বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

লক্ষণ ছাড়াই লিভারে ক্ষতি: ‘নীরব ঘাতক’ হেপাটাইটিস

প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আলী

আজ ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) ও ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের আহ্বানে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য "Let's Break it Down" (আসুন বাধাগুলো ভেঙে ফেলি)। এই আহ্বানের মূল কথা হলো—হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে দূর করতে হবে কুসংস্কার, বৈষম্য ও সামাজিক অনীহা।

হেপাটাইটিস থেকে বাঁচতে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। পরীক্ষায় পজিটিভ এলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে হবে, আর নেগেটিভ হলে হেপাটাইটিস-বির টিকা নিতে হবে। তবে হেপাটাইটিস-সির কোনো টিকা না থাকায় সার্বিক ব্যক্তিগত সতর্কতা বজায় রাখাই প্রধান উপায়।

হেপাটাইটিস কী ও এর ধরণ

হেপাটাইটিস মূলত লিভারের প্রদাহ, যা প্রধানত পাঁচ ধরনের ভাইরাসের (এ, বি, সি, ডি ও ই) মাধ্যমে হয়।

হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’: এগুলো দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এগুলো তীব্র প্রদাহ তৈরি করলেও সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই। কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ‘লিভার ফেইলিউর’ হতে পারে, তখন মাল্টি-অর্গান সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। তবে গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য হেপাটাইটিস ‘ই’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

হেপাটাইটিস ‘ডি’: এটি সাধারণত হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের উপস্থিতিতেই সংক্রমণ ঘটায়।

প্রধান উদ্বেগ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’তে আক্রান্ত—যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ।

প্রতি বছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এই দুটি রোগের জটিলতায় মারা যান। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের প্রধান কারণ এই দুই ভাইরাস। লিভার ক্যানসার মানুষের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।

ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জানেন না যে তাদের শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ আছে। উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন লিভারের ক্ষতি করে বলে এদের ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। উদ্বেগের বিষয়, ২০১৫ সালের পর থেকে হেপাটাইটিস-বিজনিত মৃত্যুর হার ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা আরও বেশি। আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে বা শিশু বয়সে সংক্রমিত হলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসে রূপ নেয় এবং ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যান।

বাংলাদেশ পরিচিতি ও বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪.৪ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি এবং ০.৬ শতাংশ হেপাটাইটিস-সিতে আক্রান্ত। অর্থাৎ, দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ এই দুই ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে বাস করেন, যেখানে সচেতনতা ও চিকিৎসার সুযোগ অপরতুল।

এছাড়া, বাংলাদেশে আশ্রিত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশের শরীরে হেপাটাইটিস-সি সংক্রমণ দেখা গেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও এটা আশঙ্কার ব্যাপার।

গ্রামাঞ্চলে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, ঝাড়ফুঁক বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে। ফলে জটিল বা শেষ পর্যায়ে গিয়ে রোগ শনাক্ত হয়, যখন আর কিছু করার থাকে না। এর চিকিৎসা মূলত শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

প্রতিরোধে করণীয়

১. হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ প্রতিরোধ:
বিশুদ্ধ খাবার ও পানি ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই প্রধান উপায়। এছাড়া হেপাটাইটিস ‘এ’-এর কার্যকর ভ্যাকসিন রয়েছে, যা প্রথম ডোজের পরেই প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয়।
২. হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ প্রতিরোধ:
এগুলো রক্ত, রক্তের উপাদান ও শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই কিছু বিষয়ে সতর্ক হতে হবে:

  • রক্ত সঞ্চালনের আগে রক্তের সঠিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা

  • প্রতিবার নতুন/একবার ব্যবহারযোগ্য (Disposible) সিরিঞ্জ, সুই ও ব্লেড ব্যবহার করা

  • ব্যক্তিগত টুথব্রাশ, রেজার, কাঁচি বা ক্ষুর অন্য কাউকে ব্যবহার করতে না দেওয়া

  • নিরাপদ যৌন চর্চা নিশ্চিত করা

  • সেলুন বা পার্লারে ট্রিমার/ব্লেড এবং ট্যাটু বা কান ফোঁড়ানোর যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত রাখা

  • অস্ত্রোপচার ও দন্ত চিকিৎসার সরঞ্জাম শতভাগ জীবাণুমুক্ত করা

  • আক্রান্ত ব্যক্তি কোনোভাবেই রক্ত বা অঙ্গ দান করবেন না।

মনে রাখা জরুরি: করমর্দন, কোলাকুলি, একই টেবিলে খাওয়া বা জামাকাপড় ব্যবহারের মতো সামাজিক মেলামেশায় হেপাটাইটিস ছড়ায় না।

মা ও শিশুর সুরক্ষা এবং ‘বার্থ ডোজ’

হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত মা থেকে নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকি ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ। তাই গর্ভবতী মায়েদের এইচবিভি পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশুর জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ‘বার্থ ডোজ’ ভ্যাকসিন দেওয়া আবশ্যক।

মা যদি হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ হন, তবে নবজাতককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি 'ইমিউনোগ্লোবিউলিন' ইনজেকশন দিতে হবে। পরবর্তীতে ১-২ মাস এবং ৬ মাস বয়সে আরও দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিতে হবে।

বাংলাদেশে প্রায় ৪৮ শতাংশ প্রসব এখনও বাড়িতে ধাত্রীদের মাধ্যমে হয়। ধাত্রী ও গর্ভবতী মায়েদের এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) জন্মের ৬ষ্ঠ সপ্তাহে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, তবে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘বার্থ ডোজ’ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণ ০.১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

হেপাটাইটিসের চিকিৎসা

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক মানের মুখে খাওয়ার ওষুধ ও ইনজেকশন পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস-সি নিরাময়ে 'ডাইরেক্ট-অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল' ওষুধ প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকরী।

হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। অনেক সময় অর্থের অভাবে রোগীরা হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করে দেন, ফলে ভাইরাসটি আরও আগ্রাসী রূপ নেয়। চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সরবরাহের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।

২০৩০ সালের লক্ষ্য ও সরকারের করণীয়

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে পাঁচটি বিষয়ে জোর দিতে হবে:

  • টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার

  • মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ রোধ

  • নিরাপদ ইনজেকশন, রক্ত সঞ্চালন ও সার্জিক্যাল সুরক্ষা

  • ক্ষতির মাত্রা কমানো

  • আক্রান্তদের সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা

সরকারের কাছে প্রত্যাশা:

  •  জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা

  • সকল গর্ভবতী নারীর হেপাটাইটিস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা

  • নবজাতকের জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস-বি টিকাদান (বার্থ ডোজ) সুনিশ্চিত করা

  • অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ সহজলভ্য ও দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করা

  • জাতীয় ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কমিটি ও জাতীয় প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা

‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতিকে সামনে রেখে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস মুক্ত করতে। ভাইরাল হেপাটাইটিসমুক্ত প্রজন্মই হোক আমাদের আগামী দিনের সেরা অর্জন।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী একজন লিভার সার্জন এবং ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব। ২০২১ সালে কোয়ালিশন ফর গ্লোবাল হেপাটাইটিস এলিমিনেশন তাকে ‘গ্লোবাল হেপাটাইটিস এলিমিনেশন চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।