ব্রিটিশ রাজনীতির ‘অস্থিরতার’ এক দশকে ৭ প্রধানমন্ত্রী: বিদায়ী ৬ জন যে কারণে ক্ষমতা হারান
গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি যেভাবে মোড় পরিবর্তন করেছে, তা যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। ব্রেক্সিটের ঝড়, লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৯ দিনের রেকর্ড ব্রেকিং সংক্ষিপ্ত মেয়াদ, আর সর্বশেষ কিয়ার স্টারমারের নাটকীয় বিদায়ের পর এবার মসনদে অ্যান্ডি বার্নাম।
কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টি যে ‘স্থিতিশীলতার’ স্বপ্ন দেখিয়েছিল, দুই বছর পার হতেই তারাও একই গোলকধাঁধায় বন্দি। ব্রিটিশ রাজনীতির এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা কি বার্নামের হাত ধরে থামবে, নাকি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের অস্থিরতার ইতিহাস আরও দীর্ঘ হবে?
অ্যান্ডি বার্নাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য পেয়েছে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে এত ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনকে দেশটির রাজনীতিতে ‘অস্থিরতার দশক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জুনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। টানা জনসমর্থন হারানো এবং নিজ দলের সংসদ সদস্যদের চাপের মুখে তিনি সরে দাঁড়ান। পরে লেবার পার্টির এমপিরা বিপুল সমর্থনে অভিজ্ঞ রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নামকে নতুন নেতা হিসেবে বেছে নেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে বিপুল জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসে কিয়ার স্টারমার কনজারভেটিভ সরকারের সময়ে বারবার প্রধানমন্ত্রী বদলের সমালোচনা করেছিলেন। তবে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যেই লেবারও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যে বার্নাম বলেন, দেশের জন্য আরও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি 'গভীরভাবে সচেতন'।
এক দশকের সাত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হারানোর ধরণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
ডেভিড ক্যামেরন (মে ২০১০ – জুলাই ২০১৬)
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার প্রশ্নে ২০১৬ সালের গণভোটে ‘ব্রেক্সিটের’ পক্ষে রায় আসে। ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালানো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গণভোটের ফল প্রকাশের পর পদত্যাগ করেন।
থেরেসা মে (জুলাই ২০১৬ – জুলাই ২০১৯)
ব্রেক্সিট পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হন থেরেসা মে। ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে আগাম নির্বাচনের ডাক দিলেও উল্টো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান। পরে ব্রেক্সিট চুক্তি সংসদে পাস করাতে ব্যর্থ হওয়া এবং ২০১৯ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভদের ভরাডুবির পর পদত্যাগ করেন।
বরিস জনসন (জুলাই ২০১৯ – সেপ্টেম্বর ২০২২)
বরিস জনসনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়। তার মেয়াদে যুক্তরাজ্য করোনাভাইরাস মহামারি এবং ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। তবে একের পর এক কেলেঙ্কারি এবং মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঢেউয়ের মুখে শেষ পর্যন্ত তাকেও সরে দাঁড়াতে হয়।
লিজ ট্রাস (সেপ্টেম্বর ২০২২ – অক্টোবর ২০২২)
মাত্র ৪৯ দিন দায়িত্ব পালন করে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। বিতর্কিত কর কমানোর ‘মিনি বাজেট’ আর্থিক বাজারে বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন।
ঋষি সুনাক (অক্টোবর ২০২২ – জুলাই ২০২৪)
ট্রাসের পর দায়িত্ব নিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেও দলীয় কোন্দল থামাতে পারেননি ঋষি সুনাক। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের নির্বাচনে কিয়ার স্টারমারের কাছে পরাজিত হয়ে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটে।
কিয়ার স্টারমার (জুলাই ২০২৪ – জুলাই ২০২৬)
ক্ষমতায় এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের বিরোধিতা এবং ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থন ধরে রাখার কারণে প্রশংসা পান কিয়ার স্টারমার।
তবে দেশের ভেতরে কল্যাণমূলক ব্যয় কমানো, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে দলের উত্থান তার জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দেয়। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের বড় ধরনের পরাজয়ের পর তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
এছাড়া জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ ওঠার পর পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ দূত হিসেবে নিয়োগ এবং পরে তাকে অপসারণের সিদ্ধান্তও স্টারমারের বিচারবোধ নিয়ে সমালোচনার জন্ম দেয়।
অ্যান্ডি বার্নাম (জুলাই ২০২৬– চলমান)
কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন অ্যান্ডি বার্নাম। সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রণে সরকার গঠনের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন।
ক্ষমতা গ্রহণের পর তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং গত এক দশকের ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারায় ইতি টানা।


