বিপন্ন বরগুনার নিদ্রার চর ম্যানগ্রোভ, ‘বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা’ ঘোষণার অপেক্ষা

সোহরাব হোসেন
সোহরাব হোসেন

ভাটা নামলে দূর থেকে নিদ্রার চরকে মনে হয় কাদা আর বালিতে ঢাকা এক নির্জন ভূখণ্ড। কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে কাদার বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য শ্বাসমূল। এই শ্বাসমূলই উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ।

জোয়ার এলে সবুজে মোড়া চর, কেওড়া-গেওয়ার সারি, লাল কাঁকড়ার ছুটে চলা আর জলরেখা মিলিয়ে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের নিদ্রার চর বা নিদ্রা সৈকত হয়ে ওঠে অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার।

তবে এই সৌন্দর্য এখন হুমকির মুখে। পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত ভিড়, মোটরসাইকেল চলাচল, গাছ কাটা, রাস্তা নির্মাণের জন্য মাটি খনন ও স্থায়ী অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিরল এই ম্যানগ্রোভ বন।

বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তালতলী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংরক্ষিত বনের মধ্যে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয় ৫টি কংক্রিটের বেঞ্চ। গত ২৬ এপ্রিল টহলকালে বনকর্মীরা সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে অবৈধভাবে কেওড়া গাছ কাটা, রাস্তা তৈরির জন্য মাটি খনন ও স্থায়ী বেঞ্চ নির্মাণের প্রমাণ পান।

বনকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে যান। পরে ওই বেঞ্চগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে, যা সরকারি অর্থের অপচয়। এ ঘটনায় বনভূমি দখলের উদ্দেশ্যে এসব কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় সম্প্রতি আদালত পাঁচজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

কংক্রিটের বেঞ্চগুলো ভেঙে ফেলেন বনকর্মীরা। ছবি: স্টার

এদিকে, সংরক্ষিত বনের ভেতর সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া গেছে।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য ওয়াশরুম, বেঞ্চ ও চলাচলের পথ নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বন বিভাগের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে পর্যটকদের জন্য ৫টি কংক্রিটের বেঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল।’ এতে সরকারি কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

তবে তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ডেইলি স্টারকে সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউনুস ফরাজি বলেন, ‘টিআর প্রকল্পের আওতায় ৫টি পাকা বেঞ্চ নির্মাণে উপজেলা প্রশাসন ১ লাখ ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। প্রকল্প কমিটির সভাপতি (সিপিসি) হিসেবে ওই কাজ আমি সম্পন্ন করেছি। কাজ শেষে বিল দাখিল করলে বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেক বিল সাড়ে ৫৩ হাজার টাকা উপজেলা থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি টাকা এখনও পাইনি।’

স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও পর্যটন সংগঠক আরিফুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য বনের ভেতরে নির্মিত কংক্রিটের বেঞ্চ ও চলাচলের পথ সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে নিদ্রার চরের সৌন্দর্য প্রকাশের পর দ্রুত পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু পর্যটনের কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকায় এখন মানুষ শ্বাসমূলের ওপর দিয়েই হাঁটছে, এমনকি মোটরসাইকেলও চালাচ্ছে। এতে এই ম্যানগ্রোভ বনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।’

নিদ্রার চরের কাছেই রয়েছে শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, যেখানে প্রতি বছর জোছনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন টেংরাগিরি, ফাতরার চর ও সোনাকাটা ইকোপার্কও এই এলাকায় অবস্থিত। 

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে এখানকার প্রায় ৪ হাজার ৪৮ একর এলাকা সংরক্ষিত বন শ্রেণীতে ‘টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ চলতি বছরের ২০ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠায়। এতে বলা হয়, নিদ্রার চরের ১৬ দশমিক ০৬ একর এলাকা একটি বিশেষ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল, এমন এলাকা বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি রয়েছে শুধু চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালীতে।

বিট কর্মকর্তা জুমেল আরও জানান, পর্যটকদের অবাধ চলাচল, মোটরসাইকেল প্রবেশ ও প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলের ওপর। শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ধীরে ধীরে পুরো বনই দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে চরটির স্বাভাবিক ভূ-প্রকৃতির বিরূপ পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

ডেইলি স্টারকে পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘নিদ্রার চর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি বিরল কচ্ছপ, কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, সামুদ্রিক মাছ, সরীসৃপসহ নানা প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কেওড়া, গেওয়া, ছৈলা, খৈয়া বাবলা, হাড়গোজা, ঝাউ ও করমজাসহ বিভিন্ন উপকূলরক্ষী বৃক্ষ এ বনকে সমৃদ্ধ করেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে এটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে।’

বন বিভাগ জানিয়েছে, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর ২১ ধারা অনুযায়ী নিদ্রার চরকে ‘বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা’ ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।