ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী: সংকটে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

অতিরিক্ত রোগীর চাপে দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে। জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) প্রকাশিত 'হেলথ বুলেটিন ২০২৪'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের ৫৯টি জেলা হাসপাতালে গড় শয্যা দখলের হার (বেড অকুপেন্সি রেট) ছিল ১৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি শয্যার বিপরীতে গড়ে ১৭৮ জন করে রোগী ভর্তি ছিলেন। একই সময়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই হার ছিল ১৬৪ শতাংশ।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূল কেন্দ্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিত্রও ভিন্ন নয়। সেখানে গড় শয্যা দখলের হার পৌঁছায় ১১১ শতাংশে।

হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগী থাকায় অনেকেই শয্যা পাচ্ছেন না। মেলে না পর্যাপ্ত খাবার বা ওষুধ, আর চিকিৎসক-নার্সদের কাছ থেকেও মেলে না প্রয়োজনীয় মনোযোগ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, রোগীর অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে হাসপাতাল বা করিডরের মেঝেতে অবস্থান নেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় তারা প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, হাসপাতালগুলোতে খাবার ও আনুষঙ্গিক বরাদ্দ দেওয়া হয় অনুমোদিত শয্যা সংখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু রোগী অনেক বেশি থাকায় তীব্র খাদ্য ও ওষুধ সংকট তৈরি হয়।

৫৯টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে পাঁচটির শয্যা দখলের হার ছিল ৩০০ শতাংশেরও বেশি। ১৬টির হার ছিল ২০০ শতাংশের বেশি এবং ২৮টির হার ছিল ১০০ শতাংশের বেশি। মাত্র ১০টি জেলা হাসপাতালের শয্যা দখলের হার ১০০ শতাংশের নিচে ছিল।

স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলা হয়েছে, এই তথ্য দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এবং ভর্তি চিকিৎসাসেবার চাহিদা বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে।

নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের বড় অংশ এখনো সাশ্রয়ী চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে চাপ বাড়ছে। অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিগত চার বছরের তথ্যে দেখা যায়, জেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যা দখলের হার ক্রমান্বয়ে বেড়েছে—২০২১ সালে যা ছিল ১৩১ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৮ শতাংশে। 

স্বাস্থ্যসেবার মান ব্যাহত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ জনবল সংকট। গত মাসে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সরকারি হাসপাতালগুলোর অনুমোদিত পদের প্রায় ২০ শতাংশ (২৩ হাজার ২২৩টি পদ) শূন্য রয়েছে, যার মধ্যে বহু চিকিৎসক ও নার্সের পদও খালি। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেন, দেশে বছরে প্রায় ৪০ লাখ রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হয়।

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং হৃদরোগ, কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগ বাড়ার কারণে হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়ছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও দূষণ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে, যেখানে ২০২৪ সালে শয্যা দখলের হার ছিল সর্বোচ্চ ৩১৯ শতাংশ। 

গত ৭ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবদুল মান্নান বলেন, হাসপাতালটির শয্যা দখলের হার সাধারণত ২৮০ থেকে ২৯০ শতাংশের মধ্যে থাকে। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার আমাদের হাসপাতালে প্রায় ৭০০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।

খাবার সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সব রোগীকে খাবার দিতে পারি না, কারণ বরাদ্দ পাই মাত্র ২৫০ শয্যার জন্য। ওষুধও সীমিত করে দিতে হয়।

৭ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৭৮টি অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ৩৭ জন। এ ছাড়া নার্সের ২০টি পদও শূন্য ছিল বলে জানান তিনি।

সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতেও শয্যা দখলের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে গড় হার ছিল ১৪৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১৬৪ শতাংশ। 

২০২৪ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে ২৩টির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বুলেটিনে বলা হয়েছে, তৃতীয় স্তরের এসব হাসপাতালে শয্যা দখলের উচ্চ হার উন্নত চিকিৎসাসেবার ব্যাপক চাহিদা এবং সীমিত সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

দুটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা দখলের হার ছিল ৩০০ শতাংশের বেশি, চারটির ২০০ শতাংশের বেশি, ১১টির ১০০ শতাংশের বেশি। মাত্র ছয়টির হার ছিল ১০০ শতাংশের নিচে।

৪৩২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গড় শয্যা দখলের হারও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে ৮৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৮ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১১১ শতাংশে পৌঁছেছে।

তবে ১৬টি বিশেষায়িত হাসপাতালে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব হাসপাতালে শয্যা দখলের হার ৮১ থেকে ৮৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে।

২০২৪ সালে তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতালে শয্যা দখলের হার ১০০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল। বাকিগুলো পূর্ণ ধারণক্ষমতার নিচে পরিচালিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও সরকারি পদক্ষেপ

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, এ সংকট মোকাবিলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, উপজেলা ও নিচের স্তরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে জেলা হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

জটিল রোগীদেরই শুধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভাগীয় বা সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে পাঠানো উচিত বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনুমোদিত শয্যার পরিবর্তে ভর্তি রোগীর প্রকৃত সংখ্যার ভিত্তিতে খাবারের বরাদ্দ দেওয়া হয়।

গত ১৪ জুলাই স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকার শুধু শয্যা বাড়ানোর দিকে নয়, প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে নতুন ভবনগুলো অকার্যকর না থাকে।

তিনি আরও জানান, সরকারি হাসপাতালে জনবল সংকট দূর করতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিসিএসের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।