কিশোরগঞ্জে মেয়েকে বাঁচাতে পানিতে ডুবে বাবার মৃত্যু

৩০ ঘণ্টার ব্যবধানে জেলায় ৭ শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু
নিজস্ব সংবাদদাতা, কিশোরগঞ্জ

চোখের সামনে হাওরের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল আট বছর বয়সী মেয়ে। তাকে বাঁচাতে হাওরের পানিতে ঝাঁপ দেন বাবা। প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও নিজে আর ফিরতে পারলেন না।

এই ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে। মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারানো ওই বাবার নাম মো. বাছির উদ্দিন ওরফে মিলন (৪০)। তিনি পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে আজ শনিবার দুপুরের মধ্যে পৃথক ঘটনায় পানিতে ডুবে নয়জন মারা গেছেন। 

নিহতদের মধ্যে রয়েছে সাত শিশু, এক যুবক ও একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি। 

মাত্র এক দিনের ব্যবধানে একের পর এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জেলায়  শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বাবার মৃত্যু

শুক্রবার বিকেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে করিমগঞ্জের বালিখলা হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন বাছির উদ্দিন। একপর্যায়ে তারা করিমগঞ্জ ও মিঠামইনের সীমান্তবর্তী হাসানপুর সেতু এলাকায় গোসল করতে নামেন।

এ সময় হঠাৎ পা পিছলে গভীর পানিতে পড়ে যায় বাছির উদ্দিনের আট বছর বয়সী মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেন তিনি। প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে অন্যদের হাতে তুলে দিতে পারলেও তীব্র স্রোতের কারণে তিনি আর উঠতে পারেননি।

বেশ কিছুক্ষণ পর স্থানীয়দের চেষ্টায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

নিহত বাছির উদ্দিন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল এলাকার আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান বলেন, ‘মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন পানিতে তলিয়ে মারা গেছেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।’

পানিতে ডুবে আরও ৭ শিশু ও ১ যুবকের মৃত্যু

শুক্র ও শনিবার কিশোরগঞ্জের নিকলী, মিঠামইন, কটিয়াদী, ভৈরব, ইটনা, বাজিতপুর ও সদর উপজেলায় পানিতে ডুবে সাত শিশু  ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

তারা হলো নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের নানশ্রী গ্রামের মোহাম্মদ হাকিম (৫), গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদ নগরের মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন (১২), কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের নাঈম মিয়া (১১) এবং ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার শুভ ইসলাম ওরফে স্মরণ (১২), ইটনা উপজেলার পাঁচকাহনীয়া গ্রামের ফাইজা আক্তার (৮), বাজিতপুর পৌর শহরের মিরারবন্দ গ্রামের মো. তাহসিন (৩), একই গ্রামের মেয়ে মাওয়া আক্তার (৪) এবং সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের ডুবাইল গ্রামের মো. ফয়সাল (২২)। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ৮টার দিকে নিকলীতে নানশ্রী গ্রামে বাড়ির পাশে বড় ভাই ও অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলার সময় অসাবধানতাবশত পুকুরে পড়ে যায় শিশু হাকিম। উদ্ধার করে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে শিক্ষাসফরে আসা একটি মাদ্রাসার ৪০ জন শিক্ষার্থী মিঠামইনের হাওর এলাকায় ঘুরতে যায়। ভ্রমণ শেষে ইসলামপুর ঘাট এলাকায় সবাই একসঙ্গে গোসল করতে নামলে পানির স্রোতে ভেসে যায় মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন। পরে দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলের কাছ থেকেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

দুপুরে কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের নাঈম মিয়া কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে গ্রামের বিলের পানিতে গোসল করতে যায়। সাঁতার না জানায় সে একটি প্লাস্টিকের বোতল ধরে ভাসছিল। গোসল শেষে বোতলটি আনতে সে আবার বিলে যায়। এ সময় পা পিছলে গভীর পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে ভৈরবের জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা শুভ ইসলাম গত বৃহস্পতিবার বাড়ি থেকে গোসল করতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। গতকাল শুক্রবার সকালে তার বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে বিকেলের দিকে এলাকার একটি নদীতে তার লাশ ভেসে উঠতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

আজ শনিবার সকাল ৮টার দিকে ইটনা উপজেলার বরিবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচকাহনীয়া এলাকার নদী থেকে ফাইজার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার বিকেলে ভাইয়ের সঙ্গে নদীতে গোসল করতে নেমে সে নিখোঁজ হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও স্থানীয়দের দীর্ঘ তল্লাশির পরও তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সকালে ঘটনাস্থলের কাছেই তার মরদেহ ভেসে ওঠে। 

বেলা আড়াইটার দিকে বাজিতপুর পৌর শহরের মিরারবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খালপাড়ে খেলতে গিয়ে বড়দের অগোচরে পানিতে পড়ে যায় দুই শিশু তাহসিন ও মাওয়া। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় স্বজনরা তাদের উদ্ধার করে বাজিতপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুই শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। বাজিতপুর থানার ওসি এসএম শহিদুল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিভাবকদের এ বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নীলগঞ্জ বাজার নদীর ঘাট এলাকায় গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে মারা যান ফয়সাল মাহমুদ। তাবলিগ জামাতের সঙ্গীদের সঙ্গে নীলগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে এসেছিলেন ফয়সাল। দুপুরে নদীতে গোসল করতে নেমে তিনি তলিয়ে যান। স্থানীয়রা তাকে খুঁজে না পেয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দিলে ডুবুরি দল প্রায় তিন ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোমেন মুর্শেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।