ঢাকায় ব্যাচেলর বাসা খোঁজার ঝামেলা কমাবেন যেভাবে
ঢাকায় বাসা খুঁজতে গিয়ে ফোন করলেন। ভাড়া, লোকেশন সবই মোটামুটি পছন্দ। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই বাড়িওয়ালার প্রশ্ন, ‘ফ্যামিলি না ব্যাচেলর?’ ব্যাচেলর বলতেই উত্তর এলো, ‘দুঃখিত, ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হয় না।’ ঢাকায় ব্যাচেলর হিসেবে বাসা খুঁজেছেন, এমন সবার কাছেই দৃশ্যটি পরিচিত। শিক্ষার্থী কিংবা চাকরিজীবী—পরিচয় যা-ই হোক, শুধু ‘ব্যাচেলর’ শব্দটির কারণেই অনেক বাসার দরজা শুরুতেই বন্ধ হয়ে যায়। কেউ শিক্ষার্থী রাখতে চান না, আবার কোথাও পুরুষ বা নারী ব্যাচেলরদের বাসা দেওয়া নিয়েও আলাদা আপত্তি থাকে।
ফলে অন্যদের মতো শুধু ‘টু-লেট’ দেখে ফোন করলেই ব্যাচেলরদের বাসা খোঁজার কাজ শেষ হয় না। একটু কৌশল করে খুঁজলে অবশ্য সময় আর ভোগান্তি দুটোই কিছুটা কমানো সম্ভব।
ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া আছে এমন বাসা খুঁজুন
একটি এলাকার প্রতিটি ‘টু-লেট’ নম্বরে ফোন করে ‘ব্যাচেলর দেওয়া হয় না’ শোনার চেয়ে শুরুতেই খোঁজ করুন, কোন ভবন বা গলিতে আগে থেকে ব্যাচেলররা থাকেন। সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, বড় ভাই-আপু কিংবা ওই এলাকায় থাকা পরিচিতদের জিজ্ঞেস করুন। আগে থেকেই ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া আছে, এমন ভবনে নতুন ব্যাচেলর নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। তাই শুধু খালি বাসা নয়, ব্যাচেলররা কোথায় থাকছেন, সেই তথ্যটিও খুঁজুন।
দারোয়ান বা নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞেস করুন
ঢাকায় বাসা খোঁজার ক্ষেত্রে ভবনের দারোয়ান বা নিরাপত্তাকর্মীরা বেশ কাজে আসতে পারেন। অনেক বাসার সামনে ‘টু-লেট’ লেখা না থাকলেও কোন ফ্ল্যাট খালি হবে কিংবা কোন বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়া দেন, এসব খবর তাদের জানা থাকে। পছন্দের এলাকার কয়েকটি গলি হেঁটে ভবনের নিরাপত্তাকর্মীদের সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন। একটি বাসায় জায়গা না থাকলেও পাশের ভবনের খবর তাদের জানা থাকতে পারে।
‘টু-লেট’ দেখলেই নম্বরের ছবি তুলে রাখুন
একই এলাকায় বাসা খুঁজতে গিয়ে একাধিক ‘টু-লেট’ চোখে পড়তে পারে। প্রতিটি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কথা না বলে নম্বরের ছবি তুলে রাখুন। পরে সুবিধাজনক জায়গায় বসে একে একে ফোন করুন। কথার শুরুতেই জিজ্ঞেস করুন, ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হবে কি না। উত্তর হ্যাঁ হলে ভাড়া, অগ্রিম এবং বাসার অন্যান্য তথ্য জেনে তারপর দেখতে যান। এতে শুধু ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হয় না শুনতে এক ভবন থেকে আরেক ভবনে ঘুরতে হবে না।
মাসের শেষের দিকে খোঁজ বাড়ান
অনেক ভাড়াটিয়া মাস শেষে বাসা ছাড়েন। ফলে মাসের মাঝামাঝি থেকে পরের মাসে খালি হবে, এমন বাসার খবর পাওয়া শুরু হতে পারে। বাসা ছাড়ার কয়েক দিন আগে থেকে খোঁজা শুরু করলে পছন্দ করার সুযোগ কমে যায়। বিশেষ করে ব্যাচেলরদের জন্য বাসার বিকল্প তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই সম্ভব হলে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খোঁজ শুরু করুন। পছন্দের এলাকায় নিয়মিত খোঁজ রাখলে নতুন কোনো রুম বা ফ্ল্যাট খালি হওয়ার খবর দ্রুত পাওয়া যায়।
পরিচিত কারও মাধ্যমে কথা বলুন
অনেক বাড়িওয়ালার আপত্তির জায়গা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে না চেনা। বাসায় অতিরিক্ত মানুষ আসা, শব্দ, নিয়মিত ভাড়া পাওয়া কিংবা বাসার যত্ন নিয়ে তাদের নানা আশঙ্কা থাকতে পারে। ওই ভবনের বর্তমান ভাড়াটিয়া বা পরিচিত কারও মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ থাকলে সেটি কাজে লাগান। আপনি কোথায় পড়াশোনা বা চাকরি করেন, কয়জন থাকবেন এবং কতদিনের জন্য বাসা চান, এসব পরিষ্কারভাবে জানান। পরিচিত কারও রেফারেন্স বাড়িওয়ালার আস্থা তৈরিতে কাজে আসতে পারে।
‘আমরা ভালো ব্যাচেলর’ না বলে নির্দিষ্ট তথ্য দিন
‘আমরা কোনো ঝামেলা করব না’ এই আশ্বাসের চেয়ে বাড়িওয়ালাকে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া বেশি কাজে আসতে পারে। কয়জন থাকবেন, সবাই কোথায় চাকরি বা পড়াশোনা করেন এবং দীর্ঘ সময় থাকার পরিকল্পনা আছে কি না, তা জানান। প্রয়োজনে শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র বা কর্মস্থলের পরিচয় দিতে পারেন। আগে কোনো বাসায় ভাড়া থেকে থাকলে এবং আগের বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে তার অনুমতি নিয়ে রেফারেন্সও দেওয়া যেতে পারে। তবে বাসা পাওয়ার জন্য নিজেকে ‘ফ্যামিলি’ পরিচয় দেওয়া বা বাসায় কয়জন থাকবেন, সেই তথ্য গোপন করবেন না। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বাসা ছাড়াসহ নতুন ঝামেলা তৈরি হতে পারে।
শুধু ‘বাসা ভাড়া’ লিখে অনলাইনে খুঁজবেন না
ফেসবুক বা অনলাইনে শুধু ‘বাসা ভাড়া’ লিখে খুঁজলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফ্যামিলি বাসার বিজ্ঞাপন সামনে আসতে পারে। এলাকার নামের সঙ্গে ‘ব্যাচেলর বাসা’, ‘সাবলেট’, ‘রুমমেট চাই’, ‘সিট ভাড়া’ বা ‘শেয়ারড ফ্ল্যাট’ লিখেও খুঁজুন।
পুরো ফ্ল্যাটের বদলে শেয়ারড বাসা ভাবতে পারেন
ব্যাচেলর হিসেবে পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়া কঠিন হলে শেয়ারড ফ্ল্যাটে একটি রুম খুঁজতে পারেন। বিশেষ করে ঢাকায় নতুন এলে এটি বাসা খোঁজার চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে ওঠার আগে বাড়িওয়ালা নতুন সদস্য সম্পর্কে জানেন কি না, সেটি নিশ্চিত করুন। বর্তমান ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বাজার, রান্না এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মের বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলে নিন।
বাসা দেখতে গেলে পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন
কিছু বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ার কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। অফিস বা শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র সঙ্গে থাকলে প্রয়োজনের সময় দেখাতে পারবেন। তবে পরিচয়পত্রের কপি কোথায় এবং কাকে দিচ্ছেন, সেটি খেয়াল রাখুন। শুধু বাসা দেখার পর্যায়েই অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত নথির কপি দিয়ে আসবেন না।
বাড়িওয়ালার নিয়ম শুরুতেই জেনে নিন
ব্যাচেলর বাসা পাওয়া গেছে বলেই তাড়াহুড়া করে উঠে পড়বেন না। বাসায় ফেরার নির্দিষ্ট সময় আছে কি না, অতিথি আনার নিয়ম কী, ছাদ ব্যবহার করা যায় কি না কিংবা কতজন থাকার অনুমতি রয়েছে—এসব শুরুতেই জেনে নিন। আপনি রাতের শিফটে চাকরি করেন, অথচ ভবনের মূল ফটক নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়, এমন হলে বাসা পাওয়ার আনন্দ কয়েক দিনের মধ্যেই ঝামেলায় পরিণত হতে পারে।
একবার ‘না’ শুনলে সেখানে সময় নষ্ট করবেন না
কোনো বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়া দেবেন না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা না করাই ভালো। সেই সময় অন্য বাসা খোঁজায় দিন।
ঢাকায় ব্যাচেলর বাসা খোঁজার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সব খালি বাসাই ব্যাচেলরদের জন্য খালি নয়। তাই এলোমেলোভাবে একের পর এক বাসা দেখার চেয়ে আগে থেকেই ব্যাচেলররা থাকেন এমন ভবন খোঁজা, দারোয়ানদের জিজ্ঞেস করা, পরিচিতদের জানানো এবং ‘সাবলেট’ বা ‘রুমমেট চাই’ ধরনের বিজ্ঞাপনে নজর রাখা বেশি কাজে আসতে পারে। একটু আগে থেকে খোঁজ শুরু করলে আর শুরুতেই নিজের পরিচয় পরিষ্কার রাখলে অন্তত ‘ব্যাচেলর দেওয়া হয় না’ শুনতে শুনতে পুরো শহর ঘোরার ঝামেলা কিছুটা কমানো সম্ভব।
