সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার দাবিনামা ও খেলাধুলার অডিট

মোবাইল ফোন অপারেটরদের ইনফরমেশন এন্ড সিস্টেম অডিট বিষয়ে সর্বশেষ খবর হলো অডিটে পাওয়া তথ্য অনুসারে অপারেটরদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে সরকার খুবই শক্ত অবস্থান নেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
btrc and grameenphone logo
ছবি: সংগৃহীত

মোবাইল ফোন অপারেটরদের ইনফরমেশন এন্ড সিস্টেম অডিট বিষয়ে সর্বশেষ খবর হলো অডিটে পাওয়া তথ্য অনুসারে অপারেটরদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে সরকার খুবই শক্ত অবস্থান নেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তেমনই তো হওয়ার কথা। জনগণের দিকটা তো সরকারকেই দেখতে হবে। এতো কাল জনগণের কাছে সেবা বিক্রি করে যে প্রাপ্তি সেখানে কোনো ঘাপলা হয়েছে কী না বা সেখান থেকে আবার সরকারের যে প্রাপ্য তাও অপারেটররা ঠিকঠাক পরিশোধ করেছে কী না এসব তো অডিটের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসার কথা।

সহজ-সরল গ্রাহককে ফাঁকি দিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটররা লুটে নেবে আর সবাই চুপচাপ দেখবে এমনটা তো জনম জনম চলতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত অডিটের মাধ্যমেই বেরিয়েছে আসলো ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ঘাপলার খবর। এতো আর চাট্টিখানি কথা নয়! শুধু গ্রামীণফোনের কাছেই সরকারের এই পরিমাণ টাকা পাওনা হয়েছে।

বলা হচ্ছে, টেলিকম খাতে অডিটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবিকৃত অর্থের হিসাব এটি বিশ্ব রেকর্ড (যদিও এমন বলার পেছনে কোনো তথ্য প্রমাণ মেলেনি)।

অডিট এর মধ্যে আরও একটি হয়েছে, সেখানে রবি’র কাছে দাবি করা হয়েছে ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

আলোচনাটি যখন এই পর্যন্ত তখন সরকারের অবস্থান ঠিকই আছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু, এবার একটু গভীরে নামুন, আপনার অবস্থানই কিন্তু তখন টলমলে হয়ে যাবে।

একদিন পেছনে যান দেখবেন, গ্রামীণফোনই বরং শক্ত গলায় বলছে বিটিআরসির অডিট বেআইনি এবং পাওনা হিসেবে উল্লেখ করা অংক ভিত্তিহীন।

এ কী কথা? একটি বিদেশি অপারেটর কীভাবে এতো সাহস পায় যে আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই থোড়ায় কেয়ার করে মুখের ওপর বলে দেয় যে বেআইনি ও ভিত্তিহীন কাজ করছেন তারা।

আড়ালে-আবডালে ‘অফ দ্য রেকর্ড’ এর সুযোগ নিয়ে অন্য অপারেটরগুলোও বলছে, ৫০ হাজার কোটি টাকার এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট দক্ষতা এবং যোগ্যতা এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেই। যাকগে সে আরেক আলোচনা। কিন্তু, বিষয়টি যখন অডিট তখন দেখেন, টেলিযোগাযোগ আইন কিন্তু সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে বিটিআরসি প্রতি বছর অপারেটরদের অডিট করবে।

নানা কারণে বিটিআরসি সেটি করতে পারেনি। এমনকি বিটিআরসি’র ব্যস্ততা এতোটাই বেশি যে তাদের জন্মের দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো পর্যন্ত সফলভাবে একটি অডিটও করতে পারেনি, যেটি পরিণতি পেয়েছে। বরং অডিট বিষয়টি বারবারই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, নানা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কিন্তু, হওয়ার কথা ছিলো উল্টো। অডিট-ই বরং হওয়া উচিৎ বিতর্কের সুরাহা করার জন্যে।

নিয়মিত অডিট না করায় কী হয়েছে দেখেন- কোনো এক অপারেটরের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হয়তো জ্ঞাত বা অজ্ঞাতে ১০০ টাকার হিসেবের গড়মিল হয়ে গেলো। এবার বিটিআরসি’র নিয়মানুসারে নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ না হলেই ১৫ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি। প্রথম বছরেই যদি হিসাবের এই গড়মিল ধরা পড়তো তাহলে ১১৫ টাকা দিয়েই হয়তো সুরাহা হতো। কিন্তু অডিট যেহেতু হচ্ছে, ২২ বছরের মধ্যে প্রথমবার সুতরাং ১৯৯৭ সালের কোনো একটি গড়মিলের জন্যে ওই অপারেটরের কাছে দাবি করা হচ্ছে ৫০০ টাকা। এক সময় তো আবার বিলম্ব ফি ছিলো চক্রবৃদ্ধি হারে। এখন সেটি সরল হারে করা হয়েছে। না হলে সাড়ে বারো হাজার নয়, অংকটা হয়তো ২০ হাজার কোটি টাকায় দেখতেন।

ঠিক এই কারণেই বিটিআরসি’র পাওনা হিসেবে দাবিকৃত অর্থের ৭৩ শতাংশই এসেছে সুদ হিসেবে। এখন এ বিষয়ে কেউ যদি যৌক্তিকতার প্রশ্ন তোলেন তাহলে কি তারা ভুল করবেন? প্রশ্ন কিন্তু আসছে।

এবার জরিমানার প্রসঙ্গ। ১৫ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি, যে কোনো ক্ষেত্রে। প্রশ্ন হলো, ব্যাংকের সুদের হার অনেক বেশি তারপরেও সেটি কতো? তার মানে হলো আপনারই দায়িত্ব আপনি ঠিক সময়ে পালন না করার খেসারত দিতে হবে আরেকজনকে, সেটিও উচ্চহারে।

কথাগুলো মোবাইল ফোন অপারেটরদের পক্ষে যাচ্ছে বলেই হয়তো মনে হতে পারে। এখানে কথা হলো, শুধু শক্ত নিয়ম-কানুন করলেই তো হবে না। সেটি প্রতিপালন করার জন্যে দক্ষ এবং যোগ্য হতে হবে আমাদের সংস্থাগুলোকে।

যখন দেখবেন, মোবাইল ফোন সেবা চালু হওয়ার অনেক পরে সংশ্লিষ্ট নিয়ম-কানুন এসেছে। এখন নিয়ম চালু হওয়ার আগের ঘটনাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কথা হওয়া উচিৎ মূলত অনিয়মগুলো কি কি এবং কেনো সেগুলো হয়েছে এবং কার কারণে সেগুলো এমন বিশালাকৃতি পেয়েছে তা নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন। বিটিআরসি বা গ্রামীণফোন বা রবি কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলছে না কেনো সেটিও একটি রহস্য।

তাহলে কি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের প্রত্যেকেই যে নিজেদেরকে প্রতারিত অনুভব করেন তার পেছনে সব পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে? মাত্রাতিরিক্ত কল ড্রপ, বাজে মানের ভয়েস কল বা ধীরগতির ইন্টারনেট-এর সব কিছুতেই কি বিটিআরসি’র না দেখার একটি দিকও রয়েছে? সেগুলো জমে জমেই কি আজ সাড়ে ১২ হাজার কোটি কোটি বা পৌনে ৯০০ কোটি টাকার অংক বাড়ছে।

সর্বশেষ দফায় বিটিআরসি দুটি অডিট শুরু করেছিলো এক সঙ্গে। রবি’র টা আগে শেষ হয়েছে। আর গ্রামীণফোনেরটা শুরু হতেই অনেক দেরি হয়েছে। কারণ গ্রামীণফোন শুরুতে অডিটরকে তাদের অফিসেই ঢুকতে দেয়নি। বিদেশি অপারেটরের সাহস দেখেন! কিন্তু, কোথায় পেলো তারা এই সাহস?

এর উত্তর হল, ২০১১ সালে বিটিআরসি প্রথমবার অডিটের কাজ শুরু করে। তখন গ্রামীণফোন আর বাংলালিংকের অডিট করার সিদ্ধান্ত হয়। অডিটের পর গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসি’র দাবিকৃত অর্থ ছিলো তিন হাজার ৩৪ কোটি টাকা। পরে অবশ্য তখনকার অডিটর নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই অবৈধ বলে দেয় আদালত। আর কয়েকবার অডিটর বদল করেও বাংলালিংকের অডিট তখন সম্পন্নই করা যায়নি।

এই দফায় গ্রামীণফোনের প্রশ্ন ছিলো নতুন করে শুরু থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের অডিট হচ্ছে তাহলে কি আগের অডিটের ফলাফল বাতিল হয়ে যাবে না কী তা বিদ্যমান থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর আজো কেউ পাননি।

সেবার তড়িঘড়ি করে কোনো অডিট করা হয়েছিলো সেটিও যারা সেক্টরটিতে ছিলেন তারা ভালো করেই জানেন। ২০১১ সালে অপারেটরদের লাইসেন্স নবায়ন করা হয় এবং লাইসেন্স নবায়নের আগে চাপ তৈরি করার কৌশল ছিলো সেটি। নিয়ন্ত্রকদের এই যে গাজোয়ারি আচরণ, যার মধ্যে এক ধরনের ভাঁড়ামি এবং ভণ্ডামিও রয়েছে। ঠিক এর কারণেই স্বচ্ছতা আনার জন্যে যে অডিট সেটি বারবার কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।

দিন কয়েক আগে কথা হচ্ছিল বিটিআরসি’রই এক কমিশনারের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলছিলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ দিলেও পরে হাজার হাজার কোটি টাকার সুদ মাফ করে দেওয়া হয়। অপারেটররাও চাইলে বিলম্ব ফি বা সুদ বিষয়ে সরকারের কাছে মাফ চাইতে পারে। সরকার বিবেচনা করতেও পারে।

দেখেন, ভণ্ডামির একটি সীমা-পরিসীমা থাকা দরকার। এই বক্তব্যের মাধ্যমে কি আপনি আপনার নিজের কাজকেই খারিজ করে দিচ্ছে না? এর অর্থ দাঁড়ায় আপনার অডিট রিপোর্ট আপনি নিজেই ওউন করছেন না।

কেউ কেউ আবার প্রস্তাব দিচ্ছেন, যে যে পয়েন্টে অপারেটররা একমত যে তারা ফাঁকি দিয়েছে সেই টাকা তারা দিয়ে দিক এবং বাকিটার জন্যে আদালতে যাক, তদবির বা যা করার করুক।– চিন্তা করেন পরিস্থিতি, কতোটা নামলে এমন প্রস্তাব দেওয়া যায়?

সব মিলে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, অডিটের মাধ্যমে দাবিকৃত অর্থ আদায়ে বিটিআরসি শক্ত অবস্থান নিলেই অপারেটররা আদালতে যাবে চ্যালেঞ্জ করতে। এ বিষয়ে তাদের সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে।

তাহলে বিষয়টিতে শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ালো তা হলো হাজার কোটি টাকা আদায় করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে করা অডিট ঝুলে যাচ্ছে আদালতে। কিন্তু, গুণগত সেবা না পাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকের ক্ষোভ-বিক্ষোভ তাতে একটুও প্রশমিত হবে না বরং সেটি আরও বৃদ্ধিই পাবে। হয়তো সাধারণ মানুষ অডিট নামের এই যে খেলাধুলা তাতে খানিকটা ধিক্কারই দেবে, এই তো, এর বেশি আর কী?

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Govt may go for quota reforms

The government is considering a “logical reform” in the quota system in the public service, but it will not take any initiative to that end or give any assurances until the matter is resolved by the Supreme Court.

1d ago