দেশের অর্থনীতি সংকটে নয়, চাপে আছে

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা চাপের সম্মুখীন হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যাংকাররা।
‘আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ সম্পর্কিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকাররা। ছবি: স্টার

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা চাপের সম্মুখীন হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যাংকাররা।

গতকাল শনিবার দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত 'আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়' সম্পর্কিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন আলোচকরা। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান, বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদির, ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমরানুল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক, মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ শাহ, ট্রাস্ট ব্যংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়রা আজম, আইডিএলসির উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ জাভেদ নূর ও ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ছবি: স্টার

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, 'আতঙ্কের কোনো কারণ নেই এবং অর্থনীতির ওপর থেকে চাপ কমাতে সব অংশীজনদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।'

'করোনায় আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে, তার একটি বড় কারণ অবৈধ চ্যানেলগুলো তখন বন্ধ ছিল' উল্ল্যেখ করে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, 'ব্যাংকগুলোর ক্যাশ সাইকেলে মিসম্যাচ হচ্ছে। এমনকি বিদ্যুৎখাতে দেওয়া অর্থও ঠিক সময়ে ফিরছে না। অথচ, এটাকে ধরা হয়েছিল সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে। সেখান থেকেও নির্ধারিত সময়ের ৩-৪ মাস পর পেমেন্ট আসছে। দেরিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ পেয়ে অনেক ঋণগ্রহীতা এখন ঠিকমতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ওদিকে আমার ডিপোজিটের বিপরীতে খরচ বাড়ছে। ফলে, ব্যাংককে নিরাপদ বিনিয়োগের পথ খুঁজে নিতে হচ্ছে। যাতে করে ব্যাংকের কোর ব্যবসা থেকে বড় আয়টা আসছে না। সব মিলিয়ে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে।'

তিনি বলেন, 'এসব কাটিয়ে উঠতে রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে আমাদের নজর দিতে হবে। এসএমই ফান্ডিং সহজ করতে হবে।'

এমরানুল হক
এমরানুল হক। ছবি: স্টার

ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুল হক বলেন, 'যেকোনো খাতে নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। কাজেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি খাত ঠিকভাবে চললেও বর্তমানে দেশের অর্থনীতির ওপর যে চাপ তার একটি বড় কারণ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলো আমাদের এখনো ভালো অবস্থায় রেখেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে কৃচ্ছতা সাধনে সরকার যে উদ্যোগ নিয়ে তা যদি যথাযথভাবে মনিটরিং করা হয় তাহলে তা খুব ভালো ফল দেবে।'

তিনি বলেন, 'কৃষিখাতে গবেষণার মাধ্যমে একই জমিতে আরও বেশি ফসল এবং বেশিবার ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে। এর পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার মানের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।'

হুমায়রা আজম
হুমায়রা আজম। ছবি: স্টার

'দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ' উল্ল্যেখ করে ট্রাস্ট ব্যংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়রা আজম বলেন, 'বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ফরেন পোর্টফলিও ইনভেস্টমেন্টে বাংলাদেশের ফোকাস করার এখনই উপযুক্ত সময়। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বৈধ পথে রেমিট্যান্স দেশে আসে। সন্তানের শিক্ষা, বীমা, বাড়ির জন্য ঋণসহ বিভিন্ন ভাবে প্রবাসীদেরকে আমরা আকর্ষণ করতে পারি বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে। দেশের করদাতাদের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। দেশে ৪ কোটি সম্ভাব্য করদাতা রয়েছেন। এই ৪ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো, তাদের কাছ থেকে কর আদায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'

তিনি বলেন, 'কৃষিখাতেও বিশেষ নজর দিতে হবে, সরকারি ভর্তুকি দিতে হবে। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতি করতে গিয়ে কৃষি জমি যেন না কমে, সেজন্য হাউজিং পলিসি করতে হবে। জনসংখ্যাকে জনশক্তি করতে হবে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হবে, যাতে আরও বেশি রেমিট্যান্স দেশে আসতে পারে। এর জন্য যথাযথ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।'

দেশে নৌ-চলাচলে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন উল্ল্যেখ করে তিনি আরও বলেন, 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেইসঙ্গে প্রয়োজন দেশের বড় বড় যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে সেগুলো অর্থায়ণে নিশ্চয়তা বিষয়ে আলোচনা। স্বল্প সময়ে যেসব প্রকল্প দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখবে সেগুলোর বাস্তবায়ন আগে করা প্রয়োজন।'

'শিগগির দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। দীর্ঘ মেয়াদী ও মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়ে পর্যটন খাতের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। সবকিছু এখন কেবলমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এই শহরে যানজটসহ সবকিছুই বেশি। বিকেন্দ্রীকরণ হলে তখন অনেক কিছুই সহজ হয়ে যাবে', যোগ করেন তিনি।

মামুন মাহমুদ শাহ
মামুন মাহমুদ শাহ। ছবি: স্টার

'সমস্যাগুলো সাময়িক এবং আমরা তা কাটিয়ে উঠতে পারব' উল্ল্যেখ করে এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ শাহ বলেন, 'আমার দৃষ্টিতে নন-পারফর্মিং ঋণ আদায়ে পিছিয়ে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে মানুষ তাদের জমা টাকা তুলে নিচ্ছেন। গত ৯ মাসের চিত্র থেকে বললে, ৩৫ শতাংশ এফডিআর গ্রাহকরা ভেঙেছেন প্রাত্যাহিক খরচ চালাতে।'

তিনি বলেন, 'আপনারা জানেন, দেশে যে প্রবাসী আয় আসে তার প্রায় ৫০ শতাংশ বৈধ পথে আসে না। এতে করে ডলার সংকট তৈরি হচ্ছে। এর জন্য আমাদের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।'

তিনি আরও বলেন, 'ঋণ, ক্রেডিট কার্ডসহ ব্যাংকিংয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের নথি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও এটা আমাদের (ব্যাংকের) কাজের মধ্যে পরে না। এটা এক ধরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।'

কামাল কাদির
কামাল কাদির। ছবি: স্টার

বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদির বলেন, 'মোবাইল ফাইন্যান্সের মাধ্যমে ট্রানজেকশন প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে। কেননা, তাদেরকে টাকা দিতে সরাসরি যেতে হচ্ছে না। কাজেই এই খাতকে বিধি-নিষেধের মধ্যে রাখা ঠিক হবে না। ছোট ছোট অংকের টাকা মানুষ মোবাইলে ট্রান্সফার করেন। এখন যে সময়সীমা ধরে আমরা কাজ করছি সেটা একটি চ্যালেঞ্জ।'

তিনি বলেন, 'দেশের যেকোনো প্রান্তে এখন টাকা পাঠানো খুবই সহজ হয়েছে এমএফএসের কারণে।'

নগদের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বলেন, 'সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে কিন্তু এখনো সেভাবে প্রভাবটা পড়েনি। এটা আমাদের জন্য একটি ভালো খবর। কিন্তু, আনঅফিসিয়ালি রেমিট্যান্স পাঠানোর যে গ্যাপের কথা বলা হচ্ছে, সেটা সরকার চাইলেই সমাধান করতে পারবে না।'

তানভীর এ মিশুক
তানভীর এ মিশুক। ছবি: স্টার

তিনি আরও বলেন, 'তবে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স যেন বৈধ পথে আসে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। বিভিন্ন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে। যখন বড় অংকের লেনদেন হবে সেটার যথাযথ মনিটরিং করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের আমদানি কমানো দরকার। সেটা নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ব্যয় কমাতে হবে। সে জন্যও সরকার কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের জিডিপির বিপরীতে ট্যাক্স কিন্তু ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। সেখানে ভারত ও নেপাল বাজে অবস্থায় আছে, পাকিস্তানের ১৫ শতাংশ আছে। আমি ট্যাক্স বাড়াতে বলছি না কিন্তু করজাল বাড়ানো দরকার।'

সৈয়দ জাভেদ নূর
সৈয়দ জাভেদ নূর। ছবি: স্টার

আইডিএলসির উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ জাভেদ নূর বলেন, 'বাংলাদেশের মৌলিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি। করোনার সময়ে কিছুটা ডাউন হয়েছিল। কিন্তু, করোনার পরে শক্তভাবে আবার ফিরে এসেছে। করোনার সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু বিষয় সহজ করেছিল। এ কারণে পেমেন্ট বিলম্বিত হয়েছে এবং বাজেট ডলার সারপ্লাস হয়েছে। সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলে নিয়েছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে নিয়েছে এবং বাজারে টাকা দিয়েছে। করোনার পরবর্তীতে যেসব পেমেন্ট বাকি ছিল সেগুলো আমরা পরিশোধ করেছি। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়েছে। কিন্তু কাস্টমারের কাছে যে বকেয়া কালেকশন ছিল সেটা পাওয়া যায়নি। আর সেটা যদি না পাওয়া যায় তাহলে নতুন ঋণ কীভাবে দেব? আরেকটি বিষয় তেলের দামের সঙ্গে কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়েছে। কারণ ৯০ শতাংশ পণ্য কিন্তু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তেলের সঙ্গে যুক্ত।'

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। ছবি: স্টার

মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, 'করোনা আমাদের নতুনভাবে সময় কাটাতে শিখিয়েছে, অনলাইন শপিং শিখিয়েছে। গত বৃহস্পতিবারে আমাদের মাস্টারকার্ডের যে পেমেন্ট ইনডেক্স লঞ্চ হয়েছে তাতে দেখা যায়, এশিয়া প্যাসিফিকে গত এক বছরে অন্তত ৮৯ শতাংশের অন্তত একজন ডিজিটাল পেমেন্ট করেছেন। আর ৬৯ শতাংশ একটির অধিক করেছেন। সেটা যদি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করি— যুক্তরাষ্ট্র ৫২ শতাংশ এবং ইউরোপ ৪৮ শতাংশ। সুতরাং এশিয়া প্যাসিফিকে ডিজিটাল পেমেন্টের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। মানুষ এখন ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। একটি ছোট তথ্য দিতে পারি যেটা খুব আশাব্যঞ্জক, ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে আগামী ৩ মাস কোনো টিকিট নেই। কারণ ৭০ শতাংশ ভারতীয় ও নেপালি নাকি বাংলাদেশে হয়ে এই রুটে ভ্রমণ করছেন। যা আমাদের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। ট্রাভেলে ফেরত আসার মানে হচ্ছে মানুষের কিছুটা খরচ বাড়ছে। আমরা এই খরচ ইতিবাচকভাবে বাড়ছে। ডিজিটাল কমার্সে আমার দেখেছি, ডিজিটাল পেমেন্ট অনেকে বেড়েছে। করোনার মধ্যে এটা ৩৭ শতাংশে চলে গিয়েছিল। তবে, এ বছর তা ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বেড়েছে। এটা আমরা খুব পজিটিভলি দেখছি।'

তিনি আরও বলেন, 'পৃথিবীতে ডিজিটাল পেমেন্টে ট্যাক্স, ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেটা আমরা কয়েকবছর ধরে বলে যাচ্ছি। কিন্তু, সরকার শুনছেন না। গত ফিন্যান্স বিলের ৪৮ নম্বর চ্যাপ্টারে প্রায় ৩৮টি সার্ভিসের জন্য ট্যাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হলো। তার মধ্যে ক্রেডিট কার্ড এবং এমএসইর ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হলো। এমএসই সেক্টর কিন্তু এখনো ওই পর্যায়ে যায়নি। লংটার্মে আমরা চাইব ইনসেনটিভ ঘোষণা করা হোক। অনেক সেক্টরে ইনটেনসিভ আছে। এই মূহূর্তে অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়াল পন্থায় রেমিট্যান্সে পার্থক্য ১০ থেকে ১২ টাকা। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। করোনায় রেমিট্যান্স বাড়ার মূল কারণ আনঅফিসিয়াল পথগুলো বন্ধ ছিল। তাই ও আনঅফিসিয়ালগুলো পথ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে রেমিট্যান্স বাড়বে না। আইটি ফ্রিল্যান্সারদের কাজে লাগাতে হবে। এই মার্কেট অনেক বড়। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। আমার মূল কথা দুটি। একটি হলো বাধ্যতামূলক ট্যাক্স রিটার্ন তুলে নেওয়ার দাবি জানাই। আর দ্বিতীয়টি ডিজিটাল পেমেন্টে সরকারের পক্ষ থেকে ৫ শতাংশ ইনটেনসিভ দেওয়া হোক। এটা দেশের অর্থনীতি ও জিডিপিতে প্রভাব ফেলতে পারবে।'

আহমেদ শাহীন
আহমেদ শাহীন। ছবি: স্টার

ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন বলেন, 'আমরা এখন অনেক কিছু খণ্ডিতভাবে দেখছি। ৩৪ বিলিয়ন ডলার শিরোনামে একটি সংবাদে দেখলাম বলা হয়েছে, এই ডলার অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে। কথার মধ্যে কিন্তু মিথ্যা নেই। কিন্তু কথার মধ্যে সত্যের কিছু গোপনীয়তা আছে। অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকে এটাই স্বাভাবিক। এর আগের অর্থবছরে করোনার পর থকে আমদানি বাড়তে শুরু করে। এরপর সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আগে চীন থেকে যে পণ্য ২১ দিনে আসতে এখন তা আসতে সময় লাগছে দেড় মাস। শিপ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে। সুতরাং ফ্যাক্টরি বন্ধ হতে পারে, কিছু বাফার ইনভেন্টরি নিয়ে রাখতে হবে। এজন্য সবাই বেশি করে কিনছে। এরপর এলো দাম বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করল।'

তিনি আরও বলেন, 'চতুর্থ ধাক্কাটা এলো ইউক্রেন যুদ্ধের পরে। আমাদের সবচেয়ে আমদানি বেড়েছে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রোডাক্টে। যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩০৮ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ হলো ভ্যাকসিন ও কোভিড আইটেম। যেটা এ বছরে এতোটা থাকবে না। দ্বিতীয় আমদানি বেড়েছে কৃষিক্ষেত্রে এবং এটা ২০২ শতাংশ। আমরা এখানে শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থানে আছি। কারণ আমাদের ওদের মতো ফার্টিলাইজার ঘাটতি নেই। তবে, আমাদের যে খাদ্য আমদানি করতে হয় তা কিন্তু ৪ শতাংশ কমেছে। আমদানি বাড়ার ক্ষেত্রে সুতা আছে তৃতীয়তে এবং এর পরিমাণ ১১৫ শতাংশ। সুতা বেশিরভাগ আমদানি হয় রপ্তানি পণ্যের জন্য। প্রথম দিকে যারা সুতা কিনেছে তারা লাভবান হবেন, কিন্তু, পরে যারা কিনেছেন খরচ কিছুটা বেশি হবে। টেক্সটাইল পণ্য আমদানি হয়েছে ৫১ শতাংশ। কটন ৪৯ শতাংশ আমদানি হয়েছে যা আবার রপ্তানিও হবে। সুতরাং এগুলোর রপ্তানি আমাদের আছে, কিন্তু আমদানি তো আগে হয়ে গেছে তাই আমদানির পেমেন্ট করতে হয়েছে। এখানে একটি সময়ের ব্যাপার আছে। সেজন্য আমরা একটি স্পাইকে পড়ে গেছি। এজন্য আমদানি পেমেন্ট বেশি কিন্তু রপ্তানিরটা আরও পরে পাব। ক্যাপিটল পণ্য আমদানি বেড়েছে ২৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের আমদানি বাজারে ক্যাপিটাল পণ্য অন্যতম। এরমধ্যে প্রচুর আসছে টেক্সটাইল মেশিন। যেগুলোর শিপমেন্টই এখনো হয়নি। অথচ এলসি খুলেছি। এগুলোর শিপমেন্ট হবে দেড় থেকে দু'বছরে। বিডা এ ক্ষেত্রে সাহায্য করছে।'

'রিজার্ভ একটু হারানো মানে জাত হরিয়ে ফেলার মতো বিষয় নয়। প্রয়োজনে এটা হতে পারে। যখন একটি দেশ উন্নতির দিকে যাবে তখন এটা শুধু একদিকে কাজ করে না। আমি মনে করি আমাদের সমস্যাটা সুখের সমস্যা। কারণ গত ১০ বছরে আমরা অনেক গ্রোথ করেছি। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই,' বলেন তিনি।

ANIS A. KHAN
আনিস এ খান। ছবি: স্টার

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, 'তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথীবির কোন দেশ কী করছে, তা এখন মুহুর্তের মধ্যেই সবাই দেখতে পারে। অবশ্য অনেক সময় ভুল তথ্যও ছড়িয়ে পরে। যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে যে সমস্যা পুরো বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে সেগুলো নতুন করে না বলে আমি বরং অন্য সমস্যাগুলো তুলে ধরতে চাই। বিশ্বের সাপ্লাই চেইন বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে চীনের মতো দেশগুলোতে শিপিং কনটেইনার, এমনকি ট্রাকারের অপ্রতুলতার কারণে। চীনের কাছ থেকে পণ্য না পেয়ে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই কাজ বিলম্বিত হচ্ছে, যা অর্থনীতিতে আঘাত করছে।'

তিনি বলেন, 'আমার মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সবাইকে সাধারণ জীবনযাপন করতে হবে। সরকারকে খুবই সাধারণভাবে চলতে হবে, যার জন্য ইতোমধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সপ্তাহে ২ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাসহ অফিসের সময় কমানোর মতো উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে ভালো। তবে, এর সঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে ২ দিন অনলাইনে এবং বাকি ৩ দিন সশরীরে ক্লাশ করানো উচিত। এতে করে বন্ধ ও অনলাইন ক্লাশের দিনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ঘরে থাকবেন এবং রাস্তায় গাড়ির চাপ কমবে।'

তিনি আরও বলেন, 'দীর্ঘ মেয়াদের হিসেবে, ক্যাপিটাল গভর্নেন্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক প্রতিষ্ঠান শূন্য থেকে উঠে এসেছে, তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের জন্য একটি সুপারভাইজারি বোর্ড করা উচিত। এই বোর্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো-মন্দ সম্পর্কে খোঁজ রাখবে। মালিকদের সমন্বয়ে গঠিত এই সুপারভাইজারি বোর্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করবে। এতে করে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও এগিয়ে যাবে এবং আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।'

একইভাবে ব্যাংকের জন্যও বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'প্রতিটি খাতের জন্য ব্যাংক হচ্ছে মেরুদণ্ড। ব্যাংকই যদি স্থতিশীল না হয় তাহলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে স্থিতিশীল হবে? সেইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ত্রৈমাসিক মনিটরি পলিসি তৈরি করা উচিত, যা এখন ষান্মাসিক হয়। এতে করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় অল্প সময়ে পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুত হওয়া যাবে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না।'

Comments

The Daily Star  | English

Confiscate ex-IGP Benazir’s 119 more properties: court

A Dhaka court today ordered the authorities concerned to confiscate assets which former IGP Benazir Ahmed and his family members bought through 119 deeds

28m ago