রোগীদের স্বার্থে সীমিত পরিসরে হলেও ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসাসেবা চালু করুন

দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসকই বিগত প্রায় তিন মাস যাবৎ ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ রেখেছেন। যে কারণে অনেক রোগীই চিকিৎসার জন্য ‘হাতুড়েদের’ শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারাও যাচ্ছেন।
১০ মাস বয়সী শিশুকে কোলে আঁকড়ে ধরে চট্টগ্রামে একটি সড়কের বিভাজকের ওপর বসে আছেন মরিয়ম আক্তার নামে এক অসহায় মা। কোভিড-১৯ সার্টিফিকেট না থাকায় তার শিশু রাফাকে চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করানো যায়নি। এর আগে লিভারের রোগে তাকে দুই সন্তান হারাতে হয়েছিল। রাফাকেও হারানোর ভয় জেঁকে বসেছিল তার মধ্যে। ১৬ জুন ২০২০। ছবি: রাজীব রায়হান

দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসকই বিগত প্রায় তিন মাস যাবৎ ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ রেখেছেন। যে কারণে অনেক রোগীই চিকিৎসার জন্য ‘হাতুড়েদের’ শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারাও যাচ্ছেন।

চট্টগ্রামে রোগীরা অভিযোগ করছেন, শুরুতে অনেক চিকিৎসক টেলিফোনে চিকিৎসাসেবা দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের অনেককেই ফোনে পাওয়া যায় না। কাজেই অনেক রোগীই এখন ফার্মেসির বিক্রেতাদের কাছে রোগের উপসর্গ বলে ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র নিয়ে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে করে রোগীর কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি।

অবশ্য করোনা মহামারির এই সময়ে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী না দেখার সিদ্ধান্তকে একেবারে অযৌক্তিক বলারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক চিকিৎসক (এক হাজার আট শর বেশি) কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন; তাদের মধ্যে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬৪ জন চিকিৎসক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

এক্ষেত্রে চিকিৎসক নেতাদের বক্তব্য হলো, শুধু হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে যতসংখ্যক চিকিৎসক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন, চিকিৎসকরা যদি সবাই ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেন, সেই সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যাবে। তা ছাড়া, একজন উপসর্গবিহীন করোনা আক্রান্ত চিকিৎসক যদি ১০০ জন রোগীকে সেবা দেন, তাদের সবাই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই তাদের বক্তব্য হলো, নিজেদের এবং রোগীদের স্বার্থেই এই সময়ে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা থেকে বিরত থাকা উচিত। এ ছাড়া, সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলো তো চালু আছেই।

কিন্তু, এক্ষেত্রে রোগীদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা খুবই করুণ। চট্টগ্রামে অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে রোগীদের অভিযোগ হচ্ছে, চিকিৎসাসেবা দেওয়া তো পরের কথা, এইসব হাসপাতাল রোগীদেরকে ভর্তি পর্যন্ত করতে চায় না। এমতাবস্থায় রোগীদের সরকারি হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। কিন্তু, চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর সাধারণ রোগীরা একেবারে সংকটাপন্ন অবস্থা না হলে সেখানে যেতে চাইছেন না।

এক হাজার ৩১৩ শয্যার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রায় প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকত, যেখানে রোগীর চাপে বেশিরভাগ ওয়ার্ডের মেঝেতে, এমনকি বারান্দায় পর্যন্ত রোগীর শয্যা পাতা হত, এখন সেই হাসপাতালের বেশিরভাগ ওয়ার্ড প্রায় ফাঁকা। হাসপাতালে না গিয়ে অনেক রোগীই এখন সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির বিক্রেতাদের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা পরবর্তীতে রোগীদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই রোগীদের স্বার্থে চিকিৎসকদের সীমিত পরিসরে হলেও ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসাসেবা চালু করা উচিত। তাহলে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার কী হবে? চিকিৎসকেরা ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেই এই সেবা চালু করবেন। হাসপাতালে যেমন সুরক্ষাসামগ্রী পরে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, ব্যক্তিগত চেম্বারেও তারা তাই করবেন। তা ছাড়া, চেম্বারে আসা প্রত্যেক রোগী ও তার পরিচর্যাকারীর জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট ফরমে ঘোষণা দিতে হবে যে তার মধ্যে বিগত ১৪ দিন যাবত ফ্লু এর কোনো লক্ষণ নেই এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি কোনো ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাননি। চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে নিরাপদ দূরত্ব (কমপক্ষে ছয় ফুট) বজায় রেখে রোগীর সমস্যার কথা শুনবেন। শারীরিক পরীক্ষার প্রয়োজন হলে রোগীকে এমনভাবে একপাশ ফিরে শুয়ে পড়তে বলবেন যেন রোগী চিকিৎসকের মুখোমুখি না হয়ে বিপরীতমুখী থাকেন। ফলে রোগীর মুখ থেকে কোনো জলীয় কণা চিকিৎসকের নাকে প্রবেশ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকবে। চেম্বারে অপেক্ষমাণ রুমে প্রত্যেক রোগীই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বসবেন।

সেজন্য এক্ষেত্রে রোগীদের সংখ্যা সীমিত রাখতে হবে। সেটা চিকিৎসক ও রোগী— উভয়ের স্বার্থেই। আগে যে চিকিৎসক চেম্বারে দিনে ২০ জন রোগী দেখতেন, এখন তিনি ১০ জন রোগীও যদি দেখেন, তাতেও অনেক রোগী উপকৃত হবেন। এর বাইরে যেসব চিকিৎসক বয়সে প্রবীণ এবং যারা জটিল রোগে ভুগছেন, ফলে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন, তারা টেলিমেডিসিনসেবার মাধ্যমে রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে গেছে। চিকিৎসক এবং রোগী মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে পরস্পর পরস্পরকে দেখতে এবং কথা শুনতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এই সেবার জন্য চিকিৎসকেরা একটা যৌক্তিক ফি নিতে পারেন। যা বিকাশ বা অন্য কোনো মাধ্যমে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দিবেন।

রোগীদের সেবা করার শপথ নিয়েই একজন চিকিৎসক পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। সেজন্য চিকিৎসা পেশা অন্য দশটা পেশার চেয়ে আলাদা। হিপোক্রেটিক ওথে চিকিৎসকরা বলছেন, ‘রোগীদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে আমি আমার সামর্থ্য ও বিচার ক্ষমতার সর্বশক্তি প্রয়োগ করব।’ (তথ্যসূত্র: চিকিৎসা শাস্ত্রের কাহিনি, মোহাম্মদ মুর্তজা (অনু.), ১৯৬৮, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ৩৮-৩৯; মূল: দ্য স্টোরি অব মেডিসিন বাই কেনেথ ওয়াকার)

চিকিৎসকেরা পেশাগত জীবনে প্রবেশের সময় কিছু নীতিমালা পালনের ঘোষণা দিয়ে থাকেন। এই নীতিমালা ১৯৪৯ সালের ১২ অক্টোবর লন্ডনে বিশ্ব চিকিৎসা সম্মেলনের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ঘোষণার আলোকে প্রণীত। এতে বলা হয়েছে, ‘আমি পূতভাবে প্রতিজ্ঞা করছি যে মানবতার সেবায় আমি আমার জীবন উৎসর্গ করবো।... রোগীর মৃত্যু ঠেকানোই হবে আমার প্রথম বিবেচ্য বিষয়।’ (তথ্যসূত্র: মেডিকেল আইন বিজ্ঞান, ডা. কে সি গাঙ্গুলী ও বাসুদেব গাঙ্গুলী, ১৯৯২, আলীগড় লাইব্রেরি, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ৩৫)।

কাজেই রোগীদের এই কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মধ্যমেই চিকিৎসকরা তাদের শপথের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন। যারা হাসপাতালে সেবা দিচ্ছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সেবা দিতে গিয়ে অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, অনেক চিকিৎসক মারা গেছেন। তাদের ত্যাগ ও অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। চিকিৎসা পেশা এজন্যই মহান পেশা, যেখানে সেবাদানকারী নিজে আক্রান্ত হতে পারেন জেনেও সেবাদানে পিছপা হন না।

অরুণ বিকাশ দে, নিজস্ব সংবাদদাতা (চট্টগ্রাম ব্যুরো), দ্য ডেইলি স্টার

Comments

The Daily Star  | English

Personal data up for sale online!

Some government employees are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Centre has found.

4h ago