বাজেটে আবাসন খাত: করোনা পরিস্থিতিতে আলোর রেখা

জীবন নাকি জীবিকা? এই প্রশ্ন নিয়ে যখন সবাই দ্বিধান্বিত তখন আমরা বেশ নড়েচড়ে বসেছি অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার পর। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা অনেকের কাছে খুব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা মনে হলেও আমার কাছে খুব কঠিন মনে হচ্ছে না। আমার অবশ্য কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এমন মনে হচ্ছে।

জীবন নাকি জীবিকা? এই প্রশ্ন নিয়ে যখন সবাই দ্বিধান্বিত তখন আমরা বেশ নড়েচড়ে বসেছি অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার পর। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা অনেকের কাছে খুব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা মনে হলেও আমার কাছে খুব কঠিন মনে হচ্ছে না। আমার অবশ্য কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এমন মনে হচ্ছে।

গত এপ্রিলে আইএমএফ জোরালোভাবে জানিয়েছিল আগামী অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে (এজন্য করোনা বিলীন হওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতি দ্রুত সচল হওয়ার পূর্বশর্তও ছিল)। একজন রিয়েলটর হিসেবে আমার কাছে এই প্রবৃদ্ধির অংকগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা যে সেবা-শিল্পে কাজ করছি তার গতি প্রকৃতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে ওঠা-নামা করে।

গত পাঁচ বছরে যখন দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি টেকসই ছিল, তখন আবাসন খাত মন্দা কাটিয়ে বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। যদিও নানা সমস্যা সবসময়ই ছিল এবং দায়িত্বশীল মহলের অনেক বিমাতাসুলভ আচরণের মুখে পড়তে হয়েছে এই খাতকে। যদিও দেশের জিডিপিতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রাখছে আবাসন খাত। এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে ২৬০ টি (মতান্তরে ২১১ টি) সংযুক্ত খাত। আমি ছোট একটা উদাহরণ দেই- বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আবাসন ও নির্মাণ খাতের কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় ইস্পাত কারখানার উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমেছে। সিমেন্ট উৎপাদন নেমে এসেছে ১০ শতাংশে। এতেই বোঝা যায় আবাসন খাত অর্থনীতির কত বড় প্রভাবক!

চলমান করোনা মহামারিতে দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীক খাতগুলোর মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। এই খাতের সঙ্গে জড়িত ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা। এই খাতের সঙ্গে যেমন জড়িত নির্মাণ শ্রমিকদের ভাগ্য তেমন জড়িত কয়েক লাখ পেশাজীবীর ভবিষ্যত। বিশেষ করে বিক্রয় ও বিপণন পেশাজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, হিসাব নিরীক্ষকসহ অসংখ্য ‘হোয়াইট কলার’ পেশাজীবীরা অনেকটা অনিশ্চিত সময় পার করছেন। দীর্ঘ ২ মাসের লক ডাউন পরিস্থিতি কার্যত এই সেবাখাতকে অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। ছুটি শেষ হলেও এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি সচল হয়নি। সব মিলিয়ে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন বিক্রয় এবং পুরাতন কিস্তি আদায় বন্ধ ছিল প্রায় দুই মাস। পাশাপাশি প্রকল্প সাইটগুলোও বন্ধ ছিল লকডাউনের কারণে।

গত ৩১ মে অফিস খোলার পর আমরা ‘কর্মী এবং গ্রাহকদের সুরক্ষাই প্রথম অগ্রাধিকার’ নীতিতে এগোচ্ছি। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। নতুন করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের অফিস বিশেষ করে প্রকল্প সাইটগুলো ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে, তবু আমরা এটাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি আমাদের কর্মী এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। আমরা লকডাউনে যাওয়ার আগে নিশ্চিত করতে চেয়েছি ছুটির পর আমাদের কর্মীরা যেন ফিট থাকে। এক্ষেত্রে আমরা ৯৮ শতাংশই সফলতা পেয়েছি। কর্মীরা সুস্থ আছে, ফিট আছে। বর্তমানে আমরা স্বল্পমেয়াদি সমস্যার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকেই প্রাধান্য দিয়ে এগুচ্ছি।

এই সম্ভাবনার একটা আলো এবারের বাজেটে দেখতে পেয়েছি। বাজেটে আমাদের দীর্ঘদিনের একটা দাবির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপ্রদর্শিত টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করে সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় আবাসন খাত নিশ্চিতভাবেই একটা গতি পাবে। দেশের প্রচলিত আইনে যা–ই থাকুক না কেন, শর্তসাপেক্ষে এই অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগ করলে এনবিআর কিংবা দুদক কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। অর্থাৎ বর্গমিটার প্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে এই খাতে বিনিয়োগকৃত অর্থ সাদা করার সুযোগ পাচ্ছেন অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকেরা। বিদেশে অর্থ পাচার থেকে এক শ্রেণীর মানুষকে ফেরাতে এর চেয়ে ভালো কোনো উদ্যোগ আর হতে পারতো না । তারপরও জানি, কেউ কেউ এটার বিরোধীতা করবেন। যারা এতো বছর বিরোধীতা করেছেন তারা পরোক্ষভাবে অপ্রদর্শিত টাকা বিদেশে বিনিয়েগের নামে পাচারে বরং এক ধরনের সহযোগিতাই করেছেন। এবার যে তারা চুপ থাকবেন সে আশা অবশ্য আমি করছি না। বরং আমার কাছে অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবটা ভালো লেগেছে যে, টাকা পাচার প্রমাণিত হলেই ৫০ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। আশাকরি এই উদ্যোগ বিশাল খাতটিতে মানুষকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

পাশাপাশি বিদেশে বিনিয়োগকারীদের জন্যও একটা আই ওপেনার হলো এবারের করোনা সংকট। প্রমাণিত হয়েছে বিদেশে বিনিয়োগ করেও এরকম বৈশ্বিক দুর্যোগে কেউ নিরাপদ নন। অনেকে দেশ থেকে বিদেশে যেতেও পারেননি। কাজেই দেশের আবাসন খাত সংশ্লিষ্ট নানা জায়গায় বিনিয়োগ করে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বানানোর মাঝেই মূল স্বার্থকতা। আশা করি বিনিয়োগকারীরা এবার এই সুযোগটা কাজে লাগাবেন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার ইউনিট ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু, চড়া নিবন্ধন খরচের জন্য অধিকাংশ ক্রেতা ফ্ল্যাট বুঝে নিয়েও বছরের পর বছর ধরে নিবন্ধন করছেন না। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত ও চাঙ্গা করার যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাতে ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি যদি ৫/৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, তবে অন্তত ৮০ শতাংশ অনিবন্ধিত ফ্ল্যাট নিবন্ধনের আওতায় চলে আসব। এতে সরকার রাজস্ব পাবে পাশাপাশি এই খাত থেকে ভ্যাট আদায়ও বাড়বে।

একইসঙ্গে আমাদের দেশে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির হস্তান্তর ফি একটি নতুন গাড়ির নিবন্ধন ফি থেকে অনেক কম। অথচ সেকেন্ডারি ফ্ল্যাট নিবন্ধনে সমপরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। ব্যবহৃত ফ্ল্যাট বিক্রির পর তার পুনরায় নিবন্ধনে ৩ শতাংশের বেশি নিবন্ধন ফি হওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখলে আমাদের রিয়েল এস্টেটের একটা সেকেন্ডারি বাজার তৈরি হবে। যা মূলত প্রাইমারি বাজারকে ভ্যালু এড করবে।

প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করতে চাই, সরকারি কর্মচারীদের আবাসন নিশ্চিতে মাত্র ৫ শতাংশ হারে গৃহঋণ দেওয়া হচ্ছে, এটা যদি সর্বোচ্চ ১২০০ বর্গফুট মাপের যে কোনো ফ্ল্যাট ক্রেতার জন্যও দেওয়া হয় তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। রিয়েল এস্টেটকে মানুষের জন্য এফোর্ডেবল করা, বাজারকে টেকসই করা, নতুন ক্রেতা তৈরি করার জন্য এই উদ্যোগ ভীষণ দরকার ।

আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাজেটে সংযুক্ত খাতগুলোর উপর বিশেষ করে রড-সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানীর উপর বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন এলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব আবাসন খাতের উপর পড়ে। এবারের বাজেটটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমাদের নির্মাণ খাতের প্রধান কাঁচামাল রড তৈরির কিছু রাসায়নিক যেমন- ফ্যারো ম্যাঙ্গানেজ, ফ্যারো সিলিকো ম্যাঙ্গানেজ এবং ফ্যারো সিলিকন এর ওপর রেগুলেটরি ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এমনিতে আন্তর্জাতিক বাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ছে এই অবস্থায় রাসায়নিকের আরডি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি না করে বরং ৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। রড শিল্পের কৌশলগত পার্টনার হিসেবে আমরা তাই মনে করি। নয়তো এই মূল্যবৃদ্ধি আবাসনের মূল্যকে প্রভাবিত করবে।

সবমিলিয়ে এই বাজেটটি যথেষ্ট আশাবাদী হওয়ার মতো বাজেট মনে হয়েছে। এজন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। এখন আমাদের সংগঠন রিহ্যাব থেকে বহুদিন ধরে যেসব দাবি জানানো হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের জন্য তহবিল গঠন এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনাসহ সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন করা। তা এই শিল্পকে সংকট থেকে উত্তোরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

করোনা পরিস্থিতি আমাদের সামনে যে অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তা কারো একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে দরকার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। নীতি নির্ধারণী মহল এখানে টর্চ হাতে আলো ফেলার সেই কাজটি করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

তানভীর শাহরিয়ার রিমন, সিইও, র‍্যাংকস এফসি প্রোপার্টিস লিমিটেড

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Dozens injured in midnight mayhem at JU

Police fire tear gas, pellets at quota reform protesters after BCL attack on sit-in; journalists, teacher among ‘critically injured’

4h ago