ডেটাথন, হ্যাকাথন বনাম রচনা প্রতিযোগিতা

চিন্তা করুন, এক দিকে স্টার্টআপ হ্যাকাথন, ডেটাথন আর অ্যাপ কনটেস্ট। আর অন্যদিকে রচনা প্রতিযোগিতা। এক দিকে যুগ যুগের স্থিতাবস্থা অন্যদিকে ডিজিটালাইজেশনের ছুটে চলা গতি।
Datathon
রবির আয়োজনে ডেটাথন। ছবি: সংগৃহীত

চিন্তা করুন, এক দিকে স্টার্টআপ হ্যাকাথন, ডেটাথন আর অ্যাপ কনটেস্ট। আর অন্যদিকে রচনা প্রতিযোগিতা। এক দিকে যুগ যুগের স্থিতাবস্থা অন্যদিকে ডিজিটালাইজেশনের ছুটে চলা গতি।

এটি দেশের ডিজিটালাইজেশনের একটি প্রেজেন্টেশান, যার এক স্লাইডে রয়েছে প্রযুক্তি কেন্দ্রিক নতুন সেবা নিয়ে আসার বেসরকারি উদ্যোগ আর পরের স্লাইডে মিলছে বহুপুরনো সরকারি গতিহীন প্রচেষ্টা।

এবার প্রেজেন্টেশানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা যাক।

আসছে ১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস। পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশও যুগ যুগ ধরে এই দিবসটি পালন করে আসছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। সরকারের টেলিযোগাযোগ বিভাগ দিবসটিকে যথাযথো মর্যাদায় পালনের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনা সভা হবে, স্যুভেনিওর ছাপা হবে, বাহারি রোড শো হবে, গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে, টেলিভিশনগুলোতে বিশেষ টকশো হবে, গালা ডিনার হবে- কোটি কোটি টাকা খরচও হবে।

ইতিমধ্যে আয়োজনের কাজ শুরু হয়েও গেছে। সরকারের বিভিন্ন কোম্পানি এবং সংস্থাকে কাজ ভাগ করেও দেওয়া হয়েছে।

প্রায় সব বছরই আলোচনা সভায় রাষ্ট্রপতি উপস্থিত থেকেছেন। এটা উল্লেখ করছি এ কারণে যে দিবসটিকে রাষ্ট্র কতোটা গুরুত্ব দেয় সেটা বোঝাতে।

তবে সব আয়োজনের মাঝে একটি জায়গায় বারবার আমার দৃষ্টি দুঃখ এবং করুণাভরে আটকে যায়। দিবসটিকে সামনে রেখে সরকারের এতো বড় আয়োজনের একটা জায়গায় দেখা যায় বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় দিবসটিকে সামনে রেখে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজনের। ২০০৮ সালে সাবমেরিন কেবল কোম্পানির জন্ম হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি আয়োজন করতো তখনকার বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড যা হালে নাম হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড।

যখন আমরা অ্যানালগ সময়ে, সরকারেরও কোনো ডিজিটালাইজেশনের ভিশন ছিলো না তখনও রচনা প্রতিযোগিতার এমন তরো আয়োজন হয়েছে, এখনও সেই লিগেসি চলছে।

মূলত স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় দুটি ভাগে হয় এই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে রচনা সেরা নির্বাচিত হয় এবং পুরস্কৃত হয় সেগুলো আবার স্যুভেনিওরে ছাপাও হয়। সবারই দেখার সুযোগ হয় সে রচনা। আবার সুযোগ হয় মান যাচাইয়েরও। যারা একটু দিন-দুনিয়ার খবরাখবর রাখেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব আবর্জনার দিকে তারা কেউ ফিরেও তাকান না।

এবার অন্য স্লাইডটার দিকে একটু নজর দেই। সেখানে দেখবেন, দেশে ডিজিটাল কালচার গড়ে তুলতে স্টার্টআপ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য জানার প্রক্রিয়া সহজ করতে অ্যাপ কনটেস্টও হয়েছে অহরহ। সফটওয়ার প্রতিযোগিতাও হরহামেশাই দেখছি আমরা।

এই তো গত শনিবার মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আয়োজন করল দেশের প্রথম ডেটাথন। যেখানে একটি সমস্যা দিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি গ্রুপকে। সময় ২৪ ঘণ্টা। রবি’র অফিসে বসেই ২৪ ঘণ্টা খেটেখুটে দলগুলো সমস্যার সমাধান নিয়ে আসলো।

এর আগে গ্রামীণফোনও ফি বছর স্টার্টআপ প্রতিযোগিতা করে। বাংলালিংকও সরকারের হাইটেক পার্ক অথরিটির সঙ্গে মিলে আয়োজন করে এমন একটি প্রতিযোগিতা।

শুধু মোবাইল ফোন অপারেটর কেনো বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানও এখন এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। একটি গণমাধ্যমও যুক্ত রয়েছে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে। খুব যে বেশি খরচ লাগে তাও কিন্তু নয়। দরকার শুধু উদ্যোগের। আর তারও আগে দরকার বিষয়টা বোঝা, সামনের দিন দেখতে পারার ক্ষমতা থাকা এবং সর্বোপরি এসব বিষয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুভব করা।

এবারের রচনা প্রতিযোগিতার জন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে বিষয়বস্তু হিসেবে নেওয়া হয়েছে। খুবই ভালো বিষয়। এই বিষয়ের ওপরেই হোক না অ্যানিমেশন প্রতিযোগিতা। ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি ডিভাইসে কিভাবে ওই স্যাটেলাইটের ব্যবহার নামিয়ে আনা যায় তার প্রতিযোগিতাও। তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রিক আরও নানা প্রতিযোগিতাও হতে পারে। করুন না সেগুলো। এগুলোর আয়োজন যদি না করি তাহলে এই খাতের দক্ষমানব সম্পদ কোথা থেকে আসবে?

এর আগে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুরোধ করে রচনা প্রতিযোগিতার মতো এমন প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগের প্রতিযোগিতা বাদ দেওয়ার কথা তোলা হয়েছে। সাংবাদিকরাই সেটা করেছেন। কিন্তু আবারও যখন দেখা যাচ্ছে সংবাদপত্রে রচনা প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন আসছে তখন তো মনে হচ্ছে অনুরোধের ঢেকিটিও আগের জায়গায় পড়ে আছে, গেলেননি তারা।

দেশে এখন তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রিক অনেকগুলো সংগঠন আছে। অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানও আছে এমন সব আয়োজন করার মতো- যারা সামনের দিনটা দেখতে পায়। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেন। দেখেন, কতো সুন্দর সুন্দর প্রতিযোগিতা হয় আবার তার মাধ্যমে নতুন নতুন ট্যালেন্টও বেরিয়ে আসে।

ঢাকার বেশ কয়েকটি কোম্পানিই এখন জাপানের মতো প্র্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা দেশকে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন নতুন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন বাজারে আমাদের ঢোকার সুযোগ আমাদের সামনে রয়েছে। নিজেদের আইওটি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বাজারটিও দিনকে দিন অনেক বড় হচ্ছে। সব মিলে আমাদের নিজেদেরই তো লাখ লাখ প্রযুক্তিবিদ লাগবে। তারা আসবে কোথা থেকে?

আমরা এখন স্যাটেলাইটের মালিক। আমাদের ছেলে-মেয়েরা স্যাটেলাইট চালাচ্ছে। সাবমেরিন কেবলের ব্যবস্থাপনা করছে। সামনের দিনে যাতে আমরা নিজেরাই স্যাটেলাইট উড়াতে পারি বা সমুদ্রে যাতে সাবমেরিন কেবল বসাতে পারি তার জন্যে কিন্তু মানবসম্পদ তৈরির পথ-রেখাটা অন্তত তৈরি করতে হবে। এসব প্রতিযোগিতাই হতে পারে এসব পথ-রেখার শুরু।

সুতরাং, এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন যাতে নতুন সম্ভাবনা বেরিয়ে আসে। বস্তাপচা চিন্তা দিয়ে যতোদূর এগিয়েছি আমরা এটাই আমার বিবেচনায় সর্বোচ্চ। এখন নতুন চিন্তায় পথ চলার শুরু করতে হবে। না পারলে পথ ছেড়ে দেন দেখবেন আরও হাজারো জন রয়েছেন এগুলোকে এগিয়ে নিয়ে নেওয়ার জন্যে।

Comments

The Daily Star  | English
remittances received in February

Remittance hits eight-month high

In February, migrants sent home $2.16 billion, up 39% year-on-year

4h ago