জীবনের শুরুতে সঞ্চয় পরিকল্পনা মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে

আবিদের জন্মের পরপরই ১৮ বছর আগে মা তার উচ্চশিক্ষার ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে বাণিজ্যিক ব্যাংকে একটি সঞ্চয় প্রকল্প খুলেন। তিন বছর পর যখন আবিদের ছোটবোনের জন্ম হয়, মা আনোয়ার বেগম, তার জন্যও একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলেন।
money cartoon

আবিদের জন্মের পরপরই ১৮ বছর আগে মা তার উচ্চশিক্ষার ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে বাণিজ্যিক ব্যাংকে একটি সঞ্চয় প্রকল্প খুলেন। তিন বছর পর যখন আবিদের ছোটবোনের জন্ম হয়, মা আনোয়ার বেগম, তার জন্যও একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলেন।

বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার আগে তিনি আরও দুটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলেন- একটি পোস্ট অফিসে অন্যটি অপর একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। যাতে সন্তানদের বিয়ের সময় বা জরুরি চিকিৎসার কাজে প্রয়োজন হলে তিনি সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

আবিদ এখন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরের ছাত্র। এক বছর আগে যখন তিনি একটি খণ্ডকালীন চাকরিতে যোগ দেন, তার মা ছেলের মধ্যেও সঞ্চয়ের মানসিকতা ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য তার মাসিক আয় থেকে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলার জন্য ছেলেকে উদ্বুদ্ধ করেন।

“সঞ্চয় করার কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা এখন সঞ্চয় না করি, তাহলে দুঃসময়ে টাকা দরকার হলে আমরা কোথায় পাবো?” বলেছিলেন আনোয়ারা বেগম।

শুধু আনোয়ারা বেগম নন। বাংলাদেশের সব মানুষেরই উচিত সঞ্চয় করা, যেহেতু বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো অবসর ভাতার ব্যবস্থা নেই। তাই সাধারণ মানুষকে তাদের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

সার্বজনীন পাবলিক পেনশন পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের নিরাপদ জীবনের জন্য ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত দুর্বল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মানুষকে তাদের সঞ্চয়ের জন্য মূলত ব্যাংক এবং অন্যান্য নন-ব্যাংকিং আর্থিক সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।

ব্যাংকগুলোও তাদের গ্রাহকরা যেনো জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন সেটি মাথায় রেখেই নতুন নতুন সঞ্চয়ী হিসাবের প্রস্তাব দিচ্ছে।

এটি সাম্প্রতিক প্রবণতা। দেশের অর্থনীতি চাঙা হওয়ার আগ পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঞ্চয়ী হিসাবের জন্য নানা ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে গ্রাহকদের কোনো প্রস্তাব দেয়নি। আগে প্রায় সবগুলো ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানই প্রায় একই ধরনের কয়েকটি আমানত স্কিমের প্রস্তাব দিতো।

আর এখন, তারা বিভিন্ন ধরণের সঞ্চয় প্রকল্প গ্রাহকদের জন্য আনছে, যা শুধু সুদের হার নয়, আরও নানা ধরনের সেবা গ্রাহকদের দিয়ে থাকে।

ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ক্ষুদ্র আমানতের প্রধান আল-মামুন আনসার বলেন, “আমরা সব বয়সের, আর্থিক অবস্থার এবং পেশার গ্রাহকদের জন্য সঞ্চয় স্কিম চালু করেছি।”

তিনি আরো বলেন, “একজন ব্যক্তি তার পুরো জীবনের যেকোনো সময়ই যেনো সঞ্চয় করতে পারেন সেটা আমরা মাথায় রাখি।”

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ ব্যাংকিং শাখার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. এম এ মোতালেব বলেন, “সব ধরনের মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তরের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ব্যাংকগুলো তাদের সঞ্চয়ী হিসাবে বৈচিত্র্য এনেছে।”

একটু একটু করে পরিবর্তন হতে হতে ব্যাংকিং সেক্টরে সঞ্চয় প্রকল্পের বিশাল পরিবর্তন এসেছে।

আগে সাধারণ মানুষ ডিপোজিট পেনশন স্কিমের (ডিপিএস) আওতায় অল্প অল্প করে সঞ্চয় করতেন। কিন্তু এখন ডিপিএস-এর আওতায় বড় আমানত হিসাব খুলছে।

আগে মানুষের বড় পুঁজি ছিলো না। ফলে তারা একবারে বেশি টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন না। কিন্তু, এখন মানুষের সামর্থ্য বেড়েছে।

গত কয়েক বছর আগেও ব্যাংকে কোটিপতি স্কিম বলে কোনো কিছু ছিলো না।

মোতালেব নামের এক ব্যক্তি গত ১৫ বছর ধরে এসআইবিএলে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “বাবা-মা নবজাতকের নামে একটি ডিপিএস অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন এবং এটি চালাতে পারেন। সন্তান স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, তাদের জন্য এখন অ্যাকাউন্ট খোলা যায় এবং বাচ্চার বয়স ১৮ হওয়া পর্যন্ত এটি চালানো যায়। সন্তানের বয়স ১৮ হওয়ার পর এই হিসাবটি সঞ্চয় হিসাবে পরিণত হয় এবং তখন সে নিজেই এটি পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।”

“এটি অ্যাকাউন্ট-হোল্ডারদের ব্যাংকগুলির কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়,” যোগ করেন মোতালেব। তিনি বলেন, “এসআইবিএল তার গ্রাহকদের দেনমোহর পরিশোধের জন্য সঞ্চয় স্কিম চালু করেছে। গ্রাহক তার বিয়ের আগে বা পরে এটি খুলতে পারেন।”

এছাড়া এই ব্যাংকে রয়েছে আস্থা সঞ্চয় প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রাহক প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক মুনাফা পায়, যেটি দিয়ে তিনি তার সংসারের মাসিক ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন।

ব্যাংকের সুপার সেভিং হিসাব বয়স্ক নাগরিক ও নারী গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। এ হিসাবের গ্রাহকরা অন্যান্য সঞ্চয় স্কিমগুলির তুলনায় এক শতাংশ পয়েন্ট বেশি লাভ পেয়ে থাকেন।

এসআইবিএলের নতুন আর একটি সঞ্চয় প্রকল্প যার আওতায় গ্রাহকের আমানত ছয় বছরে দ্বিগুণ হয়ে থাকে।

“সঞ্চয় প্রকল্প চলাকালে যদি সুদের হারের তারতম্য হয়, তাহলে ব্যাংক নিজ দায়িত্বে সে গ্রাহকের ঘাটতি পূরণ করে দেয়। আর এটি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন মোতালেব।

এছাড়াও, হজ্ব এবং যাকাত সঞ্চয় অ্যাকাউন্টও রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাংক লক্ষ্য রাখে যে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের সময় যেনো কোনোরকম ঝামেলায় না পড়েন।

এমনকী, এই ব্যাংকের একটি ওয়াকফ হিসাবও রয়েছে। এই হিসাবের আমানত গ্রাহক দান করার জন্য সঞ্চয় করে থাকেন।

ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন লিমিটেড এসইভিপি ও হেড অব বিজনেস নাসিমুল বাতেন বলেন, “বয়স্ক নাগরিক, বিশেষত যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি তাদের জন্য আমরা বিশেষ সুদের হার প্রস্তাব করি। তবে সুদের এই হার নির্ভর করে আমানতের পরিমাণের ওপর।”

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিআরও মতি-উল হাসান বলেন, “সম্প্রতি আমরা নারীদের জন্য অপরাজিতা মাসিক বেনিফিট স্কিম চালু করেছি। নারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এই স্কিমের আওতায় সঞ্চয় করে বিশেষ সুবিধা পাবেন। নারীদের জন্য আমরা পেনশন স্কিমও প্রস্তাব করছি।”

এই প্রকল্পটি নারীকে ঝামেলামুক্ত ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকে এবং তারা তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়কল্পে টাকা জমা করতে পারেন।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে, নারীরা একটি বিকল্প উপার্জনের সুযোগ পায় এবং প্রবাসী বাংলাদেশি মহিলারাও এই প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ পায়।

সিটি ব্যাংক লিমিটেডের একজন ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার বলেন, জীবনযাত্রার মানের উন্নতির কারণে, গ্রাহকদের সঞ্চয়ী হিসাবগুলো লেনদেন অ্যাকাউন্টে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে, তাই যদি একটি ব্যাংক সঞ্চয়ী হিসাবের পরিচালনা করতে খুব ভালো হতে চায়, তবে এটি গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে হবে। সুদের হারের তেমন পার্থক্য না থাকায় এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ব্যাপক।

তিনি বলেন, সিটি ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প উদ্ভাবন করেছে। কারণ একজন ছাত্রের যা প্রয়োজন একজন বয়স্ক ব্যক্তি বা মহিলা গ্রাহকের তা প্রয়োজন নয়।

যেমন, একজন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য তার সঞ্চয়ী হিসাবে বীমা অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। এ বীমার প্রিমিয়াম ব্যাংকই পরিশোধ করে থাকে। ব্যাংক থেকে তাদের একটি স্বাস্থ্যকার্ড দেওয়া হয় যা গ্রাহককে দেশের অনেক বড় বড় হাসপাতালগুলোতে ডিসকাউন্ট সুবিধা দেয়।

একজন বয়স্ক নাগরিক গ্রাহকের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থী অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ছাড় পেয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, যদি ব্যাংকের জন্য সঞ্চয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়ে যায়, তাহলে এটি ব্যাংকের ব্যবসার জন্য নতুন পথ খুলে দেয়। কারণ, তারা গ্রাহককে পাঁচ বছর পর ঋণ বা বাড়ি তৈরির জন্য ঋণ দিতে পারবেন। কিংবা ক্রেডিট কার্ড বিক্রি, এবং ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট সহজতর করার জন্য সেবা দিতে পারবে।

সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, “যদি আমরা গ্রাহকের প্রতিটি প্রয়োজন মেটাতে পারি তবে গ্রাহকরা তাদের সমগ্র ব্যাংকিং প্রক্রিয়া আমাদের সাথে সম্পন্ন করবেন।”

ডিবিএইচ থেকে নাসিম বলেন, “আমাদের সর্বনিম্ন নির্দিষ্ট আমানতের পরিমাণ ২,৫০০ টাকা। যাতে সবধরনের আয়ের মানুষই আমাদের সঞ্চয় প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন।”

তিনি আরো বলেন, “সুদের হার কমানোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি আমানত বাংলাদেশে পছন্দসই নয়।”

ইবিএলের আনসারের মতে, একটি সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট খোলার মধ্য দিয়ে ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়। তিনি বলেন, “ব্যাংকের কাছে এসব আমানতকারী খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা ব্যাংকের জন্য স্থায়ী তহবিল যোগান দেন।”

Comments

The Daily Star  | English

Government ready to hold talks with quota reform activists: law minister

Law Minister Anisul Huq today said the government is ready to hold talks with the quota reformists

15m ago