‘চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের বেদনা-যন্ত্রণা, ফুসফুস বা গলাব্যথার যন্ত্রণার চেয়ে বহুগুণ বেশি’

হ্যালো হ্যালো, অস্পষ্ট, কিন্তু পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ছবি: শহিদুল আলম/দৃক/মেজরিটি ওয়োর্ল্ডের সৌজন্যে

হ্যালো হ্যালো, অস্পষ্ট, কিন্তু পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর।

‘তোমরা কেমন আছো?’

আমরা ভালো আছি। আপনার কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। গলার ইনফেকশন তো ঠিক হয়নি।

‘হ্যাঁ, গলায় ব্যথা আছে। কথা বলতে একটু সমস্যা হয়।’

আপনি খুব ভালো আছেন বলে মনে হচ্ছে না।

‘না, ভালো আছি। একটু দুর্বল। হাসপাতালে আরও কয়েকদিন থাকতে হবে।’

ঠিক আছে, থাকেন। সুস্থ হয়ে উঠেন, পরে কথা বলবো। এখন কথা বললে গলায় আরও সমস্যা হবে।

‘না, না বেশি কথা বলবো না। জরুরি দরকারে ফোন করেছি। তার আগে শুধু বলি, আমরা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছি। সেটা নিয়ে এখন বিস্তারিত বলবো না, পরে কখনো হয়তো বলবো। যা হয়েছে, তার পরবর্তী কার্যক্রম গতিশীল হোক, এটাই এখনকার প্রত্যাশা। দুটি বিষয়ে এখন আমার কথা বলার আছে, যা বলা খুব জরুরি।’

‘একটি হলো— দেশের মানুষের প্রতি আমর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। এই কাজটি আমাকে করতেই হবে। তারা আমার প্রতি আমাদের প্রতি যে ভালোবাসা দেখালেন, যে দোয়া-প্রার্থনা করলেন, তার তো কোনো তুলনা হয় না। এই ঋণ আমি কোনোদিন কোনোকিছু দিয়ে শোধ করতে পারবো না। এই কথাটা আমাকে বলতেই হবে, লিখতেই হবে।’

‘দ্বিতীয়ত— এবারের বাজেট নিয়ে আমার অত্যন্ত জরুরি কথা আছে। আমি পুরো বাজেটটি পড়ে ফেলেছি। এই করোনা মহামারিকালে যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, সেই বাজেটে সাধারণ জনমানুষের কথা একেবারেই ভাবা হয়নি, সেই বিষয়ে আমি কথা বলব, লিখবো। এটা আমাকে লিখতেই হবে, বলতেই হবে। আমি লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি। লেখা শুরু করবো।’

প্রায় একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন। গলার ইনফেকশন ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে কথাগুলো বলতে যে কষ্ট হচ্ছিল, তা ফোনের এপাশ থেকে বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল না। ফোন তিনি করেছেন নিজের ইচ্ছায়, রাখবেনও নিজের ইচ্ছায়।

বলে লাভ হবে না জেনেও বললাম, লিখবেন, বলবেন সবই ঠিক আছে। কিন্তু, আগে তো আপনাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে।

‘হ্যাঁ, আমি তো এখন সুস্থ। শুধু গলার ইনফেকশনটা এখনো আছে, ব্যথা আছে, যে কারণে কথা বলতে কষ্ট হয়। কিন্তু, সুস্থ হয়ে উঠছি’— তাৎক্ষণিক জবাব এলো।

আপনাকে তো আরও কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। আপনি কী চিকিৎসকদের কথা শুনে ঠিকমতো ওষুধ খাচ্ছেন?

‘হ্যাঁ, সবকিছু ঠিকঠাক মতো করছি। মানুষের দোয়া আর চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই তো দ্রুত ভালো হয়ে উঠছি।’

আপনি সবার নিষেধ অমান্য করে মোহাম্মদ নাসিমের জানাজায় না গেলে, এতদিন বাসায় চলে যেতে পারতেন।

‘না না, চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। সবই তো করতে হবে।’

একটু জোর দিয়েই বললাম, এখন আর আপনার বেশি কথা বলা ঠিক হবে না। আপনার গলার আওয়াজ শুনে ইনফেকশনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছে। সব কথা ঠিক মতো বুঝতেও পারছি না। আপনার এখন ফোন করাই ঠিক হয়নি।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ‘না না কিছু হবে না। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। বেশি কথা বলব না। সবকিছুই তো করতে হবে। সুস্থ হয়েও উঠতে হবে, কাজও করতে হবে। মানুষের জন্য কতকিছু করার বাকি। মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে হবে।’

‘আমি তো পত্রিকা পড়ছি, টিভি দেখছি, সব খোঁজ-খবর রাখছি। মানুষের হাহাকার দেখছি। তাদের বেদনা-যন্ত্রণা দেখছি। মানুষ একটি পরীক্ষার জন্য সারারাত হাসপাতালের সামনে শুয়ে-বসে থাকছে। আর আমরা পরীক্ষা করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেও তা দিয়ে মানুষের উপকার করতে পারছি না। এই যন্ত্রণা তো গলাব্যথার যন্ত্রণার চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফুসফুসের ইনফেকশনের চেয়ে এই মানসিক ইনফেকশন তো আরও বেশি বেদনার। ফুসফুস বা গলার ইনফেকশন তো সেরে যাবে। এই মানসিক ইনফেকশন সারাবো কী দিয়ে?’

‘এই সংকটকালে মানুষের জন্য আরও কতকিছু করার ছিল আমাদের। এগুলো তো করতে হবে। অসুস্থ বলে পুরোপুরি থেমে থাকলে তো হবে না। আগে যে কাজগুলো নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম, এখন সুস্থ হয়ে উঠলেই সেগুলো নিয়ে আবার বসতে হবে। কাজগুলো শুরু করতে হবে। বেশিদিন আর হাসপাতালে থাকলে হবে না।’

হ্যাঁ, বসবো। আপনার সব কথা শুনবো। আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক কথা বোঝাও যাচ্ছে না। এখন আর কথা না বলি। আপনি ফোন রেখে বিশ্রাম নেন। আপনি সুস্থ হয়ে উঠলে সামনা-সামনি বসে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো।

‘হ্যাঁ, ঠিক আছে। তোমরা সবাই ভালো আছো তো?’

আবারও একটু জোর দিয়ে বললাম, আমরা ভালো আছি। কিন্তু, আপনি এখন ফোন রেখে বিশ্রাম নিন। ঠিকমতো ওষুধ খান, যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। কথা বললে আপনার গলার ইনফেকশন আরও বেড়ে যাবে। এতে আরও বেশিদিন আপনাকে হাসপাতালে থাকতে হবে।

‘আচ্ছা ঠিক আছে। তোমরা সবাই ভালো থেকো। মানুষের জন্যে আমাদের অনেক কিছু করতে হবে।’— ওপাশ থেকে ফোন রাখলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে কথা একটি নিয়মিত বিষয়। গত চার-পাঁচ মাসে এমন কোনো দিন হয়তো নেই, যেদিন তার সঙ্গে কথা হয়নি। হাসপাতালের অসুস্থতার দিনগুলোতেও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ফোন করেছেন। বিরতি গেছে মাঝের কিছুদিন, যখন তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। আজ বেলা পৌনে ১২টার দিকে মোবাইলের স্ক্রিনে যখন ভেসে উঠলো— ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, তখন কেমন যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি তৈরি হলো।

১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের যোদ্ধা পুরোটা জীবন রণাঙ্গনেই কাটালেন। এদেশে যে ‘ওষুধ নীতি’ হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে দেশীয় ওষুধ শিল্প, তার নেপথ্যের মূল কারিগর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গরিব মানুষ নামমাত্র মূল্যে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবেন, এই লক্ষ্যেই বিরতিহীনভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তার জীবন মানুষের জন্যেই, হাসপাতালের দিনগুলোতেও সেই ভাবনা থেকে সামান্য পরিমাণ সরে যাননি। নিজের জীবনের সংকটাপন্ন সময়েও ভাবছেন সাধারণ মানুষের কথা।

আরও পড়ুন:

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী করোনামুক্ত

পিসিআর পরীক্ষাতেও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর করোনা নেগেটিভ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর করোনা পজিটিভ

বিএসএমএমইউর পরীক্ষাতেও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর করোনা পজিটিভ

আমাদেরই সবার আগে এই কিট বিশ্ববাসীর সামনে আনার সুযোগ ছিল: ড. বিজন

২৫ দিনে ৩০১ শয্যার করোনা হাসপাতালের জন্ম অথবা অপমৃত্যু!

মুক্তিযুদ্ধ, গণস্বাস্থ্য, ডা. জাফরুল্লাহ ও মাছ চোর

Comments

The Daily Star  | English

Airfare to Malaysia surges fivefold

Ticket prices for Dhaka-Kuala Lumpur flights have reached exorbitant levels with Bangladeshi migrant workers scrambling to reach Malaysia by May 31.

15h ago