ্রহণ থাকত নিশ্চিত। বিএ পাস করার পর আমি চলে আসি ঢাকা। ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’তে ভর্তি হই। দিনে এবং রাতে দুই সময়েই ক্লাস ছিল। রাজনীতির নেশার কারণে দিনে ভর্তি না হয়ে আমি ভর্তি হলাম রাতের সেশনে। সারাদিন মিটিং-মিছিলে সময় দিতাম আর রাতে গিয়ে ক্লাস করতাম।


রাফি হোসেন : আগে কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা হলো না?
আসাদুজ্জামান নূর : আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ ভাবতই না যে এত দূরে গিয়ে পড়তে হবে। আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, তুমি রাজশাহীতে গিয়ে ল’ পড়। নীলফামারী থেকে রাজশাহীতে যাওয়ার কথাই সবাই বলত। আমি রাজশাহী যেতে রাজি হইনি। কারণ আমার উদ্দেশ্যই ছিল ঢাকায় আসা। ঢাকা আসতে চাওয়ার দুটো কারণ ছিল, একটি তো রাজনীতি ছিল আর সেই সঙ্গে পত্রপত্রিকায় পড়তাম ছায়ানটের বা অন্যান্য সংগঠনের অনুষ্ঠান এখানে নিয়মিতই হচ্ছে। এসব দেখে আমার মনে হলো ঢাকা এলে আমি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরো বেশি ভালোভাবে জড়িয়ে থাকতে পারব। খেলা দেখতেও খুব পছন্দ করতাম আমি। তখন পাকিস্তানের হকি দল, ক্রিকেট দল আসত, তাদের খেলা দেখতাম।


রাফি হোসেন : পাকিস্তানের এসব দল আসত এখানে?
আসাদুজ্জামান নূর : হ্যাঁ, আসত। ইয়াহিয়া খান যখন বলল, এখানে সংসদ বসবে না তখন তো স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা চলছিল। আমরা তখন স্টেডিয়ামেই ছিলাম। মানুষ এই খবর শোনার পরই স্টেডিয়ামে ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়।
রাফি হোসেন : তার অর্থ বাংলাদেশে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ একদম হঠাৎ করে হয়নি। আগে থেকেই এর জনপ্রিয়তা ছিল। আমরা যেমন শুনি যে তখন ফুটবল জনপ্রিয় ছিল, এটা আসলে একচ্ছত্রভাবে ছিল না?


আসাদুজ্জামান নূর : এটা ঠিক যে ফুটবল তখন মানুষ পাগলের মতো দেখত। সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটটাও দেখত। এখন যেমন ক্রিকেটটা গ্রামে পর্যন্ত চলে গেছে, তখন এমন ছিল না। বাংলাদেশের কেউ তো তেমন ছিল না ক্রিকেট দলে। একটা-দুটো ছেলে খুব বেশি ভালো করলে হয়তো নিত, এমন অবস্থা ছিল। ক্রিকেট এবং হকিতে বাংলাদেশের দু-চারজন যারাই ছিল দলে, তাদের নিয়মিত খেলাত না। আমরা স্কুলে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ব্যাডমিন্টন এমনকি বেজবলও খেলেছি। বেজবল খেলা তো এখন হয় না। আমাদের ক্রীড়া শিক্ষকের কথা বললাম একটু আগে, উনিই এগুলো খেলাতেন। মাঠে যে খেলতে আসত না, স্যারের নজরে সে ছিল বখাটে। আসলে তখন শিক্ষকরা ছিলেন অন্যরকম। তারা শুধু পড়ার দিকে চাপ না দিয়ে সার্বিক দিকটাই দেখতেন। আমি এখনকার অনেক শিক্ষককেই বলি আগের শিক্ষকদের মতো হতে। তাদের কথা হয় যে আমার সময় কোথায়? আমি বলি আমাদের সময়ে যারা শিক্ষক ছিলেন তারাও এভাবে আপনাদের মতো নিজের বিষয়ে ক্লাস নিতেন। তার সঙ্গে আবার বাড়তি সময় দিয়ে ডিবেট করাতেন, স্কুলে বাগান করাতেন, খেলাধুলায় উৎসাহিত করতেন। আমরা আমাদের স্কুলে স্কাউটিং করতাম। সব মিলিয়ে আমাদের স্কুলে এমন কিছু নেই, যা আমরা করতাম না। এর কারণে আমাদের ছাত্রজীবনটা কাজ, খেলাধুলা আর পড়াশোনা সব কিছু মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল।


রাফি হোসেন : ঢাকায় এসে রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার বাবা বাম  ঘরানার মানুষ ছিলেন। সে প্রভাব পড়েছিল আমার ওপর। সে ভাবেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান। ঢাকা এসে ছাত্র ইউনিয়নে কাজে যুক্ত হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উঠেছিলাম ইকবাল হলে। এখন জহুরুল হক হল। ইকবাল হল তো তখন রাজনীতির আখড়া। তখন বাম বল আর ডান বল সব ছাত্রনেতা সেখানেই। তোফায়েল ভাই, রাজ্জাক ভাই, সিরাজুল আলম খানসহ আরো অনেকে ছিলেন। মূলত ছাত্রলীগের নেতারাই বেশি ছিল কিন্তু আমরাও কম যাইনি।


রাফি হোসেন : তোফায়েল ভাইরা তো আপনার অনেক সিনিয়র, তাই না?
আসাদুজ্জামান নূর : তোফায়েল ভাই আমার থেকে তিন-চার বছরের সিনিয়র হবেন। সিরাজুল আলম খান আমাদের থেকে অনেক বড় কিন্তু হলে থাকতেন। আমু ভাই, মহিউদ্দিন ভাই আরো অনেকেই  হলে থাকতেন। বাম দলেরও অনেক ছাত্রনেতাও তখন হলে থাকতেন। হলের জীবনে আমাদের প্রায়ই যে সমস্যাটা হতো সেটা হলো, এনএসএফ এসে হামলা করত। এনএসএফ অর্থাৎ মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এসেই আমাদের  লেপ-তোশক পুড়িয়ে দিত। এক সময় আমরা লেপ-তোশক কেনাই বাদ দিলাম। কতবার আর কেনা যায়? তখন আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন আর ছাত্রলীগের সম্পর্কটা অনেক ভালো ছিল। আন্দোলন আর প্রতিযোগিতা থাকলেও সম্পর্ক  খারাপ ছিল না। ভর্তি হয়েই হলে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আমি বক্তৃতা দিলাম। বক্তৃতা দেয়ার কারণে প্রভোস্ট মহোদয় আমাকে হল থেকে বের করে দিলেন। হলের  হাউস টিউটর ছিলেন নূর মোহাম্মদ স্যার, তাকে গিয়ে আমি বললাম, ‘আমাকে তো হল থেকে বের করে দিয়েছে, আমার তো ঢাকায় কোনো থাকার জায়গা নেই। উনি বললেন, ‘থাকার জায়গা লাগবে কেন, তুমি এখানেই থাকবা।’ আমি বললাম, ‘আমাকে তো বের করে দিয়েছে থাকব কীভাবে।’ উনি বললেন, ‘আরো ভালো হয়েছে তোমার জন্য। এখানেই থাকবা আর তোমাকে তো এখন আর হল ভাড়াটাও দিতে হবে না।’ তখনকার স্যাররাও এমনই সহৃদয় ছিলেন। এভাবেই আসলে ছাত্রজীবন পার করেছি। পকেটে এক টাকা থাকলেই সারা দিনের জন্য নিশ্চিন্ত থাকতাম। তিন বেলার খাবার হয়ে যেত।


রাফি হোসেন : তখন ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কী ছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত তারা ছাত্র ইউনিয়ন করত। দেখা যেত যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ছিল সাংস্কৃতিক দিকে এগিয়ে তারা ছাত্র ইউনিয়ন করত। ছাত্রলীগেও যে সংস্কৃতিমনা মেধাবী কেউ ছিল না তা তো নয়, কিন্তু চর্চা হয়তো কম ছিল। ছাত্রলীগে মেধাবী ছাত্ররা না থাকলে এত বড় একটা আন্দোলন তারা কীভাবে করতে পারে। পরবর্তীকালেও তো আমরা দেখলাম, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যারা কাজ করতেন তারা তো প্রত্যেকেই খুব মেধাবী এবং মননশীল মানুষ। আমরা অনেকে অনেক মত পোষণ করতাম কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে তো সবাই ছিলাম একমত। সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করেছি। এই একটা বিষয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম যেটা নিয়ে কারো মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না।


রাফি হোসেন : অভিনয় জীবন শুরু হলো কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি সংসদ নামের একটি সংগঠন ছিল। এটা অনেক পুরনো হলেও মাঝখানে অনেক দিন এটার কার্যক্রম ছিল না। একসময়ের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব এটার পদে আসীন হয়েছিলেন। পরে যখন আবার এটাকে নতুন করে শুরু করা হলো তখন আমাকে সভাপতি করা হলো এবং আবুল হাসনাতকে (যিনি এখন কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক) সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এভাবে আমরা এই সংগঠনটাকে পুনরায় শুরু করি। এটার উদ্যোগে আমরা অনেকগুলো বড় বড় অনুষ্ঠান করেছিলাম। এর মধ্যে সৈয়দ হাসান ইমামের পরিচালনায় রক্তকরবী নাটকটিও আমরা করেছিলাম। তখন আসলে এসব নাটক বা অনুষ্ঠান যা-ই হতো তার কোনোটাই বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল না। এর সবই ছিল পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের অংশ। এটা একদম পরিষ্কারভাবেই যে আন্দোলনের অংশ ছিল তা নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। সেখানে গণসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীত যে অনুষ্ঠানই হোক তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন। নাটকগুলোও ছিল তারই অংশ। বাংলা একাডেমিতে একটি মুক্ত মঞ্চ করে সেখানে রক্তকরবী করেছিলাম। প্রায় দশ হাজার লোক নাটকটি দেখেছিল। মুস্তফা ভাই রাজার অভিনয় করেছিলেন, কাজী তামান্না ছিলেন নন্দিনী আর আমি অভিনয় করেছিলাম কিশোরের ভূমিকায়। এরপর আমরা ম্যাক্সিম গোর্কির মা করেছি, সমরেশ বসুর একটি নাটক করেছি। এছাড়াও অসংখ্য পথনাটক করেছি। শহীদ মিনারে এবং শ্রমিক এলাকাগুলোতে গিয়ে গানের অনুষ্ঠান করতাম। ইকবাল আহমেদ আমাদের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, তার খুব ভালো গলা ছিল, তিনি গান করতেন। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোর রিহার্সাল করাতেন আলতাফ মাহমুদ, অজিত রায়, শেখ লুৎফর রহমান, মাহমুদুন্নবীসহ আরো অনেকেই। আমরা তো তাদের কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারতাম না। আলতাফ ভাই তখন সিনেমাতে কাজের সুবাদে বেশ সচ্ছল  ছিলেন। তিনিই উল্টো আমাদের হাতে দশ টাকা দিয়ে বলতেন সবাই মিলে চা খেয়ে নিস। এভাবে এই শিল্পীরা আমাদের সঙ্গে দিনের পর দিন কাজ করেছেন। এভাবে আসলে আমার অভিনয়ের শুরু। তখন প্রম্পট করতাম, সেট কোথায় হচ্ছে সে বিষয়ে খবর রাখা, শিল্পী কে এলো না তার সঙ্গে যোগাযোগ করা এসব করতাম। রক্তকরবী যখনই শুরু করতাম তখনই এক বিশাল আন্দোলন শুরু হয়ে যেত, হরতাল হতো। একবার তো আমাদের সব সেট রাস্তাতে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তখনকার দিনে  হরতাল মানে ছিল অন্যরকম কিছু। হরতালের দিন সাইকেলও বের হতো না। হরতাল ডাকলেই রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, বাজার-ঘাট সব খালি। এখনকার দিনের হরতালের মতো না যে, গাড়ি-ঘোড়া সবই চলবে। আমার মনে পড়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর সিদ্ধান্ত হলো, শহীদ মিনারে একটি ছবির একজিবিশন হবে। সারা রাত জেগে শিল্পীরা যে অনেক বড় বড়  ছবি এঁকেছিলেন তা এক কথায় অসাধারণ। সেগুলো তো এখন নেই। কারণ একাত্তরের যুদ্ধে কোথায় কী গেছে কোনো হিসাব নেই। কিন্তু এগুলোর ফটোগ্রাফ কারো কাছে থাকা উচিত ছিল। রশীদ তালুকদার ভাই তার সব ছবি দৃকে দিয়ে গেছেন। সেখানে খুঁজলে হয়তো এগুলোও পাওয়া যেতে পারে। রশীদ ভাইয়ের তোলা আমার একটি ছবি আছে। হরতালের দিন আমরা সচিবালয়ের গেট বন্ধ করে সেখানে শুয়ে আছি সেই ছবি। আমরা গেট বন্ধ করেছিলাম যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভেতরে ঢুকতে না পারে আর ওপরে ইপিআর বালির বস্তার পেছনে থেকে বন্দুক তাক করে আছে। এরপর মিসেস তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার ছবি আছে। ছয় দফা আন্দোলনের পর তো সব রাজনৈতিক নেতাকে জেলে দিয়েছিল। আমরা তখন রাজবন্দিদের পরিবারের সাহায্যের জন্য রাস্তায় চাঁদা তুলতাম, যে যা দেয়। মিসেস তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে আমরা চাঁদা তুলছি এমন একটি ছবি সেটা। তখন আমরা ছাত্র ছিলাম মানে আমাদের বিরাট সম্মান। নরসিংদীতে গিয়েছিলাম গামছা-লুঙ্গির বাজারে টাকা তুলতে। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাজারে একটা আলোড়ন পড়ে গেল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসেছে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ আমাদের অবাক করেছিল। তারা নিজেরাই একে অন্যকে উৎসাহিত করছিল টাকা দিতে।


রাফি হোসেন : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার কখন দেখা হয়?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার কখনো সামনাসামনি তার সঙ্গে দেখা হয়নি। যা-ই দেখেছি তাঁকে দূর থেকে। সাতই মার্চের ভাষণের সময়ে এবং তার আগে-পরে মিলিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে  দেখেছি। স্বাধীনতার পরও অনেক অনুষ্ঠানে দেখেছি তাঁকে। তখন তো আসলে এত নিরাপত্তার ঝামেলা ছিল না। সবাই তাঁর কাছে চলে যেতে পারত।


রাফি হোসেন : রেডিও-টিভিতে আপনার যাত্রা শুরু হলো কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর : এটা স্বাধীনতার পর। স্বাধীনতার পর নিজের আর্থিক অবস্থা ঠিক রাখতে একটা চাকরি নেই।
রাফি হোসেন : এর মধ্যে কি আপনার ল’ পড়া শেষ করতে পেরেছিলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : ল’ শেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথম পর্ব পরীক্ষা দেয়ার পর দ্বিতীয় পর্ব আর দেয়া হয়নি। এর মধ্যে তো স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমি চলে যাই ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য। আমি সীমান্ত পার করেছিলাম ৮ এপ্রিল। আমি ওই দিন চলে যাই কুচবিহার, হলদিবাড়ি। প্রথম দিকে এলোমেলো থাকলেও ধীরে ধীরে গুছিয়ে উঠে আমাদের নিজস্ব ক্যাম্প হয়। যুদ্ধ শেষে আমি কী করব এবং কোথায় চাকরি করব তা খোঁজা শুরু করি। খুঁজতে খুঁজতে রেজা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। রেজা ভাই পাকিস্তান আমলে ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে বলার পর তিনি বললেন আমি একটা ছাপাখানা করছি আপনি এখানকার ম্যানেজার। একটি ছাপাখানা থেকে পুরনো মেশিন কিনে এনে বসালাম। তখন অফিসটা ছিল তোপখানার মোড়ে। সেখানে আমার বেতন ধরা হলো আড়াইশ’ টাকা। সেখানে খাটনিও ছিল প্রচুর। অনেক সময় রাতে টেবিলের ওপর খবরের কাগজ বিছিয়ে ঘুমিয়েছি। প্রুফ রিডিং থেকে শুরু করে সব কাজই আমাকে করতে হতো। একসময় রামেন্দুদা আমাকে বললেন, আমি একটা পত্রিকা বের করছি থিয়েটার, তুমি এটার সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ কর। প্রথমদিকে কয়েকটি সংখ্যায় আমি কাজ করেছিলাম, পরে আমি রাশিয়ান এম্বাসিতে যখন চাকরি পেলাম তখন সহ-সম্পাদক হলেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। সেখানে কপি লিখতে আসতেন চিত্রালীর আহমেদুজ্জামান চৌধুরী। তিনি একদিন আমাকে বললেন তুমি চিত্রালীতে লেখালেখি কর না কেন? আমি বললাম এখন লিখব, কী করতে হবে বলেন। তখন তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন চিত্রালী সম্পাদক এসএম পারভেজের কাছে। এসএম পারভেজ আমাকে বললেন, এখন মঞ্চনাটক শুরু হয়েছে টুকটাক, তুমি এটার ওপরে একটা রিপোর্ট লেখ। সেটা করতে গিয়ে আমি কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিলাম। সাক্ষাৎকার নেয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, আলী যাকের, বজলুর রশীদ আর লায়লা সামাদ। আলী যাকেরের সাক্ষাৎকার নেই সবার শেষে। তখন এশিয়াটিকের অফিস ছিল বিমানের অফিসের পাশে করিম চেম্বারের ছয়তলায়। সাক্ষাৎকার শেষে তিনি আমাকে বললেন, সন্ধ্যাবেলা আপনি আমাদের রিহার্সালে আসেন দেখে যাবেন। ওখানে গিয়ে আমি দেখি, স্বাধীনতার আগে যাদের নিয়ে নাটক করেছি তাদের অনেকেই সেখানে আছে। আতাউর রহমান, আবুল হায়াত, তামান্না সবাই ছিলেন সেখানে। ওরা তো আমাকে দেখে ভীষণ আনন্দিত এবং আমিও তাই। ওরা আমাকে দেখে বলল, এই তো প্রম্পটার পাওয়া গেছে। এরপর ওরা আমাকে ধরে বসল এই দলে যোগ দেয়ার জন্য। আমি তখন রামেন্দু মজুমদারের কাছে  জানতে চাইলাম যোগ দেব কিনা? রামেন্দুদা বললেন, আমি তো একটা দল করব, এখানে তুমি যোগ দেবে না আমারটাতে কাজ করবে। তখন ফেরদৌসী আপা বললেন, তুমি কবে দল করবে তার জন্য ও বসে থাকবে নাকি। ও ওখানে কাজ করলে করুক। এভাবে আমি নাগরিকে যোগ দিলাম এবং এখনো এই দলের সঙ্গেই আছি। আমি এখনো নাগরিকের কোষাধ্যক্ষ।


রাফি হোসেন : তার মানে আপনি থিয়েটার করবেন বলে থিয়েটারে যোগ দেননি?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি কোনো পরিকল্পনা করে থিয়েটারে যোগ দেইনি। ভালো লাগত নাটক কিন্তু এভাবে করার পরিকল্পনা ছিল না। এই দলের সঙ্গে যোগ দেয়ার পরও আমি মূলত ব্যাকস্টেজের কাজ করতাম। ব্রিটিশ কাউন্সিলে যখন নাটক শুরু হলো তখন রবিবার বেলা ১১টায় নাটক হতো। বাকি ইতিহাস নাটকটি দিয়ে শুরু করলাম। দর্শক ভালোই হতো। নাটকটাও খুব ভালো হয়েছিল। আবুল হায়াত, আতাউর রহমান, সারা যাকের এবং নায়লা জামান সেখানে অভিনয় করত। মানুষ টিকিট কেটে নাটক দেখা শুরু করল। একসময় ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে বলল, আমরা তো হল সংস্কার করব, তোমাদের আর দিতে পারব না। স্বাধীনতার পর টিকিট বিক্রি করে নিয়মিতভাবে নাটকের এই প্রচলনটা এভাবে নাগরিকই প্রথম শুরু করে। এর আগে মামুনুর রশীদ, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুরাও নাটক করেছে। কিন্তু নিয়মিত না। যা-ই হোক আমরা তো ব্রিটিশ কাউন্সিলের হল হারিয়ে জায়গা খুঁজতে লাগলাম কোথায় নাটক করা যায়। একদিন সারা এসে বলল মহিলা সমিতির কথা। আমরা তখন সেখানে গেলাম। স্বাধীনতার পর ওটা আর কোনোভাবেই ব্যবহার করা হয়নি। আমরাই গিয়ে ওটাকে পরিষ্কার করে ব্যবহার উপযোগী করলাম। দর্শক বসানোর জন্য বিয়েবাড়িতে যে চেয়ার ভাড়া দিত সেগুলো ভাড়া করে আনতাম। সেট বানানো থেকে শুরু করে টিকিট বিক্রি এই কাজগুলোর সবই আমরা নিজেরা করতাম। তখন তো আমাদের টেকনোলজির অনেক ঘাটতি ছিল। কিন্তু সেগুলোর মানের কথা যদি এখনকার সঙ্গে তুলনা করা যায় তো অনেক কষ্ট লাগে। এখন টেকনোলজি অনেক উন্নত হলেও সেই মানের নাটক আর হয় না। সেই অভিনয়, সেই ক্যানভাস আর নেই।


রাফি হোসেন : থিয়েটারের এমন অবস্থা হওয়ার পেছনে কী কারণ বলে আপনার মনে হয়? এই অবস্থা শুধু থিয়েটারে না, নাটক আর সিনেমারও একই অবস্থা।
আসাদুজ্জামান নূর : আমি নিজেও এটা বুঝি না। থিয়েটারের অনেককেই দেখছি নাটকে কাজ করছে এবং দর্শক তাদের নিয়েছে ভালোভাবেই। অথচ তারা নিজেদের  অবস্থা না বুঝে দর্শক হাসানোর জন্য অনেক বাজে মানের নাটক করে যাচ্ছে। তারা যদি নিজেদের সত্যিকারের অবস্থানটা বুঝে চলত, তাহলে হয়তো থিয়েটারের আর নাটকের এমন অবস্থা হতো না। লম্ফঝম্ফ করে লোক হাসালে সেটা তো আর কমেডি হবে না। হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখেও মানুষ হাসত। সেখানে তো কেউ কমেডিয়ান না। কিন্তু নাটকের গল্প আর পরিস্থিতি এমন হোত যে যে মানুষের হাসি পেত। তার নাটকে প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের চরিত্রই ফুটে উঠত সুন্দরভাবে। তার নাটকে বড় আর ছোট বলে কোনো চরিত্র ছিল না। সব চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ।  হুমায়ূন ছাড়াও তখন আরো অনেকে  নাটক লিখেছেন। তখন মমতাজ স্যার, আমজাদ হোসেন বেশ কিছু ভালো নাটক লিখেছেন। আতিক ভাই সামাজিক বার্তা দিয়ে একধরনের সিরিয়াস নাটক লিখেছেন। এছাড়াও আবদুল্লাহ আল মামুন, জিয়া আনসারী নাটক লিখতেন।  আমি ক’দিন আগেই বলছিলাম, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাস্টার্স পাস লোক বাছাই করে তাকে দিয়ে টিভি পরিচালক বানাতে গেলে ভালো কিছু হবে না। আগে পরিচালক নেয়া হতো কাজটি যে জানে তাকে ডেকে নিতে হবে। আবদুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকতা করতেন। তাকে জোর করে এনে পরিচালক হিসেবে চাকরি দেয়া হয়েছে।


রাফি হোসেন : একটা সময় মানুষ নাটকের সঙ্গে মিশে যেত। আপনার করা বাকের ভাই চরিত্রের কথাই ধরেন, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে কি হবে না তা নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করেছে মানুষ। টুনির মৃত্যু চাই না বলে সেøাগান দিয়েছে। এখন কিন্তু তা হয় না। আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে মানুষ নাটক ঠিকমতো দেখেই না।
আসাদুজ্জামান নূর : এই নাটকের শেষ পর্ব যেদিন হয়, তখন আমি ইস্কাটনে থাকি। সেখানে একটি বাড়ির ছয়তলার ফ্ল্যাটে থাকতাম। ফ্ল্যাটের বারান্দা ছিল রাস্তার দিকেই মুখ করা। কোনো কারণে বারান্দায় গিয়েছিলাম সেদিন, রাস্তা দেখে মনে হলো শহরে কারফিউ চলছে। একদম খালি সব। কোনো দোকান খোলা নেই, গাড়ি-ঘোড়া এমনকি রিকশাও চলছে না। একদম সুনসান সব। ওই রাতে একটি ঘটনা হয়। অনেকে ভাবছিল, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে না, কিন্তু ফাঁসি হয়ে গেল। অনেক জায়গা থেকে টেলিফোন আসা শুরু হলো। এক পর্যায়ে আমি টেলিফোন ধরাই বন্ধ করে দিলাম। ওই রাতে আমার বোম্বে যাওয়ার কথা। একটি বিজ্ঞাপনের কাজ করার জন্য। আমি রাতে ব্যাগ গোছাচ্ছি যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে, এর মধ্যে দারোয়ান এসে বলল বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে একটা লোক এসেছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি কারণ জানতে চাইলে দারোয়ান বলল, বাচ্চাটা খুব কান্নাকাটি করছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি বললাম ঠিক আছে পাঠাও। তখন রাত প্রায় সাড়ে ১২টা বাজে। ওনারা যখন এলো তখন দেখলাম একটি ২০-২২ বছরের ছেলের সঙ্গে একটি ১০-১২ বছরের ছেলে। ছেলেটি বলল, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত এত রাতে আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য। অনেক চেষ্টা করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অফিস থেকে আপনার ঠিকানা নিয়ে আপনার বাসায় আমি এসেছি। এই বাচ্চাটা আজ আপনার নাটক দেখে মনে করেছে আপনি মরে গেছেন। কোনোভাবেই তাকে বোঝাতে পারছি না যে আপনি বেঁচে আছেন। এত কান্নাকাটি করছে যে আমরা কোনোভাবেই তাকে থামাতে পারছি না। কিছুতেই তাকে খাওয়াতেও পারছি না, ঘুম পাড়াতেও পারছি না। বাধ্য হয়ে আপনার ঠিকানা জোগাড় করে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।’ আমি তাদের ঘরে এনে বসালাম। বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলে তাকে স্বাভাবিক করে, নাশতা করিয়ে তারপর পাঠিয়ে দিলাম।


রাফি হোসেন : এমন একটি ভালো সময় পার করে বর্তমানে আমাদের টেলিভিশনের নাটকের অবস্থা এত খারাপ কেন বলে আপনার মনে হয়? এখন দেখেন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে, নাটকের সংখ্যা হয় ঈদের সময় প্রায় হাজার খানেক। কিন্তু কেউই তো ঠিকমতো নাটক দেখে না।
আসাদুজ্জামান নূর : এই অবস্থার একটা বড় কারণ হচ্ছে চ্যানেল বেড়ে যাওয়া। এতগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য প্রয়োজনীয় লেখক, কলাকুশলী বা টেকনিক্যাল লোক আমাদের দেশে এখনো নেই। আমাদের দেশের চ্যানেল যদি সর্বোচ্চ ৬ থেকে ১০ এর ভেতরে থাকত, তাহলে ঠিক ছিল।


রাফি হোসেন : আরো তো চ্যানেল আসছে।
আসাদুজ্জামান নূর : হ্যাঁ, আসছে। লক্ষ্য করে দেখুন হাতে গোনা কয়েকটা ছাড়া কেউই কিন্তু ব্যবসা করতে পারছে না। সব মিলিয়ে খুব কঠিন অবস্থা।


রাফি হোসেন : এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
আসাদুজ্জামান নূর : সারা পৃথিবীতে এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর যে প্রবণতা তা হলো একটি চ্যানেল একটি বিষয় নিয়ে কাজ করবে। যে খবর দেখাবে সে শুধু খবর দেখাবে, যে এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেল করতে চায় সে শুধু তাই করবে, যে সিনেমা দেখাতে চায় সে শুধুই সিনেমা দেখাবে। এমনভাবে শিক্ষামূলক, গানের, কার্টুনের বা বিভিন্নভাবে নিজেদের চ্যানেল সেট করে নিতে পারে। জগাখিচুড়ি পাকিয়ে সব চ্যানেল একই রকম হলে মানুষ তো আকর্ষণ হারাবেই। সব চ্যানেলেই খবর, নাটক, টক শো, গান, সিনেমা সব একসঙ্গে চললে তা চ্যানেলগুলোর জন্যও তো কঠিন ব্যাপার। দিনে যে কয়বারই  খবর দেখাক না কেন এত ঘটনা কাভার করতে অনেকগুলো স্টাফ নিতে হচ্ছেই। দিনে একবার খবর দেখাতে গেলেও যে পরিমাণে স্টাফ লাগবে, সারা দিন শুধু খবর দেখাতে গেলেও সেই একই পরিমাণে স্টাফ লাগবে। এরপর প্রোগ্রাম যদি দেখি, বাইরে থেকে যতই নেই, ইনহাউজ কিছু প্রোগ্রাম তো লাগবেই। তার জন্যও স্টাফ লাগবে। এত পরিমাণে যোগ্য লোক কোথায় পাবে।


রাফি হোসেন : সরকার কি এ বিষয়টা নিয়ে ভাবছে?
আসাদুজ্জামান নূর : সরকার থেকে প্রতিটা চ্যানেলে খবর বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। আমার মনে হয় এটা দরকার ছিল না। সরকার সব কিছু নিয়ে ভাববে কেন।আপনি তো চ্যানেল চাইছেন।


রাফি হোসেন : প্রোগ্রাম নিয়েও তো কোনো মনিটরিং নেই, আর একের পর এক নতুন চ্যানেল আসছেই।
আসাদুজ্জামান নূর : এটার থেকেও যেটা বেশি দুশ্চিন্তার বিষয় তা হলো অনেক বিজ্ঞাপনদাতাই এখন ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে এবং সেই ক্ষেত্রে তারা অজুহাত দেখাচ্ছে, তাদের পণ্য তারা ভারতে বিপণনের জন্য এই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। ভারতেরও তো অনেক পণ্য আমাদের এখানে বিপনন করছে। তারা তো এখানকার কোনো চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয় না। বিজ্ঞাপনের এই অবস্থানের কারণ হচ্ছে আমাদের দর্শকরা ভারতের চ্যানেল দেখছে। যার কারণে সেখানে ভারতীয় পণ্যের যে বিজ্ঞাপন চলে তাতে আর আমাদের দেশের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রয়োজন হয় না। ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও এখন ভাবছে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন না দিয়ে ভারতের চ্যানেলে দিয়ে দেয়াই ভালো। কারণ ওই চ্যানেলগুলোই এদেশে বেশি দেখছে। লাক্সের তো একই বিজ্ঞাপন দু’দেশেই চলে। দু’জায়গায় আর আলাদা করে তারা কেন দেবে? ওখানে হিন্দিতে যে বিজ্ঞাপন চলছে তাও তো এখানকার দর্শকরা দেখছে। ওখানকার বাংলা চ্যানেলও এখানে দেখছে। এসব বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজেট হিসাব হয় আঞ্চলিক অফিসগুলো থেকেই। আঞ্চলিক অফিসগুলো যদি এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিয়ে নেয় সেক্ষেত্রে আমরা কিছু করতেও পারব না। এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো বিজ্ঞাপনগুলো অন্তত বন্ধ করে দেয়া। আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনগুলো ওরা দেখিয়ে যে লাভ ওরা করছে তার থেকে কিন্তু কোনো ট্যাক্স আমাদের সরকারকে দিচ্ছে না।


রাফি হোসেন : ভারতের অনেক চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করে এমনভাবে যে শুধু বাংলাদেশের দর্শকরাই এই বিজ্ঞাপন দেখতে পায়। অন্য দেশের দর্শকরা একই সময়ে ওই চ্যানেলে অন্য বিজ্ঞাপন দেখে।
আসাদুজ্জামান নূর : বিশ্বকাপের সময় এই ব্যবস্থাটা থাকে। একেক দেশের জন্য বিজ্ঞাপন আলাদা থাকে। ইংল্যান্ডে যে বিজ্ঞাপন চলে আমরা সেটা দেখি না। এটা নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। আর সেই সঙ্গে আমাদের পত্রপত্রিকাগুলোতেও লেখালেখি হওয়া উচিত।
রাফি হোসেন : আমরা এই বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং কয়েকটি গোলটেবিল বৈঠকও আমরা করেছি এই বিষয় নিয়ে। আমরা চাই এর একটি সমাধান। এই খাত থেকে সরকারও ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের আলোচনা থেকে উঠে এসেছে, সব চ্যানেলই যাতে পে চ্যানেল করা হয়। এতে করে বাংলাদেশের দর্শকও যে যেটা দেখতে চায় সেটা দেখবে। ক্যাবল অপারেটররা একচ্ছত্রভাবে এই বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করছে। পে চ্যানেল হয়ে গেলে সেটাও সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে আর ট্যাক্সও পাবে। সঙ্গে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোও তাদের টিআরপি বুঝতে পারবে এবং দর্শকের পছন্দ বুঝে তাদের প্রোগ্রাম সাজাবে।


আসাদুজ্জামান নূর : এভাবে চলতে থাকলে যে শুধু আমাদের টেলিভিশনগুলোই বিপদে পড়বে তা নয়, এদেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাও বিপদে পড়বে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কাজ করা নির্মাতা, কলাকুশলী, টেকনিশিয়ান সবাই কাজ হারাবে।


রাফি হোসেন : এবার একটু ভিন্ন বিষয়ে আসি। আপনি নেতা হিসেবে কোন নেতাকে নিজের আইডল মনে করেন?
আসাদুজ্জামান নূর : আমার বাড়িতে বামপন্থী রাজনীতির একটা আবহ ছিল। আমার বাবা বামপন্থী রাজনীতি করতেন। তিনি মিটিং-মিছিল বা বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন না। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে জড়িয়ে ছিলেন। পাকিস্তান আমলে তো কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ছিল। ফলে গোপনে গোপনে যতটুকু করা যায় তিনি করতেন। বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথাবার্তা যা হতো, সেখান থেকেই নিজের ভেতরে এক ধরনের আগ্রহ আসে। শুরুতে লেনিন, মাও সে তুং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যখন আরো ঘনিষ্ঠ হলাম তখন মণি সিংহের কথাগুলো আমাকে আরো অনুপ্রাণিত করত। বাম রাজনীতির ধারায় যেসব শিল্পী-সাহিত্যিককে দেখেছি, তারাও অনুপ্রাণিত করত আমাকে। একটা পর্যায়ে আমরা বঙ্গবন্ধুকে পেলাম। আমরা বাম, ডান বা মধ্য যে যে রাজনীতিই করতাম তাদের সবার এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করলেন এই একজন মানুষ। যে কারণেই তখনকার বামপন্থীরাও বাস্তবমুখী একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এই আন্দোলনকে সমর্থন দিলেন। অনেক বিষয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই যে দেশ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাতে আমাদের কারো কোনো দ্বিমত ছিল না। নেতা তখন একজনই। একদল ছিল চীনপন্থী নকশাল, যারা বলত এটা হচ্ছে দুই শুয়োরের লড়াই। এই লড়াই শেষ হয়ে যে-ই জিতুক শোষিত মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এ রকম কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত কথাও ছিল। যা-ই  হোক মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের নেতা বলেন অনুপ্রেরণা বলেন আর যা-ই বলেন সবই ছিলেন বঙ্গবন্ধু।


রাফি হোসেন : আপনি যদিও আপনার বাবার কথা খুব একটা বলছেন না, কিন্তু মনে হচ্ছে তিনিও একটা শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন আপনার রাজনৈতিক জীবনে।
আসাদুজ্জামান নূর : হ্যাঁ, অবশ্যই। আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাজনীতিতে জড়িয়েছি, এর সম্পূর্ণ অনুপ্রেরণা আমার বাবার।


রাফি হোসেন : আপনার নাটক লেখার শুরু কবে থেকে?
আসাদুজ্জামান নূর : মঞ্চের জন্য প্রথম রূপান্তর করেছি দেওয়ান গাজীর কিসসা। এর আগেও আলী যাকেরের সঙ্গে বিদগ্ধ রমণিকুল নিয়ে কাজ করেছি। আতাউর রহমানের সঙ্গে ‘ভেপুতে বেহাগ’।  এগুলো ছিল রূপান্তর।


আসাদুজ্জামান নূর : আমার আসলে মঞ্চে যাত্রা শুরু হলো বিদগ্ধ রমণিকুল এবং তৈল সংকট নামের দুটি ছোট নাটক দিয়ে। এই নাটক দুটি একসঙ্গে মঞ্চস্থ হতো। একটি হতো বিরতির আগে এবং আরেকটি হতো বিরতির পরে। রশীদ হায়দারের লেখা তৈল সঙ্কট বাসাবাড়িতে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে ছিল। তখন তো গ্যাস ছিল না, লাকড়ির চুলায় অথবা তেলের চুলায় রান্না হতো। সে সময় তেল নিয়ে বাজারে বেশ সঙ্কট পড়ে গিয়েছিল, তা নিয়েই এই নাটকটি লেখা। নাটকে মূল ভূমিকায় ছিলেন আবুল হায়াত এবং সুলতানা কামাল। নাটকের একটি দৃশ্য ছিল এমন যে, তেলের জন্য মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক সময় পরও তেলের দোকান আর খোলে না। এই দোকানের পাশেই আবুল হায়াতের বাসা থাকে। দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ বিরক্ত হয়ে দোকানে ভাঙচুর করতে করতে একপর্যায়ে আবুল হায়াতের বাসায়ও ঢুকে যায়। ঢুকে দেখে গোবেচারা আবুল হায়াতের বাসার খাটের নিচে বহু কষ্টে জোগাড় করা এক টিন কেরোসিন তেল। মাথা গরম থাকা লোকজন ভাবে আবুল হায়াত তেলের মজুদকারী। এই ভেবে সবাই মিলে তাকে দেয় গণপিটুনি। এই দৃশ্যের মহড়া চলছিল যেখানে মানুষের ভিড়ের মধ্যে একজন ছিল বাদল রহমান। মহড়ায় হঠাৎ করে বাদলের ঘুষি লেগে আবুল হায়াতের নাক ফেটে গেল। রক্ত পড়ার পরিমাণ এত বেশি হয়েছিল যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। এই ঘটনা যেদিন ঘটল, তার একদিন পরেই নাটকটির মঞ্চায়ন। নাটক বাতিল করারও কোনো উপায় নেই। তখন আলি যাকের বললেন যে এই চরিত্র নূরকে করতে হবে। ও যেহেতু প্রম্পট করে, এই চরিত্রের সব ডায়ালগ মোটামুটি ওর মুখস্থ আছে। আমি তো বললাম, অসম্ভব এত বড় চরিত্র আমি করতে পারব না। তখন তাদের পীড়াপীড়িতে দিবারাত্রি মহড়া করে করে অভিনয়টা করেই ফেললাম। মঞ্চস্থ হওয়ার পর সবাই বলল মোটামুটি ভালোই হয়েছে অভিনয়, চলবে। এভাবেই মঞ্চে অভিনয়ে আমার যাত্রা শুরু।


রাফি হোসেন : দেওয়ান গাজীতে কীভাবে এলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : দেওয়ান গাজী তো আরো অনেক পরে রূপান্তর করেছি। যতদূর মনে পড়ে ’৭৬-এর দিকে এটা শুরু করি। ’৭৭-এর ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে এটা লেখা শেষ হলো। মূলত তৈল সঙ্কটের পর থেকেই একটু একটু করে মঞ্চের নাটকে কাজ করতে থাকলাম।


রাফি হোসেন : টেলিভিশনে আপনার শুরুটা কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর : ’৭৪-এ টেলিভিশনের একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করি। রামেন্দুদাকে আমি একসময় বলেছিলাম, টেলিভিশনে অভিনয় করার সুযোগ থাকলে আমি করতে চাই। উনি মামুন ভাইকে বলে রেখেছিলেন। প্রথম কাজের জন্য মামুন ভাই ডাকলেন, সেটা ছিল একদম ছোট একটা চরিত্রে। দুই বা আড়াই মিনিটের উপস্থিতি ছিল পর্দায়। ওই নাটকে নায়ক ছিলেন হায়দার রিজভি।  কিন্তু অভিনয় করার সময় একদম ঠিকঠাকভাবেই বলতেন। আর নায়িকা ছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার। এই নাটক দিয়েই আমার টেলিভিশন নাটকে যাত্রা শুরু। এরপর আস্তে আস্তে এগিয়েছি। এক সময় তো রেডিও নাটকও করেছি। সেটাও আমার খুব পছন্দের একটা কাজ।


রাফি হোসেন : টেলিভিশন নাটকে নায়কের ভূমিকায় কখন প্রথম কাজ করলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : ঠিক মনে নেই। তবে সম্ভবত বড় কোনো চরিত্রে আমার প্রথম কাজ বরফ গলা নদী-তে। এই নাটকেই প্রথম সুবর্ণার অভিনয় করা।


রাফি হোসেন : নূর ভাই, আপনার একটা বিশেষ বিষয় যে আপনি দাড়ি নিয়েই কাজ করে গেলেন একদম আদ্যোপান্ত।
আসাদুজ্জামান নূর : একদম প্রথম দিকে আমার দাড়ি ছিল না। প্রথম দিকের দু-একটা নাটক আমার দাড়ি ছাড়াই। দাড়ি রেখেছিলাম যখন আমি রাশিয়ান ইনফরমেশন সেন্টারে চাকরি করি। সেখানকার নিয়ম ছিল অনেক কড়া। সকাল ৮টায় অফিসে পৌঁছতে হতো, নিয়মিত শেভ করে যেতে হতো এমন অনেক নিয়ম। আমি তখন থেকেই বেশি সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি না। তারপর আমার ঘুম থেকে উঠে শেভ করে অফিসে যাওয়ার জন্য আগে ওঠার একটা ব্যাপার ছিল। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই দাড়িটা রেখে দিলাম। আমার অনেক বন্ধু এটা নিয়ে মজাও করেছে যে, প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে দাড়ি রেখেছি। পরে একসময় সবাই বলল, দাড়িতে খারাপ লাগছে না। আর দু-একটা নাটকে অভিনয়ের পরও দেখলাম, সবাই এটা ভালোভাবেই নিচ্ছে। পরে বিভিন্ন দিক চিন্তা করে দাড়িটা রেখেই দিলাম। আমাকে অনেক সময় অনেকে বলেছে দাড়িটা কেটে ফেলতে, কিন্তু আমি আর তা করিনি।


রাফি হোসেন : আপনার পরিচালক বা আপনার কখনো মনে হয়নি যে এটার কারণে চরিত্রায়ণে কোনো বাধা হচ্ছে?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি সবসময় যেটা মনে করেছি, আমি যে চরিত্রে অভিনয় করব
সেটা যদি আমি ধারণ করতে পারি তাহলে সেটা আমার চেহারায় ফুটে উঠবেই। দাড়ি থাকা আর না থাকায় কিছু আসে-যায় না। আর চরিত্র ধারণ করতে না পারলে দাড়ি না থাকলেই যে ভালো কিছু হবে তা না। অনেক সময় অনেক পরিচালক দাড়ি কাটতে বলেছেন কিন্তু করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে সবাই মেনে নিয়েছেন।
রাফি হোসেন : আমরা আসলে এমন কাউকে পাইনি যে নিজের সিদ্ধান্তেÍ এমন অটল থাকতে পেরেছে। রেডিওতে কীভাবে শুরু করলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : শুরুটা আমার ঠিক এখন মনে পড়ছে না। তবে রেডিও আমার কাছে খুব পছন্দের কাজ ছিল কারণ ওই নাটকগুলোতে মানুষ কোনো চরিত্র দেখতে পারত না। কিন্তু শুধু শুনেই তারা চরিত্রগুলো দেখতে পেত। আর আমি যেহেতু গলা নিয়ে খেলতে পারতাম তাই এই কাজটি খুব মনোযোগ নিয়ে করতাম। শাহবাগ থেকে যখন আগারগাঁও চলে গেল বাংলাদেশ বেতার, তখন দূরত্বের কারণে আর যাওয়া হতো না।


রাফি হোসেন : আপনার কি সিনেমায় নিয়মিত হতে ইচ্ছা হয়নি?
আসাদুজ্জামান নূর : সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহ একটু কম ছিল দুটি কারণে। প্রথমত ভালো সিনেমা খুব বেশি হতো না। আর দ্বিতীয়ত আমার কেন জানি মনে হতো অত বড় একটি পর্দায় আমাকে খুব একটা মানাবে না। আমি ছোটখাটো মানুষ তো তাই। এছাড়াও একধরনের অস্বস্তি আমার ভেতরে কাজ করত। পরে অবশ্য দেখতাম, অনেক ছোটখাটো শিল্পীরাই সিনেমায় কাজ করে যাচ্ছে।


রাফি হোসেন : আপনার তো একটা জনপ্রিয়তা ছিল।
আসাদুজ্জামান নূর : আমি যে খুব বেশি সিনেমার অফার পেয়েছি তাও না। অফারও কমই পেয়েছি, এর মধ্যে কয়েকটি করেছিও। আর বাণিজ্যিক সিনেমার জন্য তো আমার অফার আসত না।


রাফি হোসেন : এটা নিয়ে আপনার ভেতরে কি কোনো অতৃপ্তি আছে যে আরো কিছু সিনেমাতে কাজ করলে ভালো হতো?
আসাদুজ্জামান নূর : একেবারে যে অতৃপ্তি নেই তা বলব না। এখনো ইচ্ছা আছে, আমি যদি কোনো মূল চরিত্রে বয়স্ক ভূমিকায় কাজের সুযোগ পাই তবে করব। এখন এমন অনেক সিনেমাই হচ্ছে। সব সিনেমাই যে শুধু নায়ক-নায়িকা নিয়ে হতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। আর প্রেমের সিনেমায় কাজ করা আমার কখনোই খুব একটা পছন্দের ছিল না। যে কারণে আমার সঙ্গে কারো কোনো জুটি ছিল না। তখন তো অনেক জুটি ছিল। আমার সঙ্গে কারো জুটি ছিল না। আমি চরিত্রের প্রয়োজনে সবার সঙ্গেই নাটক করেছি। আমি চাকরের চরিত্র করেছি, জমিদারের চরিত্র করেছি, মাস্তান বা খুনির চরিত্র করেছি। রোম্যান্টিক চরিত্র না করে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা আমার খুব পছন্দের ব্যাপার ছিল।


 রাফি হোসেন : আপনি কখন সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : মূলত যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন তো শিল্পীরাও এর সঙ্গে আন্দোলন গড়ে তুলল। ওই আন্দোলনের সময়ই জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার একটা যোগাযোগ গড়ে ওঠে।


রাফি হোসেন : এর আগে কি তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না?
আসাদুজ্জামান নূর : যোগাযোগ ছিল। তিনি আমার নাটক পছন্দ করতেন। তিনি আমাদের অনেক মঞ্চনাটক দেখতেও এসেছেন এবং নূরলদীনের সারাজীবন দেখে তো তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন। এই চরিত্রের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক মিল আছে। আর নাটকটাও ওভাবেই লেখা হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ই মূলত তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ। ’৯৬-এর নির্বাচনের আগে তিনি আমাকে বললেন, আপনি নির্বাচন করেন। প্রথমে আমি রাজি হইনি। রাজি না হওয়ার কারণ ছিল আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। নির্বাচন করতে গেলে তো মানুষের সঙ্গে একটা যোগাযোগ দরকার, সেটা আমার তেমন ছিল না। নীলফামারীর  বাড়িতেও তখন থাকি না। সেটা ভাড়া দেয়া ছিল। আমি এসব কারণেই জানালাম, এবার থাক পরেরবার নির্বাচনে যাব। এরপর নীলফামারীতে যাওয়া-আসা শুরু করলাম এবং তাঁকে জানালাম, আমি কাজ শুরু করেছি। এরপর আমি ’৯৮ থেকে ’০১ পর্যন্ত জনহিতকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। তখন দল ক্ষমতায় ছিল বিধায় এলাকাতে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ সহজে করতে আমরা সক্ষম হলাম। বেশ কিছু স্কুল এমপিওভুক্ত হলো। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করাসহ আরো বিভিন্ন কর্মকা-ে নিজেকে জড়িত রেখেছি। সব থেকে বড় যে কাজটি হয়েছিল তা হলো আমার নির্বাচনী এলাকায় একটি ইপিজেড স্থাপন করা হয়েছিল এবং এটির উদ্বোধন করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটা আমার জন্য একটা পজেটিভ অবস্থান তৈরি করে। ’০১-এর নির্বাচনে তো দল হেরে গেল নির্বাচনে কিন্তু আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে আমি জিতেছিলাম। ’৫৯ জনের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। সেই সময়ে ইপিজেডটি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এখন এটার অবস্থা ভালো। গত সাত-আট বছরে এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন এই ইপিজেডে প্রায় ১৬ হাজার লোক কাজ করে। এই ইপিজেডটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি দারুণ উপহার নীলফামারীবাসীর জন্য। এরই বদৌলতে এখন সেখানে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। আমাদের এই এলাকায় খুব খারাপ অবস্থা ছিল। ২০০৪ সালেও মঙ্গায় মানুষ আত্মহত্যা করেছে এখানে। এখন সব মিলিয়ে মঙ্গাটা একেবারেই নেই। মানুষের অবস্থাতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। একেবারেই দারিদ্র্য নেই তা বলা যাবে না, তবে অনেক কমেছে। আমরা চেষ্টা করছি দারিদ্র্য আরো কমিয়ে এনে মানুষকে আরো বেশি স্বাবলম্বী করে তুলতে। ’০১-এর নির্বাচনের মাধ্যমেই আমার রাজনীতিতে পুরোপুরি ঢুকে পড়া।


রাফি হোসেন : রাজনীতিতে আপনাদের মূল লক্ষ্যটা আসলে কি।
আসাদুজ্জামান নূর : আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শুধু ঢাকায় মনোনিবেশ না করে বিভিন্ন তৃনমূল পর্যায়ে  কাজ করা। সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের পাহাড়ি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করা। আমার এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ায় আমি নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনিও এটা নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। এই বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারলেও ভিন্নভাবে এর একটি উপায় আমরা বের করেছি। চেষ্টা করছি সেভাবেই প্রতিটি স্কুল এবং কলেজে সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির একটি ব্যবস্থা করতে। আশা করছি আমরা সেটা পারব। উপজেলা পর্যায়ে যারা এসব সাংস্কৃতিক কাজ করছে তাদের আমরা আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছি এবং করব। তাদের আমরা বলেছি, আপনারা আরো বড় জায়গা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন, আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব। আমাদের উদ্দেশ্য সারাদেশের বেসরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয় ঘটিয়ে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে এটাকে নিয়ে যাওয়া।


রাফি হোসেন : আপনি এখন রাজনীতিতে থেকেই কাজ করে যেতে চান।
আসাদুজ্জামান নূর : আমি তো এখন দু’ভাবে কাজ করি। একটি হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দায়িত্ব হিসেবে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছি। আর দ্বিতীয়ত নিজ এলাকার মানুষদের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করা। মন্ত্রিত্ব আর সংসদ সদস্য দুটিই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।


রাফি হোসেন : লেখালেখিটা আর নিয়মিত করলেন না।
আসাদুজ্জামান নূর : লেখালেখিটা আর কেমন জানি হলো না। সব কাজের চাপে এটা আর হয়ে ওঠেনি। আরেকটা বিষয় আমি আসলে আগে থেকে ভাবিনি যে আমি কী হব বড় হলে। আমি প্রতি দিনের জন্য বাঁচি। আমি লেখক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা সাংস্কৃতিক কর্মী হতে চেয়েছিলাম এমন কিছু আমি বলতে পারব না। সময় আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছে বিভিন্ন জায়গাতে।


রাফি হোসেন : আপনার এই বর্ণাঢ্য জীবনটা নিয়ে আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছা
করে না?
আসাদুজ্জামান নূর : এটা ঠিক, আমি আমার জীবনে অনেক বড় মানুষদের সঙ্গে চলার সুযোগ পেয়েছি। এটাতে নিজেকে আমি সৌভাগ্যবান মনে করি। এসব নিয়ে লেখার ইচ্ছা তো মনে জাগেই। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অনেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।


রাফি হোসেন : ফটোসুন্দরীদের খুঁজে বের করেছেন তো আপনারাই।
আসাদুজ্জামান নূর : বিচিত্রার শাহাদাত চৌধুরীর সঙ্গে আমি শুরু করেছিলাম লাক্স-আনন্দ বিচিত্রা ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতা। যেটা এখন লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার নামে চলছে। তখন হাজার হাজার ছবি আসত। এর পরে ক্লোজআপ তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ। এটাও আমিই শুরু করেছি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এখন দেশে এত ব্যবসা করছে সেটাও আমরাই শুরু করেছি। প্রথম ’৯৬-এর একটি মিনি বিশ্বকাপ হয়েছিল। তখন সাবের হোসেন চৌধুরী বিসিবির সভাপতি। সে আমাকে বলল, নূর ভাই এমন একটি আয়োজন করতে যাচ্ছি সেখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি রেস্টুরেন্ট তৈরি করতে হবে মাঠের মধ্যে। আর সঙ্গে অন্যান্য কাজ তো আছেই। এটার জন্য বোম্বে থেকে লোক নিয়ে আসতে হবে। তখন আমি বললাম, বোম্বে থেকে লোক আনবেন কেন, আমরাই কাজ করব। এভাবেই শুরু করলাম। এটার পরেই ছোটলু ভাই (আলী যাকের) বললেন, চল আমরা এটাকে শুরু করি নিয়মিতভাবে। এরপরই শুরু হলো আমাদের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি।


রাফি হোসেন : হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বটা কেমন ছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : হুমায়ূন আমার অভিনয় পছন্দ করে নওয়াজেশ ভাইকে বলেছিল, তার পরের নাটকে আমাকে নিয়ে কাজ করতে চায়। এভাবেই ওর সঙ্গে কাজ শুরু। ওর সিরিয়ালগুলো আমাকে দিয়েই শুরু। এই সব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, নক্ষত্রের রাত এগুলোতে আমি কাজ করেছি। এছাড়াও শিক্ষামূলক একটা ধারাবাহিক ছিল ‘সবুজ-ছায়া’। একটা সময় ছিল যখন হুমায়ূন আমার কথা চিন্তা করেই নাটক লিখত। সেও আমাকে বুঝে নাটক লিখত আর আমিও ওকে বুঝতাম যে ও কী চায়? একটা ঘটনাও ঘটেছিল একবার। হুমায়ূন সরকারের একটা শিক্ষামূলক কাজ করেছিল। সেখানে শিক্ষকের একটা চরিত্র ছিল। পুরো শ্যুটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওর মনে হলো শিক্ষকের চরিত্রটা ঠিক মনঃপূত হচ্ছে না। সে আবার পুরো শ্যুটিংটা নতুনভাবে করে আমাকে নিয়ে। তখন আমি রাজনীতিতে ঢুকে গেছি, নাটকে তেমন সময় দিতে পারি না। কিন্তু ও বলল, আপনাকে এটা করতেই হবে। সেই সময় আমার সময় বের করতে অনেক কষ্ট হলেও কাজটা করেছিলাম। হুমায়ূন এমন একজন ছিল, যে কাজের মান নিয়ে কখনো আপস করত না। হুমায়ূনের পরের দিকের নাটকগুলো অবশ্য প্রথমদিকের নাটকের মতো আলোচিত হয়নি। এর একটা কারণ হতে পারে সিনেমার দিকে বেশি ঝুঁকে যাওয়া। এই কারণে নাটকের প্রতি হয়তো মনোযোগ একটু কম হয়ে গিয়েছিল।


রাফি হোসেন : উনি আপনাকে নিয়ে সিনেমা কেন ভাবলেন না?
আসাদুজ্জামান নূর : আমিই আসলে সময় দিতে পারিনি। এতে তার কিছু করার ছিল না। আগুনের পরশমণি তো আমি করলামই। এখনো তো অনেকেই বলে, মুক্তিযুদ্ধের যতগুলো ভালো সিনেমা হয়েছে, তার মধ্যে এটা একটা। তারপর আমি সময় দিতে পারিনি। আরেকটাতে সময় দিলাম অনেক পরে, সেটা হচ্ছে চন্দ্রকথা। এই সিনেমাতে তার সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হয়েছিল। তাকে আমি বলেছিলাম, আমার যে বয়স আপনি চাইছেন সে বয়স এখানকার মেকআপ আর্টিস্টরা করতে পারবে না। আপনি যদি বাইরে থেকে মেকআপ আর্টিস্ট আনেন তাহলে এই ভূমিকায় আমি কাজ করব। যদিও  সে তা করেনি। এই কারণে আমার মনটাও একটু এলোমেলো ছিল কাজ করার সময়। যার ফলে আমার নিজের মনে হয়েছে, আমি ভালো করতে পারিনি এই সিনেমাতে।


রাফি হোসেন : হুমায়ূন আহমেদকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আসাদুজ্জামান নূর : সে টেলিভিশন নাটকের ধারাটাই বদলে দিয়েছিল। আগে রোম্যান্টিক নাটক বেশি ছিল। হুমায়ূন এই ধারায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তার গল্পগুলো ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবন নিয়ে, কিন্তু তার ভেতরে হিউমার ছিল। নাটকের সংলাপ, দৃশ্যের যে উপস্থাপন তা সব কিছুর থেকে তাকে আলাদা করে দিল এবং তার নাটকে অভিনয়গুলো ছিল একদম স্বাভাবিক অভিনয়। তার মতো করে না পারলেও এখন অনেক নাটক করা হয় সেই ধারাতেই। হুমায়ূনের নাটক করার আগেও তো অনেক নাটক করেছি, কিন্তু ওর নাটক করার সময় বুঝলাম, সংলাপ মুখস্থ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। আমাদের মুখের যে স্বাভাবিক কথা সেগুলোই ছিল নাটকের সংলাপে। আর অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটি চরিত্র নানাভাবে করা যায়। সেই সুযোগ সে করে দিত। নানাভাবে সে টিপস দিত। রাজনীতিতে জড়ানোর কারণে আমি এক সময় যখন সময় দিতে পারলাম না তখন সে আমার ওপর খানিক বিরক্তই ছিল। কারণ ওর লেখা তখনকার নাটক ছিল আমাকে চিন্তা করে লেখা। আমি না থাকার কারণে সেখানে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এটা যেমন সত্য সে আমার প্রতি মনোক্ষুণœ ছিল, তেমনি এটাও সত্য তার সঙ্গে কাজ না করাটা আমি খুব মিস করতাম সবসময়ই। যৌথ শিল্পকর্মই ছিল মূলত তার নাটকের সাফল্যের কারণ।


একটা পর্যায়ে হুমায়ূন নিজেই নির্দেশনার কাজটাও করতে লাগল।  হুমায়ূন খুবই অগোছালো ছিল এবং বেশ মুডি ছিল। অল্পতেই ও খুব রেগে যেত  আবার অল্পতেই খুব খুশি হয়ে যেত। নাটক নির্মাতা গোছানো না হলে তার নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়। একটা নাটক হয়তো তিন দিনে শেষ করা সম্ভব, সেটা হুমায়ূন সাত দিনেও শেষ করছে না এমনও হয়েছে। ওর শ্যুটিং করতে ভালো না লাগলে বলে দিয়েছে আজকে আর শ্যুটিং হবে না। এসব কারণেই ওর সময় বেশি লাগত। আসলে হুমায়ূন মানুষটা ছিল একটু ভিন্নরকম। একবাক্যে বলা যাবে না যে ও ঠিক কেমন ছিল।


রাফি হোসেন : ওনার কাছের বন্ধু বলতে যারা ছিল তার মধ্যে আপনি তো একজন। আপনার সঙ্গে এই বন্ধুত্বটা কীভাবে হলো?
আসাদুজ্জামান নূর : হুমায়ূন নিজের কথা খুব একটা বলত না। কিন্তু বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গল্প করতে খুব ভালোবাসত। আমি দেখেছি তার মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা। হুমায়ূনের মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন এবং আমিও তাকে খুবই শ্রদ্ধা করতাম। এটি আবার হুমায়ূন বিশেষভাবে লক্ষ্য করত যে, তার মায়ের এতটা স্নেহধন্য আমি। এটাও হয়তো একটা কারণ হতে পারে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার।


রাফি হোসেন : আপনার সঙ্গে তার কোনো বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে?
আসাদুজ্জামান নূর : আগুনের পরশমণি সিনেমাতে শেষের দিকে কিছু কাজ চলছিল। এমনি একদিন শ্যুটিংয়ে আমার একটাই দৃশ্যে কাজ ছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে সেটার অপেক্ষা করছিলাম। একপর্যায়ে ওকে বলতে গেলাম, এভাবে তো হয় না। ও খুব রেগে গেল আর সঙ্গে আমিও রেগে গিয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে কিছু বাকবিত-া হওয়ার পর আমি চলে আসি, সেদিন আর শ্যুটিংই করিনি। সেদিনই মধ্যরাতে আমার বাসায় কলিংবেল বেজে উঠল। ঘুম থেকে উঠে দেখি হুমায়ূন ফুল এবং পুরো টিম সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছে। এমন অনেক ঘটনা আছে ওর সঙ্গে। বলে শেষ করতে পারব না। আর বন্ধু-বান্ধবের ব্যাপারে হুমায়ূন খুব সচেতনভাবে নির্বাচন করে নিত। সবার সঙ্গে সে মিশত না। তার সব বন্ধু যে নাটকের ছিল তাও না। যদিও তাদের অনেককে দিয়ে নাটক করানোর চেষ্টা করেছে সে। আরেকটা ঘটনা, একবার হুমায়ূন তার নুহাশপল্লীতে আমাদের সবাইকে ডাকল। ডেকে বলল, সবাইকে নিয়ে সে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনশন ধর্মঘট করবে। তখন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত-শিবিরের সমস্যার কারণে সেটা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ছিল। একটা বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন বন্ধ থাকলে ছাত্রদের ক্ষতি হবে ভেবে সে এই কাজ করার প্ল্যান করেছিল। সবাই তো তার কথায় হুজুগে রাজিও হয়ে গেল। আমি বললাম এত মানুষ যে যাব সেখানকার যে অবস্থা তাতে সবার নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে। সেখানে গিয়ে আমরা খাব কোথায় বা অন্যান্য কাজকর্ম করব কীভাবে তার তো একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। সেই সময় সবার টনক নড়ল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। তার সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তাসহ আরো অনেক বিষয়ে সহযোগিতা নিলাম আর সিলেটের বেশ কিছু ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে বাকি সব বন্দোবস্ত করে রওনা দিলাম। ট্রেনে ওঠার পর আমরা খবর পেলাম, যে ঘরটাতে বসে আমরা মিটিং করে এসেছি সেটা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরটা ছিল কাঠ, বাঁশ আর ছনের তৈরি। শুনেই বুঝেছিলাম, এটা কারা করেছে? তারপরও আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। হুমায়ূন রাজনীতি থেকে সবসময় দূরে থাকত কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু কাজ সে করে বসত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হুমায়ূন বই পাঠাত। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি যখন বন্দি, তখনও হুমায়ূন তাকে বই পাঠিয়েছে। আরেকবার ওর একটা বইয়ে বিচারকদের বিপক্ষে কিছু লিখে ফেলায় একজন বিচারক তাকে শোকজ করেছিলেন। তা নিয়ে বেশ বিব্রত ছিল হুমায়ূন। কেউ কিছু বলছিল না দেখে আমি সাহস করে একটা লেখা লিখে ফেললাম। এটা প্রথম আলোতে দরজার ওপাশে নামে ছাপা হয়। এটা লেখার পর ও বেশ খুশি হয়েছিল যে কেউ একজন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
 আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে, একবার একটা শ্যুটিংয়ের সময় কালো ঘোড়া ব্যবহার করে শ্যুটিং করেছিলাম। এর মধ্যে কিছুদিন বিরতি পড়ে শ্যুটিংয়ে। নুহাশপল্লীতে তখন যাওয়া অনেক কঠিন ছিল, কারণ রাস্তা তেমন ছিল না। বিরতির পর আবার যখন শ্যুটিংয়ের জন্য নুহাশপল্লীতে গেলাম, তখন দেখি এক ছেলে জুতা কালি করার ব্রাশ দিয়ে একটা সাদা ঘোড়াকে কালো করার চেষ্টা করছে। কারণ জানতে চাইলাম ঘটনা কী? তখন সে জানাল, যেটা দিয়ে আগে শ্যুটিং হয়েছিল সেই কালো ঘোড়াটা বিক্রি হয়ে গেছে। এই পদ্ধতিতে কালো ঘোড়া বানানোর বুদ্ধিটা ছিল হুমায়ূনের। তাকে আমরা অনেক করে বোঝালাম যে এটা সম্ভব না। আপনি বরং নাটকের স্ক্রিপ্টটা একটু পরিবর্তন করে নেন। পরে তিনি তাই করলেন।


রাফি হোসেন : লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া আর কাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগত আপনার?
আসাদুজ্জামান নূর : মমতাজ স্যারের নাটক করেছি, আবদুল্লাহ আল মামুনের লেখা নাটক ছিল। আমি জিয়া আনসারীর অনেক নাটক করেছি। কিন্তু তার নাটকগুলো বেশিরভাগই প্রেমের নাটক। অনেকটা কবিতার মতো সংলাপ করতে হতো সেখানে। এক পর্যায়ে তা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। রেডিওতে একজন ছিলেন মাহমুদুর রহমান। আমি আমজাদ ভাইয়ের নাটকও করেছি।


রাফি হোসেন : আপনার বিয়ে সম্পর্কে কিছু বলুন।
আসাদুজ্জামান নূর : বিয়ে পারিবারিকভাবেই হয়েছে। আমার বড় মামী আর আমার মা মিলে ওকে পছন্দ করে। ওর এক কাজিনের সঙ্গে আমার এক কাজিনের বিয়ে হয়েছে। সেই সুবাদে আমার মামী তাকে সহজে খুঁজে পায়। তখন ও মাত্রই ডাক্তারি পাস করেছে।


রাফি হোসেন : আপনি কি কখনো আপনার পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে  চাননি, নাকি পছন্দের কেউ ছিল না?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি চেষ্টা করেছি, প্রেমও করেছি। কিন্তু কী করে যেন ঠিক ওই অর্থে প্রেম হয়নি। আমি যার প্রতিই অনুরক্ত হতাম তার প্রতি অনুগত থাকতাম। মানুষে মানুষে তো পার্থক্য থাকেই। তাই আমি কাউকেই দোষও দেই না। সমাজের অবস্থান, সচ্ছলতা, নিরাপত্তা এসব দিক থেকে মেয়েরা অনেক ভাবেও। অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়েও অনেক দূর এগিয়ে তারপর পিছায়। আবার অনেকে এমন আছে, আমাকে যেমন ভেবেছিল, আমার সঙ্গে মেশার পর বুঝল যে আমি আসলে তেমন নই।


রাফি হোসেন : ভাবী তো ডাক্তার আর আপনার ব্যস্ততা অন্যদিকে। এই দুটির মিল করলেন কীভাবে?
আসাদুজ্জামান নূর : ও তো নিজে গান করে, আর সংস্কৃতির দিকেও একটু ঝোঁক আছে। যার কারণে সেদিক থেকে কোনো আপত্তি বা অসুবিধা হয়নি। তবে নাটকের জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বাইরে থাকতে হয়েছে। এটা করতে না হলে আমি আমার বাচ্চাদের আরো একটু বেশি সময় দিতে পারতাম, যেটা উচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে এগুলো নিয়ে আমার ভেতরে একধরনের অনুশোচনাই হতো। একজন স্ত্রীকে ঠিক যেভাবে সময় দেয়া উচিত বা একজন পরিবারের সদস্য হিসেবেও যতটা সময় দেয়া উচিত আমি তা দিতে পারিনি। এটা নিয়ে যে কোনো সমস্যা হয়েছে তা নয়, কিন্তু নিজের ভেতরে খারাপ লেগেছে।


রাফি হোসেন : তার মানে সব বিষয়েই ভাবী আপনাকে অনেক সাপোর্ট করে গেছেন।
আসাদুজ্জামান নূর : হ্যাঁ, সে তো বটেই। তখন তো করেছেই, এখনো করে যাচ্ছে। এখন রাজনীতির কারণে ঝামেলাও তো অনেক বেশি। ওকেও অনেক বেশি চিন্তায় থাকতে হয়। সেটাও সে মেনে নিয়েছে। মেনে নিয়েছে বললে অবশ্য কম বলা হবে। কারণ আমার নির্বাচনী এলাকায় সে দীর্ঘদিন মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছে। এখনো মাঝে মাঝেই করার চেষ্টা করে। সবকিছু মিলিয়ে আমার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরির যে ব্যাপার তাতে তার অনেকটা অবদান আছে। আমার পরিবারের সদস্যরা একটু ভিন্ন। অনেক রাজনীতিবিদের পরিবারের সদস্যরাও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকে কিন্তু আমার স্ত্রী, ছেলে বা মেয়ে কেউই এর ধারেকাছেও নেই। তবে ওরা সামাজিক কাজগুলো খুব আগ্রহ নিয়েই করে। আমার রাজনীতিতে দু’জন মানুষের সহায়তার কথা বলতেই হবে। আলী যাকের ও সারা যাকের। আমি তো কাজকর্ম  ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে চলে গেলাম। তখন আমার কাজ তারা সামলেছেন। শুধু অর্থ নয়, নৈতিক সমর্থনটাও দিয়েছেন পুরো মাত্রায়।
রাফি হোসেন : অভিনয় থেকে অনেকেই রাজনীতিতে গেছেন ইতিপূর্বে। কিন্তু আপনার মতো এত সাফল্য আর কেউ পাননি এদেশে।
আসাদুজ্জামান নূর : আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে আমিই সর্বপ্রথম নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কবরী, তারানা হালিম ও মমতাজ পরে সংসদ সদস্য হয়েছেন। আমি যখন নির্বাচন করে জিতে আসি তখন খুব কঠিন অবস্থা ছিল। দলের মাত্র ৫৯ জন জিতেছিলেন, যার মধ্যে আমি একজন।


রাফি হোসেন : শুরুতে আপনি যে রাজনীতি করতেন তার সঙ্গে এখন যে রাজনীতি দেখছেন তা কীভাবে বর্ণনা করবেন?
আসাদুজ্জামান নূর : বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এমন একটি দেশে রাজনীতি করা খুব কঠিন। কারণ মানুষের চাহিদা থাকে অনেক বেশি। এখানে কাজ করার জায়গা থাকে প্রচুর কিন্তু জাতীয় বাজেট সে তুলনায় প্রতুল থাকে না, এমনকি কাজ করতেও তো সময় লাগে। শুধু যে অবকাঠামো জাতীয় কাজই করলেই হয় তা না। অনেকের আছে অর্থাভাবের সমস্যা। তো এমন অনেক কিছু মিলিয়েই উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতি করা কঠিন। আমি আমার জায়গা থেকে মানুষকে সবসময়ই বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমার যতটুকু সাধ্য আছে তার সবটুকু দিয়েই আপনাদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করব, তার বেশি আমি পারব না। আমি দেখেছি মানুষকে বোঝালে মানুষ তা বোঝে। তারা অন্তত এটা বুঝতে পারে কে তাদের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অনেকে মনে করে, আমি যেহেতু মন্ত্রী তো আমার কাছে এলেই বুঝি চাকরি সহজেই হয়ে যাবে। আমি তাদের বোঝাই, দেখ আমার মতো এমন ৬০ জন মন্ত্রী এবং সাড়ে তিনশ’ জন সংসদ সদস্য আছেন।  ৬০ জন মন্ত্রীর সঙ্গে সমসংখ্যক সচিব আছেন। এছাড়াও আমাদের রাজনৈতিক আরো অনেক নেতানেত্রী আছেন। সবারই তো নানাভাবে তদবির থাকে। একটা চাকরির জন্য একশ’টা তদবির আছে। এভাবে বোঝালে তারা বোঝে, সবাই না হলেও বেশিরভাগ বোঝে।


রাফি হোসেন : আপনি তাহলে বলতে চাচ্ছেন, আপনার রাজনীতিতে সফলতার কারণ আপনি মানুষের কাছে এসে তাদের বোঝাতে পেরেছেন।
আসাদুজ্জামান নূর : আমি কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দেই না। যতটুকু পারি ততটুকুই করি এবং বলি। কেউ আমার কাছে কিছু চাইলে তার জন্য কোনো মন্ত্রী বা সচিবকে বলতে হলে তা আমি বলি। এর মধ্যে আমি কোনো ফাঁকিবাজি করি না। একরকম বলে অন্য রকম কিছু করি না। না পারলে তাকে বুঝিয়ে বলে দেই পারব না। আর যদি সাধ্যের মধ্যে থাকে তাহলে সেটার জন্য চেষ্টা করি এবং যথার্থভাবেই করি। এ জন্যই হয়তো আমার প্রতি মানুষের আস্থাটা জন্মেছে।


রাফি হোসেন : এখন সাম্প্রতিক সময়ে  জঙ্গি বা এই জাতীয় সমস্যাগুলো চরমে উঠেছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আসাদুজ্জামান নূর : এই সরকারকে সরিয়ে ফেলার জন্য অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও করেও ব্যর্থ হয়েছে। এখন এভাবে চেষ্টা করছে। এটা সরকারকে চাপে রাখা, সরকারের ইমেজটাকে খারাপ করা এবং দেশকে সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচয় করানোর একটা চেষ্টা। বাংলাদেশকে যদি একটা সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচয় করানো যায় তাহলে আমরা নানাভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়ে যাব। এর ফল কী হতে পারে তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া, ইরাক এমন দেশগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। আমরা কোনোভাবেই সেই অবস্থায় যেতে চাই না।  
আমরা যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা একাত্তরে বা বায়ান্নতে দেখেছি সেটা জাতীয় জীবনে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত বা বিকশিত নয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে ধর্মকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনা করেছে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ। তখন ধর্মের নামে নানাভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।  ধর্ম পালন করার মধ্যে তো দোষের কিছু নেই। মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ী বা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা লোকজন এটাকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। একশ্রেণির লোক সাম্প্রদায়িকতাকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে তাদের স্বার্থে। তাদের মতামত হচ্ছে আমি যেটা বলছি এটাই ইসলাম। এর বাইরে আর কিছু নেই। আগে তো এই জিনিসটা ছিল না। এটাই এখন একধরনের উগ্রতার রূপ নিয়েছে। এটার মধ্যে যেমন রাজনীতি আছে, তেমনি সহজ-সরল কিছু মানুষও আছে যারা বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত  হয়ে এগুলো করছে।


রাফি হোসেন : এগুলো নিরসনে সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে?
আসাদুজ্জামান নূর : আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তো তাদের কাজ করেই যাচ্ছে। আমি মনে করি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এটাকে প্রতিহত করা সম্ভব না। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সহনশীল একটা সমাজ গঠনে কাজ করতে হবে। এই সহনশীল একটা সমাজ গড়ে তোলার যে মানসিকতা তার চর্চা করতে হবে। সরকার এখানে সহযোগিতা করবে। আর সেখানে শিক্ষা এবং সংস্কৃতি চর্চাটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় উপাদান। পারিবারিক সম্পর্ক, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সামাজিক পরিবেশও জরুরি।


রাফি হোসেন : আপনি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এ নিয়ে যদি কিছু বলেন।
আসাদুজ্জামান নূর : এটা আমার পরিবার থেকেই পেয়েছি। আগেই বলেছি, মেয়েদের স্কুলে আমার মা প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন সেখানেই আমার বাবা সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেছেন। তাই ছোটবেলা থেকেই আমার বন্ধু তালিকায় মেয়ের সংখ্যাধিক্য  ছিল। যার কারণে মেয়েদের সঙ্গে আমার যে চলাফেরা তা অনেক স্বাভাবিক ছিল। এমনিতে যেটা হয় ছেলেরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর মেয়ের সাহচর্য পায়। তাদের কাছে মনে হয় মেয়েরা বুঝি অন্য গ্রহের বাসিন্দা। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা মোটেই তেমন ছিল না। আমি একজন মেয়েকে মেয়ে হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখেছি। আমার ছেলে বন্ধুরা আমার কাছে যেমন ছিল, তেমনি ছিল মেয়ে বন্ধুরা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সবাই মিলে সেই সময়ে রাত দুটোয় পুরান ঢাকায়  চলে যেতাম মোরগ-পোলাও খেতে। আমাদের কখনো এটা মনে হয়নি যে, আমাদের সঙ্গে একটা মেয়ে যাচ্ছে, আমাদের মনে হতো বন্ধু যাচ্ছে।  


রাফি হোসেন : অনেকে দেখা যায় বাইরে নারী স্বাধীনতার কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনে তার প্রতিফলন থাকে না।
আসাদুজ্জামান নূর : আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি বলেই আমার ধারনা। আর আমার খুব অস্বস্তি লাগে যখন দেখি একজন শিক্ষিত মহিলা শুধুই গৃহিণী হিসেবে জীবনযাপন করছে। তাদের শিক্ষার যদি যথাযথ ব্যবহার না হয় তাহলে লাভ কী? আমাদের পরিবারের সব মেয়েই চাকরি করে। শিক্ষিত মেয়ের ঘরে বসে থাকা মানে মেধার অপচয়। অনেকে বলে, ঘরের দায়িত্ব পালনটাই নাকি মেয়েদের মূল দায়িত্ব। কিন্তু আমি বলি, এটা তো উভয়ের দায়িত্ব। মেয়েরাই যে শুধু ঘরের সব কাজ করবে তা কেন? এখানে দু’জনেরই অংশগ্রহণ থাকা উচিত। আমি নিজের কাজ নিজে করতেই পছন্দ করি।  


রাফি হোসেন : আপনার প্রিয় খাবার কী?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি মাছ, ভাত আর সবজি বেশি পছন্দ করি। মাংস  কমই খাই। মাছের মধ্যে ইলিশ আর দেশি কই মাছ বেশি পছন্দ। চাষের কই ভালো লাগে না। ভাগ্য ভালো যে ইলিশের চাষ হচ্ছে না। নইলে তো সেখানেও বিপদ হয়ে যাবে।


রাফি হোসেন : পছন্দের গান?
আসাদুজ্জামান নূর : অনেক ধরনের গান শুনি। রবীন্দ্র, নজরুল, লোকসংগীত, পুরনো দিনের আধুনিক গান বেশি শুনি। এখনকার আধুনিক গানের মধ্যে কিছু ভালো লাগে। নতুন প্রজন্মের অনেকের গানের কথার মধ্যে জীবনবোধ খুঁজে পাই। ঠুংরী, গজল, ক্লাসিক্যাল সবই।
রাফি হোসেন : পছন্দের শিল্পী কারা?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি দেবব্রত বিশ্বাসের গান সব থেকে বেশি শুনি। আর সুবিনয় রায়। বাংলাদেশের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মিতা হকদের গান বেশি শুনি। সুবীর নন্দী, সামিনা চৌধুরী, সাবিনা ইয়াসমীন ওদের গান শুনি।  মমতাজের কিছু গান আমার ভালো লাগে। বেগম আখতার, শোভা মুদগল, রশীদ খান, নুসরাত ফতে আলী ভালো লাগে।  আজকাল এত বেশি যন্ত্র বাজে যে তার যন্ত্রণায় গানের কথা কিছু শোনাই যায় না। এটা একটু আমার কাছে খারাপ লাগে।  যার কণ্ঠ ভালো তার এত বাজনার দরকার কী?
রাফি হোসেন : পছন্দের অভিনয় শিল্পী কারা আপনার?
আসাদুজ্জামান নূর : মঞ্চের কথা যদি বলি  সেক্ষেত্রে আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার। হুমায়ুন ফরীদিও আমার খুব প্রিয় একজন শিল্পী ছিলেন।  সারা  খুব পাওয়ারফুল অ্যাকট্রেস। একটা নাটকে সে নারী এবং পুরুষ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিল। আমার এখনো কেন জানি মনে হয় যে, সে নিজের সেই অভিনয়কে এখন পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারেনি। নারী পোশাকে নারীর অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে পোশাক পাল্টে যখন পুরুষের চরিত্রে অভিনয় করত, তখনও তার অভিনয় হতো অসাধারণ। মণিপুর থিয়েটারের জ্যোতির অভিনয়ও আমার ভালো লাগে।
টেলিভিশনের পর্দায় সুবর্ণা মুস্তাফা অসাধারণ। আফজাল হোসেন আমার  প্রিয় অভিনেতা। এখনকার টেলিভিশনের পর্দায় মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, তিশা অতি উজ্জ্বল।


রাফি হোসেন : দেশের বাইরে কাদের অভিনয় পছন্দ?
আসাদুজ্জামান নূর : কলকাতার মঞ্চে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, বিভাস চক্রবর্তী তাদের অভিনয় ছিল খুবই চমৎকার। লন্ডনে আমি মঞ্চে অনেক নাটক দেখেছি। পল স্কোফিল্ড, মাইকেল গ্যামবটÑ এদের অভিনয় অসাধারণ। এখানে আমাদের নিজেদের অভিনয় দেখে যতই নিজেরা নিজেদের পিঠ চাপড়াই না কেন, ওদের অভিনয় দেখলে নিজেদের খুব ক্ষুদ্র মনে হয়।
রাফি হোসেন : এই পার্থক্যটা কেন বলে আপনার মনে হয়? আমাদের কী নেই আর ওদের বিশেষ কী আছে?
আসাদুজ্জামান নূর : ওদের অনেক দিনের একটি ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গে তারা সবাই অনেক প্রশিক্ষিত। তারা খুবই স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে অভিনয় করে। তারা দীর্ঘদিন চেষ্টা করে করে একটা জায়গায় যাচ্ছে। সেখানকার পরিচালক যারা তারাও  অনেক বড় মাপের। থিয়েটার আর সিনেমা এ দুটোই হচ্ছে পরিচালকের মিডিয়া। পরিচালকের ওপরে এর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে লন্ডনের সব নাটকই যে ভালো তা কিন্তু না। কিছু নাটকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে।
রাফি হোসেন : টেলিভিশন, মঞ্চ এবং রেডিওÑ এর মধ্যে কোন মিডিয়া আপনার কাছে বেশি ভালো লাগে?
আসাদুজ্জামান নূর : এখন আসলে টেলিভিশনে যেভাবে হয় তা আমি পারি না। আমরা যখন কাজ করতাম তখন তিন ক্যামেরায় একবারে হয়ে যেত। এখন একটা ক্যামেরায় দুটো সংলাপ বলে কাট করে আবার অন্যটা শুরু হয়। আমরা সংলাপ মুখস্থ করে, মহড়া করে তারপর নেমে যেতাম অভিনয় করতে। ভুল হলে কাট হতো, আবার নিত। সেখানে একটা ফ্লো থাকত। এখন নাটকেও সিনেমার কায়দায় শ্যুটিং হয়। ফলে মুডটা ধরে রাখা খুব কঠিন। যার কারণে যারা এখন অভিনয়ে ভালো করছে আমার মনে হয় বেশ কঠিন কাজ করছে। মঞ্চের ক্ষেত্রটাও ভিন্ন। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে অমুক নাটকে আপনার অভিনয়টা কেমন হয়েছে। তার উত্তর দিতে গিয়ে আমার ভেতরে প্রশ্ন জাগে কোন দিনের অভিনয়টা। কারণ মঞ্চের একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী প্রতিদিন কিন্তু একই রকম অভিনয় করেন না। আমি যখন মঞ্চে যাচ্ছি তখন আমার শারীরিক অবস্থা, মুড, সামনের দর্শক সব কিছ্ইু অভিনয়ের ওপর একটা প্রভাব ফেলে। সুতরাং এটা বলা মুশকিল কোন দিন ভালো হয়েছে আর কোন দিন খারাপ হয়েছে। এখানে যা একবার করা হবে তা কিন্তু আর ফেরত আনার উপায় নেই। এখানে কাট বলার সুযোগ নেই, যা একবার করা হবে তা দেখেই দর্শক তার ধারণা তৈরি করে ফেলবে। এখানেই মঞ্চের চ্যালেঞ্জটা। অনেক সময়ই ভাবি টেলিভিশনে নাটক করব। কিন্তু বর্তমান অবস্থার কারণে আর হয়ে ওঠে না। আর সেই সঙ্গে আরেকটা জিনিস কাজ করে তা হলো আমি যেমন কাজ করেছি তার মতো বা তার থেকে ভালো কিছু করতে পারব কিনা। অভিনয় করতে গেলে মনোযোগ দিয়ে করতে হয়। এত ব্যস্ততার মাঝে সেই মনোযোগ দেয়াটা কষ্টের। সে কারণে উৎসাহটা পাই না।


রাফি হোসেন : আপনার পছন্দের সিনেমা এবং পরিচালক সম্পর্কে জানতে চাই।
আসাদুজ্জামান নূর : পাকিস্তান আমলে তো ইংরেজি সিনেমা অনেক আসত। এর মধ্যে সাদাকালো একটা সিনেমার কথা খুব মনে পড়ে। এটা ছিল বর্ণবাদ নিয়ে, নাম ওয়ান পটেটো, টু পটেটো। এছাড়াও বাইসাইকেল থিফ, ক্রেইনস আর ফ্লাইং, ফল অব রোমান এম্পায়ার, লরেন্স অব এরাবিয়া, সানফ্লাওয়ার, টু উইমেন এমন অনেক অনেক  সিনেমা। তখন তো আসলে ভালো ভালো সিনেমা আসত। এখন আর তা আসে না। এখন বাসায় ডিভিডিতে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখি। দেশের বাইরে গেলে তখন হলে বসেও দেখি।

সিঙ্গাপুরে একটা হল আছে প্রজেকশন রুম নামে। পৃথিবীর সেরা সমসাময়িক ছবিগুলো এখানে দেখানো হয়। সম্প্রতি সিনেমা দেখেছিলাম ট্যাক্সি তেহরান। এর পুরোটাই ট্যাক্সির ভেতরে শ্যুট করা। সিঙ্গাপুর গেলেই ওই হলটাতে সিনেমা দেখি। কিছুদিন আগে আমি আর আমার মেয়ে বসুন্ধরায় গিয়ে জাঙ্গল বুক দেখলাম।
সোফিয়া লরেন, মেরিল স্ট্রিপ, রবার্ট উইলিয়ামস, টম হ্যাংকস, ডাস্টিন হফম্যান এর অভিনয় ভালো লাগে।


রাফি হোসেন : আগামী কোনো পরিকল্পনা?
আসাদুজ্জামান নূর : মানুষের স্বপ্নের তো কোনো শেষ নেই। আমি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি।  আমরা  এই সরকারের সময়ে যেটা চেষ্টা করছি তা হলো আর্ট কালচারের ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নের চেষ্টা করছি। এটার জন্য আমরা অনেক কিছু করেছি এবং করে যাচ্ছি। সম্প্রতি হাতিরঝিলের ওখানে একটা বড় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স তৈরির প্রাথমিক কাজ চলছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন এটা। আমাদের সমস্যার যে জায়গা তা হলো এদেশের মানুষের সংস্কৃতির চর্চা এবং চেতনার বিকাশ। এখন আমাদের দেশে শিক্ষার যে অবস্থা তা ঠিক আশানুরূপ না। আমি এক জায়গাতে বলেছিলাম, আমাদের দেশে এখন পরীক্ষার্থী আছে, শিক্ষাথী নেই। এটা একটা মূল সমস্যা। অভিভাবকরা ঠেসে ঠেসে তাদের মুখস্থ করাচ্ছে আর নম্বর বাড়াচ্ছে পরীক্ষায়। তরুণদের কাছে জানতে চাও তারা কী পড়ছে? তারা বলবে বিবিএ পড়ছে। পৃথিবীতে যেন পড়ার আর কোনো বিষয় নেই। সায়েন্সের শিক্ষার্থী আর্টস সম্পর্কে কিছুই জানে না। আর্ট আর কমার্সের শিক্ষার্থী অনুরূপ নিজের বিভাগ ছাড়া আর কিছুতেই জ্ঞান নেই। আধুনিক উন্নত দেশে এমন নয়। সেখানে মেডিক্যালের শিক্ষার্থীকেও আর্টসের কিছু বিষয় নিয়েও পড়তে হয় জানার জন্য। কিন্তু আমাদের এখানকার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ওই সায়েন্স ছাড়া আর কিছ্ ুজানে না, জানতে চায়ও না।  আমরা আজকে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে লড়ছি। তাদের সঙ্গে আমাদের লড়ার কথা না। তারাও তো শিক্ষিত। আসলে তাদের সেই শিক্ষাটা হয়নি। তারা এয়ারটাইট একটা ঘরের ভেতরে বড় হয়েছে। বাইরের দুনিয়া তারা চেনে না। কোনো এক সময়ে তাদেরকে ধর্মের নামে যা শেখানো হয়েছে, তাই তাদের মাথার ভেতরে ঢুকে গেছে। তারা মানুষ হত্যা করছে। এর অর্থ তারা মানুষ হয়নি। এই মানুষ না হওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে সংস্কৃতিচর্চার অভাব। দামি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেধাবী ছাত্র আইএসে চলে গেছে। তারা তো ছাত্র ভালো, অর্থেরও অভাব নেই। তাহলে গেল কেন সেখানে। অর্থের জন্য নিশ্চয়ই না। মূল কারণ হচ্ছে জ্ঞানের অভাব। এসব পরিবর্তন করতে হলে সংস্কৃতিচর্চার বিকল্প নেই। গুলশানে যারা জঘন্য হত্যাকা- চালালো তারা তো দানব, মানুষ নয়। এই দানবের জন্ম হলো কীভাবে? শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে যারা হামলা চালালো তাদের এই ইসলাম শিক্ষা দিল কারা? এ সবকিছুর জবাব খুঁজতে হবে এবং  আমাদের সবারই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।


 আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছি ঠিকই কিন্তু যদি চর্চার মাধ্যমে এই মানুষ তৈরি করতে না পারি তাহলে তো লাভ হবে না। প্রতিটি জেলাতেই শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়াম আছে। সেগুলো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বছরে গড়ে পাঁচ-ছয় দিন ব্যবহার করেছে। কারণ তাদের লোক নেই। সেখানে শেখানোর লোক নেই। পহেলা বৈশাখে হাজার হাজার লোক রাস্তায় নামে কিন্তু তারা তো বাকি সারা বছর চর্চা করে না। আমার নিজের মনে হয় এটা নিয়ে আরো ভাবা দরকার। সব কিছু তো আর সরকারের কাঁধে চাপিয়ে দিলে হবে না। আমার মনে হয় সুশীল সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক সবার মিলিত প্রচেষ্টায় এটা নিয়ে কাজ করা উচিত।


রাফি হোসেন : আপনার স্বপ্ন কী?
আসাদুজ্জামান নূর : আমি আমার এলাকায় একটা হাসপাতাল করছি। এর ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এটাকে আমরা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালাতে চাই। যাতে এলাকার মানুষের চিকিৎসা সুলভ হয়। এখানে ওষুধের সঠিক দাম নেয়া হবে, বাইরে চেকআপ করতে যা খরচ হয় তার থেকে অনেক কমে এখানে করতে পারবে। এটাই এখন স্বপ্ন। এটা করতে গেলেও আমার একটা ফান্ড লাগবে। আর আগে ব্যাংকে টাকা জমা রাখলেও একটা ভালো ইন্টারেস্ট আসত, এখন তো সেটাও অনেক কমে গেছে। এটাকে নিয়মিতভাবে কম খরচে চালাতে টাকার জোগান নিয়েই একটু চিন্তায় আছি এই যা। ইচ্ছা আছে একটা বৃদ্ধাশ্রম করার। আর একটা স্কুল করতে চাই। এটা আর দশটা স্কুলের মতো না। বাঙালি সংস্কৃতির ধারণা নিয়েই চালানো হবে এটা। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চা করবে এখানে।
আগামীতে মঞ্চে কিছু নাটক করার ইচ্ছা আছে। আর যদি সম্ভব হয় একটা-দুটো ভালো সিনেমা করতে চাই। আমার এখন আফসোস হয় যে ঋতুপর্ণর সিনেমার কাজ আমি করিনি। ও আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আমাকে অনুরোধ করেছিল ওর অন্তত একটা সিনেমা করতে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে আর হয়ে ওঠেনি। ও মারা যাওয়ার একমাস আগেও আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম তখনও ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল বিজ্ঞাপন তৈরি করতে গিয়ে। লাক্সের বিজ্ঞাপন যেটাতে সুবর্ণা মডেল হয়েছিল, সেটা ঋতুপর্ণর করা। তার আগেও দুটো বিজ্ঞাপন করা হয়েছিল।


জীবনের অনেকগুলো বছর পেছনে ফেলে এসেছি। পেছনে তাকালে মনে হয় সময়টা ঠিকমত কাজে লাগাইনি। হয়ত আরও অনেক কিছু করার ছিল। আবার এটাও মনে হয় যা পেয়েছি, সেটাও  কি আমার পাওয়ার কথা ছিল? এই দেশ, আমার বাংলাদেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। এই  ঋণ শোধ করি কী করে?

সৎ মানুষের খোঁজে নাটকে সারা যাকেরের অভিনয় অসাধারণ। সারা  খুব পাওয়ারফুল অ্যাকট্রেস। একটা নাটকে সে নারী এবং পুরুষ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিল। আমার এখনো কেন জানি মনে হয় যে, সে নিজের সেই অভিনয়কে এখন পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারেনি। নারী পোশাকে নারীর অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে পোশাক পাল্টে যখন পুরুষের চরিত্রে অভিনয় করত, তখনও তার অভিনয় হতো অসাধারণ।

 

ক্যাপশন
বিয়ের প্রথম জীবনে স্ত্রী ডা. শাহীন আকতারের সঙ্গে
পুত্রবধূ কাজলী ও একমাত্র নাতনি মধুরিমার সঙ্গে
 ছেলে সুদীপ্ত ও মেয়ে সুপ্রভার সঙ্গে
স্ত্রী ডা. শাহীন আকতার ও মা আমিনা বেগম
কাছের মানুষ হুমায়ূন আহমেদ
সপরিবারে
মধুরিমার সঙ্গে
লন্ডনে ছেলের পরিবারের সঙ্গে
 সেদিন দুজনে

 

Comments

The Daily Star  | English

Death came draped in smoke

Around 11:30pm, there were murmurs of one death. By then, the fire had been burning for over an hour.

6h ago