উত্তাল যন্তর মন্তর

শিক্ষার্থীদের পক্ষে কংগ্রেস, তরুণদের প্ররোচিত করার অভিযোগ বিজেপির

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। আজ বুধবারও যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী, তরুণ, বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী এবং বিরোধী দলের সমর্থকেরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

দ্য হিন্দু জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার।

এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন কংগ্রেস ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো ন্যায্য এবং কংগ্রেস তাদের সব দাবির পক্ষে।’

রাহুলের ভাষায়, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ—দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছেন।’ তাই তার আর এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নয়াদিল্লির ইন্দিরা ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ছবি: এএফপি

‘শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, তাই বিরোধীদলও রাস্তায়’

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের অবস্থান কর্মসূচির ব্যাখ্যা দিয়ে রাহুল বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য রাস্তায় নেমেছে, তখন বিরোধীদলেরও তাদের পাশে দাঁড়ানো দায়িত্ব।

তিনি জানান, প্রথমে তারা লোকসভা স্পিকারের কাছে নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে আলোচনার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সরকার সংসদে আলোচনা করতে রাজি না হওয়ায় তারা রাজপথে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেন।

রাহুল বলেন, ‘এটি কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাই এর সমাধানও কেন্দ্রকেই করতে হবে।’

পুলিশ রাহুল গান্ধীকে আটক করার সময় ধস্তাধস্তিতে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

‘আমার ওপর কী হয়েছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়’

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ রাহুল গান্ধীকে আটক করে। এ সময় ধস্তাধস্তিতে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে নিজের প্রতি ন্যক্কারজনক এই আচরণকে রাহুল গুরুত্ব দিতে রাজি নন বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু।

‘আমার সঙ্গে কী হয়েছে, সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার সঙ্গে পাঁচগুণ খারাপ আচরণ করা হলেও কিছু যায় আসে না। আসল বিষয় হলো শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশ্নফাঁস এবং নিট পরীক্ষা,’ বলেন তিনি।

আরেক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, পুলিশ সদস্যদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সরকারের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নন।

‘পুলিশ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কানে কানে বলছিল—এই সরকারকে সরিয়ে দিন,’ দাবি করেন তিনি।

বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়ছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) এক সদস্য। ছবি: এএফপি

দিল্লি হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ

২০ জুলাই ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে দায়ের করা একাধিক আবেদনের শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের কাছে জবাব চেয়েছেন।

আদালত একইসঙ্গে ওই দিনের সব সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওগ্রাফি এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তদন্তের সময় সেগুলো ব্যবহার করা যায়।

অন্যদিকে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে করা একটি আবেদন জরুরি ভিত্তিতে শুনানির অনুরোধ গ্রহণ করেননি সুপ্রিম কোর্ট। শুনানির সময় আবেদনকারীর আইনজীবী ভিডিও ফুটেজ দেখানোর কথা বললেও প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এ পর্যায়ে আদালত ভিডিও দেখতে আগ্রহী নয়।’

পুলিশি হামলায় আহত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ককরোচ জনতা পার্টির এক সমর্থক। ছবি: এএফপি

১০ এফআইআর, অনেক আন্দোলনকারী এখনো আটক

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত পাঁচটি থানায় মোট ১০টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। সংসদ স্ট্রিট থানায় চারটি, কনট প্লেসে তিনটি এবং মন্দির মার্গ, বারাখাম্বা রোড ও কর্তব্য পথ থানায় একটি করে মামলা হয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি, ওই দিনের অভিযানে আটক হওয়া অনেক আন্দোলনকারী এখনো বিভিন্ন থানায় রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি হলো, বর্তমান ও ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা না দেওয়া।

যন্তর মন্তর থেকে এক বিক্ষোভকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছবি: এএফপি

যন্তর মন্তরে উত্তেজনা

বুধবার দুপুরে যন্তর মন্তর এলাকায় কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কিছু মানুষকে বোতল ছুড়তে এবং একদিকে দৌড়াতে দেখা যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দিল্লি পুলিশ বারবার মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে এবং রাস্তা খালি রাখতে অনুরোধ জানায়।

আন্দোলনকারীরা আবার অভিযোগ করেন, পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না।

ওয়াংচুক আইসিইউতে, অবস্থা স্থিতিশীল

২৫ দিন ধরে অনশনরত পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে মঙ্গলবার রাতে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকলেও শারীরিকভাবে স্থিতিশীল, সম্পূর্ণ সচেতন রয়েছেন। চিকিৎসকেরা বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছে আন্দোলনের নেতৃত্ব। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার সুস্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তরে আন্দোলন চলবে।

সরকার ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান

প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বিরোধীদলগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘তারা রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ব্যবহার করছে এবং কৃত্রিমভাবে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।’

অন্যদিকে বিজেপি নেতারাও দাবি করেছেন, সরকার শুরু থেকেই আলোচনায় আগ্রহী ছিল এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রয়েছে।

সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু লোকসভায় জানিয়েছেন, সরকার নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত। একইসঙ্গে আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আবারও বৈঠকের সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে।

বিহারের পাটনায় বিক্ষোভ মিছিলে স্লোগান দেন ভারতের জাতীয় পতাকা বহনকারী আন্দোলনকারীরা। ছবি: এএফপি

দিল্লির বাইরেও ছড়াচ্ছে আন্দোলন

নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ এখন শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিহারের পাটনায় শিক্ষার্থী সংগঠনের মিছিল ঠেকাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ করেছে।

এদিকে কেরালার কোচিতেও শিক্ষার্থীরা মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করেছেন। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেকরন জোসেফ বিজয়ও নিট পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।