মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়েছে ৮৫ শতাংশ
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি খরচ ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের আমদানি ব্যয় এতটা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খরচ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯৩ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য ও লুব্রিকেন্ট আমদানির খরচ ৮৪ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আমদানির পরিমাণের সর্বশেষ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ৭৪ লাখ টন।
বিশ্বব্যাংকের জুনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতিবছর যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার করে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকেই এই জ্বালানি আসে।
জুলাইয়ের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বেড়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি দিক থেকে প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজভাড়া ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়া, পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত, রপ্তানির চাহিদা কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ।’
তার মতে, আমদানি ব্যয় বাড়লে, মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে।
সানেমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল রপ্তানি এবং প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে আঘাত হানলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রায় ৬ শতাংশ ও প্রকৃত মজুরি ২ শতাংশের বেশি কমতে পারে, যেখানে মূল্যস্ফীতি আরও ৬ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জুনের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। পেট্রোবাংলার এলএনজি সরবরাহের ছয়টি চুক্তির মধ্যে পাঁচটিই ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মোট ভর্তুকির পরিমাণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকলেও, এবার তা বেড়ে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাত ও জরুরি সেবায় সরকারি বরাদ্দ সংকুচিত হয়ে যাবে।
গত মাসে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে শুধু তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সারের ভর্তুকি মেটাতেই ২০২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
যুদ্ধের কারণে সার উৎপাদন ও সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় সারের আমদানি খরচও বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাসের মধ্যে সার আমদানিতে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের কৃষিখাত আমদানিকৃত সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩৯২ কেজি সার ব্যবহৃত হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি এবং এমওপির মতো সারের জন্য বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদনও গ্যাসের স্থিতিশীল সরবরাহের ওপর নির্ভর করে।
কিন্তু গ্যাস-সংকটের কারণে দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। বাজারে ইউরিয়ার দাম ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দাম দ্বিগুণ হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সার নিশ্চিত করা, সরবরাহকারী ও পরিবহন রুটগুলোয় ভিন্নতা আনা, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চালনে সিস্টেম লস কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে আমদানি-নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।