শীর্ষ খবর

কৃষকের পাশে দাঁড়ান: আগে বোরো বাঁচান, পরে আউশ

কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে কৃষি খাতে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে এ পর্যন্ত যে সব সরকারি সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে দেশের প্রধান শস্য বোরো ধান চাষিদের দুঃখ খুব কমই লাঘব হচ্ছে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে কৃষি খাতে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে এ পর্যন্ত যে সব সরকারি সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে দেশের প্রধান শস্য বোরো ধান চাষিদের দুঃখ খুব কমই লাঘব হচ্ছে।

সম্প্রতি ঘোষিত ৫,০০০ কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা থেকে শস্য ও ফসল উৎপাদনকারীদের বাদ রাখা হয়েছে। আবার কৃষি মন্ত্রণালয় যে মে মাস থেকে বিনামূল্যে বীজ-সার বিতরণ ও কৃষকের সেচ খরচ কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, তাতে মূলত আউশ ধান চাষিরাই উপকৃত হবেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে উৎপাদিত মোট চালের ৫০ শতাংশের বেশি আসে বোরো ধান থেকে, যেখানে আউশ ধান থেকে মেলে ১০ শতাংশেরও কম।

কিন্তু, কৃষি মন্ত্রণালয় বোরোর পরিবর্তে আউশ ধানকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে এই যুক্তিতে যে বোরো চাষিদের উৎপাদনের ক্ষতি পোষাতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

‘বোরো চাষ তো শেষ হয়ে গেছে। কৃষকরা এখন ধান কেটে ঘরে তোলার কথা চিন্তা করছেন,’ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান এ মাসের গোড়ার দিকে দ্য ডেইলি স্টারকে এ কথা বলেছিলেন।

‘বোরো চাষিদের জন্য এখন আমাদের কিছুই করার নেই। কৃষিতে কোনো সুবিধা কৃষক পর্যন্ত পৌঁছাতে যে সময়ের দরকার হয়, সে সময়টা এবারের বোরোর জন্য শেষ হয়ে গেছে,’ যোগ করেন তিনি।

কিন্তু, বোরো চাষি ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের মতে, সিলেটের হাওড় অঞ্চল ছাড়া, যেখানে ইতোমধ্যেই ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে, দেশের অন্য অঞ্চলের বেশিরভাগ স্থানে মে মাসে ধান কাটা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সেচ দিতে হবে।

তারা বলেছেন, এপ্রিলের শুরুতেই সরকারি সুবিধা পেলে ক্ষুদ্র-প্রান্তিক চাষিরা যারা সেচের খরচ মেটাতে ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন তারা রক্ষা পেতেন।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে বোরো চাষ শুরু হয়। তারপর ধান কাটার এক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত বোরোর জমিতে সেচ দিতে হয়।

বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩ দশমিক ৬৪ কোটি টন। তার মধ্যে বোরো থেকে এসেছিল শতকরা ৫৪ ভাগ, আমন থেকে ৩৪ ভাগ আর আউশ থেকে এসেছিল আট ভাগ।

এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৪৭ দশমিক ৫৪ লাখ হেক্টর জমি থেকে দুই কোটি টন ধান আশা করছে এবং ১৪ লাখ হেক্টর জমি থেকে ৩৪ লাখ টন চাল উৎপাদন চাইছে।

সরকারি সুবিধাদি

গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি খাতে যে ৫,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তাতে মূলত কৃষির চলতি মূলধনভিত্তিক খাত গুলো যেমন হর্টিকালচার, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনকারীরা ঋণ সুবিধা পাবেন।

উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যারা কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য কিনে সরাসরি বাজারে বিক্রি করেন তারাও এই ঋণ সুবিধা পাবেন। বিভিন্ন ব্যাংকগুলোকে এই ঋণ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ চার শতাংশ সুদে চলতি মূলধনভিত্তিক কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা নিতে হবে।

এই ঋণসুবিধা থেকে শস্য ও ফসল উৎপাদনকারীদের বাদ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে যেখানে ৫,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোতে শস্য ও ফসল খাতের জন্য চলতি বছরে সর্বোচ্চ ১৪,৫০০ কোটি টাকার একটি ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চালু আছে। কিন্তু, এই ঋণের সুদ ৯ শতাংশ।

গত ৮ এপ্রিলে কৃষি মন্ত্রণালয় ৯ দশমিক ২৯ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছে সেখানেও বোরো চাষিদের বাদ রাখা হয়েছে। সেখানে মে মাসে শুরু হতে যাওয়া আউশ চাষের জন্য বিনামুল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হবে।

আবার অল্পদিনের মধ্যেই সরকার সেচের খরচ কমিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করছে, সেটাও শুধুমাত্র এ বছরের আউশ চাষের জন্য।

কৃষিসচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলছিলেন, এ বছরের আউশ মৌসুমে সেচের খরচ কমিয়ে দেওয়ার জন্য খুব শীঘ্রই দেশের সেচ প্রদানকারী দুটি প্রধান সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হবে। সংস্থা দুটি হল বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন।

‘আমরা আসলে আউশের জন্যই কৃষকদের উৎসাহিত করছি যাতে তারা অনেক বেশি জমিতে এবার আউশ চাষ করে। এবারে উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদন আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

কৃষিবিদদের মতে এ বছর আউশের উৎপাদন বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তা না হলে করোনাভাইরাসের কারণে দেশ খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা। তারা বলেছেন, বোরো ধানকে পুরোপুরি সরকারি সুবিধাদির মধ্যে আনাও জরুরি ছিল।

একজন উচ্চপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘এখনো যদি বোরো চাষিদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া যায় তাহলে অনেক জমিতে যেখানে কৃষক সেচ দিতে পারছেন না বা কীটনাশকের টাকা যোগাড় করতে পারছেন না সেখানে ধান রক্ষা করা যাবে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘বোরো ধান এক সময়ে দেশের মোট উৎপাদিত চালের ৬০ শতাংশ সরবরাহ করত। কিন্তু প্রণোদনার অভাবে গত বছর এই হার কমে গেছে।’

তিনি জানান, গত বছর বোরো ধানের মূল্য কম পাওয়ার পর থেকেই বিআরআররআই, ডিএই, বিএডিসি ও বিএমডিএসহ বেশ কয়েকটি কৃষি সংশ্লিষ্ট সংস্থা সরকারকে বলে আসছিল যে এই মৌসুমে সেচের খরচ সম্পূর্ণ কমিয়ে দিতে।

‘কিন্তু, এ বছরের বোরো চাষে সেচের খরচ অপরিবর্তিত থেকেছে,’ যোগ করেন তিনি।

তবে সরকার বোরো ধান কাটার জন্য এ বছর ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা দিয়ে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া হবে।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কৃষক রেজাউল হাসান বলছিলেন, ‘এসব যন্ত্রের খুব কমই আমাদের কাজে আসে।’

তার মতে, ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার আমাদের ছোট-ছোট ধানের জমিতে কোন কাজে আসে না। এটা ব্যবহার করলে ধানের খড় নষ্ট হয়, যেখানে অনেক কৃষক খড় বিক্রি করেই ধানের কম মূল্যের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চায়। তবে সরকার যে ধান মাড়াই মেশিন দেয় সেটা আমাদের দারুণ কাজে লাগে।’

কৃষকের দুর্দশা

নিয়ামতপুর উপজেলায় এ বছর ৩০ একর বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে রেজাউলকে গুণতে হয়েছে প্রতি ০ দশমিক ৪ একরে ১,৪০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা।

যদিও তিনি কৃষি ঋণ পাওয়ার যোগ্য, তিনি ঋণ নিতে যান না। তিনি জানিয়েছেন, ঋণ পেতে দালাল ধরতে হয়, হয়রানিও হয়।

খোকা প্রামাণিক নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ১ দশমিক ২ একর লিজ নেওয়া জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি বলেছেন, তার মতো ছোট কৃষককে ব্যাংক ঋণ দেয় না। তিনি একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করছেন বলে জানান।

খুলনার রূপশা উপজেলার নৈঘাটি গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, তাকে ২ দশমিক ৮ একর জমিতে সেচের জন্য সেচদাতার সঙ্গে ধানের ভাগ দেওয়ান জন্য চুক্তি করতে হয়েছে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, খুলনায় মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ধান কাটা শুরু হবে, ধান কাটার ১০ দিন আগ পর্যন্ত তার জমিতে সেচ দিতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘শ্রমিক পাচ্ছি না।’

‘দেখতে পাচ্ছি, এবারো আমি ধানে মার খাব। আমি আর কখনো নিজের খাওয়ার জন্য ছাড়া ধান করব না,’ উল্লেখ করে আলমগীর বলেন, ‘গত আমন মৌসুমে টাকা ধার করেছিলাম। ধানের দাম কম পাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে।’

রাজশাহীর গোদাগাড়িতে সাহানাপাড়ার অনিল এক্কা বলছিলেন, ‘চার হাজার টাকায় দুটা ভেড়া বিক্রি করে ০ দশমিক ৮ একর লিজ নেওয়া জমিতে বোরো ধান চাষ শুরু করি। আরও ১০ হাজার টাকার সার, কীটনাশক ও পানির জন্যে দরকার।’

অন্য সময়ে তিনি দিনমজুরের কাজ করে এই টাকা সহজেই আয় করতে পারতেন। কিন্তু, করোনাভাইরাসের কারণে তাকে বাড়িতে অবরুদ্ধ থাকতে হচ্ছে। কোথাও তার জন্য কোন কাজ নেই।

‘বেশিরভাগ টাকাই আমাকে ধার করে জোগাড় করতে হয়েছে। আমার হাতে এখন কোন টাকা নেই। আমি জানি না কিভাবে বাকি দিনগুলোতে সেচ দিব,’ বলছিলেন তিনি।

বিবিএসের তথ্য মতে, দেশের মোট ১ কোটি ৬৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৪ কৃষকের মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশই ক্ষুদ্রকৃষক। প্রান্তিককৃষক ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যেসব কৃষকের ০ দশমিক ৫১ একর থেকে ১ একর জমি আছে তারা প্রান্তিক। যাদের ১ দশমিক ০১ একর থেকে ২ দশমিক ৫ একর জমি আছে তারা ক্ষুদ্র, যাদের ২ দশমিক ৫১ একর থেকে ৫ একর জমি আছে তারা মাঝারি এবং যাদের ৫ একর ও তার চেয়ে বেশি জমি আছে তারা বড় কৃষক।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা যারা নিজেদের ১ দশমিক ৫ একরের জমিতে বা লিজ নেওয়া জমিতে ধান আবাদ করেন তারা সাধারণত তাদের চাষাবাদের খরচ যোগাতে বিভিন্ন শহরে দিনমজুরের কাজ করে থাকেন। কিন্তু, লকডাউনের সময়ে তাদের সে সুয়োগ বন্ধ।

শুষ্ক আবহাওয়ায় সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের দুর্দশা চরমে উঠেছে বলে আক্ষেপ করেন আরেক কৃষক আমিনুল হক।

আমিনুল রাজশাহীর তানোরে কলমা ইউনিয়নে বিএমডিএর ডিপটিউবওয়েলের সেচের পানির প্রিপেইড কার্ড কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন। প্রতিটি কার্ড ২,৫০০ টাকা। তিনি কমিশন পান। ঐ ডিপটিউবওয়েলের আওতায় ১৩৫ কৃষক তাদের ১২৯ দশমিক ৩৭ একর জমিতে সেচের পানি নেন।

আমিনুল এ বছর ঐ কৃষকদের মাঝে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় ১২৮টি প্রিপেইড কার্ড বিক্রি করেছেন। গত বছর এই জমিতে ঐ কৃষকরা ২ লাখ ৩৭ হাজার টাকায় ৯৫টি কার্ড ব্যবহার করেছিলেন।

আমিনুল বলছিলেন, ‘এ বছর প্রায় সবাইকেই ধার করে সেচের পানি কিনতে হয়েছে।’

বিএমডিএ ২০১৮-১৯ সালে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কৃষকদের কাছ থেকে সেচ খরচ বাবদ ২০০ কোটি টাকা আয় করেছিল।

বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী জিয়াউল হক জানিয়েছেন, তারা বছরে ৫ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিয়ে ১২ কোটি টাকা আদায় করে।

বিএমডিএ ও বিএডিসি ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে সেচের পানির ব্যবসা করে ৪২ দশমিক ৩৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিয়ে থাকেন।

তবে সরকার যে সেচের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সেখানে ব্যক্তিগত সেচ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এখনই কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।

‘এই কৃষকদের রক্ষা করতে হবে। তাদের বিনামূল্যে সেচ দিতে হবে। বিনা সুদে ঋণ দিতে হবে। তারা আমাদের খাদ্যের যোগান দিচ্ছেন। তারা খাদ্যের যোগান দিতে পারলেই আমরা বেঁচে থাকব,’ মন্তব্য বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়ের কৃষিঅর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাইদুর রহমানের।

Comments

The Daily Star  | English
Bank mergers in Bangladesh

Bank mergers: All dimensions must be considered

In general, five issues need to be borne in mind when it comes to bank mergers in Bangladesh.

9h ago