চীনের হামলায় নিহত এসএফএফ সৈনিক নেইমা, নীরব ভারত

সম্প্রতি প্যাংগং সো সীমান্ত এলাকায় ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির পরে টহল দেওয়ার সময় হামলায় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের (এসএফএফ) সদস্য তেনজিন নেইমা নিহত হয়েছেন।
Tibetan_SFF_Soldier_Killed_.jpg
ছবি: এএফপি

সম্প্রতি প্যাংগং সো সীমান্ত এলাকায় ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির পরে টহল দেওয়ার সময় হামলায় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের (এসএফএফ) সদস্য তেনজিন নেইমা নিহত হয়েছেন।

চীনের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এ নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করেছে। এসএফএফ ভারতের সেনাবাহিনীর একটি অংশ। মূলত তিব্বত থেকে চলে এসে ভারতীয় নাগরিকত্ব যারা পেয়েছিল তাদের নিয়ে এই সৈন্যদল গঠিত।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে ১৯৬৬ সালে তেনজিন নেইমার পরিবার তিব্বত থেকে ভারতে পালিয়ে আসে। নেইমা তখন ভারতের পশ্চিম হিমালয় লাদাখ অঞ্চলে বেড়ে উঠছে। সে সময় তার প্রচণ্ড শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দেখে দিক-নির্দেশনার জন্য মা-বাবা তাকে স্থানীয় এক মুণীর কাছে যান।

তিনি বলেছিলেন, ‘নেইমা একজন সাহসীআত্মা হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’ মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালে তিনি লাদাখের রাজধানী লেহের একটি সেনা ঘাঁটিতে গিয়ে ভারতীয় গোপন আধাসামরিক ইউনিটে যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান।

তার বয়স এখন ৫১ বছর। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট হঠাৎ নেইমা বাড়িতে ফোন করেন। তখন তিনি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) সামনে টহলের দায়িত্ব পালন করছেন। তার মা পলজম বলেন, ‘শেষবারের মতো ফোনে কথা বলা শেষ করার পরই তার সেই মুণীর বাণী মনে পড়ে যায়।’

তানজিন নেইমার বড় ভাইয়ের বছর এখন ৫৪ বছর। তেনজিন নিয়াও বলেন, ‘ফোনে নেইমার কণ্ঠে তখন “উত্তেজনা” শোনা যাচ্ছিল।’

নেইমা ও তার বাহিনী তখন এলএসিতে টহলরত। যেখানে ভারতীয় সেনারা তাদের তিন হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার বির্তকিত সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চীনা সেনাদের সঙ্গে এক তিক্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থানের মধ্যে ছিল।

গত জুনে লাদাখ সীমান্তে এক মারাত্মক সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীনের পক্ষ থেকে কোনো হতাহতের সংখ্যা জানানো হয়নি। উভয়পক্ষই উত্তেজনা কমাতে কয়েক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় বসে। এরপরেও সীমান্তে সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন অব্যাহত থাকে।

নিয়াও বলেন, তার ভাই তখন ফোনে এলএসির জটিল পরিস্থিতির কথা জানান। ফোনে নেইমা বলেন, ‘পরিস্থিতি বেশ জটিল। যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।’

নেইমা সে সময় ফোনে তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তার সবচেয়ে কম বয়সী সন্তানের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তবে কথা হয়নি।

প্যাংগং সো হ্রদের দক্ষিণ তীরে চুসলে টহল দেওয়ার সময় একটি লাইন মাইন বিস্ফোরিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে মারা যান তানজিন নেইমা। এতে এসএফএফের আরেক সৈনিক তেনজিন লোডেন আহত হন। সেখানে অবৈধভাবে বিতর্কিত সীমান্ত ‘অতিক্রম’ ও টহল দেওয়ার সময় ‘উসকানিমূলক’ গুলি চালানোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে বিবৃতি দেয় ভারত ও চীন।

নিয়াও বলেন, ‘আমরা পরে জেনেছি যে এসএফএফ সেখানকার মালভূমিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আমাদেরকে ফোন করার কিছুক্ষণ পরেই নেইমা টহল দিতে বেরিয়ে পড়েন।’

বিদ্রোহীদের দমন ও অভিযান পরিচালনার প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে এসএফএফ গঠন করা হয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে সেখানে তিব্বতি সেনাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। নয়াদিল্লি বরাবরই এসএফএফ ও তিব্বতি সেনাদের অস্তিত্ব নিয়ে চুপ থেকেছে। নেইমার মৃত্যু নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সংঘর্ষের পর ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ সংক্রান্ত কিছু ছিল না।

তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অন্যতম সহযোগী, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব নেইমার শেষকৃত্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাকে পূর্ণ সামরিক সম্মান প্রদান করে তার কফিনে ফুল দিয়েছিলেন।

নিয়াও বলেন, বাবা-মায়ের কাছে তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের ‘নিপীড়ন’ এর কথা শুনেছেন। অনেকেই সে সময় ভারতে থাকার জন্য বিপজ্জনক, প্রতিকূল অঞ্চল পেরিয়েছেন। লাদাখের চাংথাং পৌঁছানোর জন্য দুই রাত হেঁটে উঁচু, পাথুরে পাহাড়ি পথ পার হয়েছেন।

তারা দক্ষিণ-পূর্ব লাদাখের চ্যাংথ্যাংয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। সেখানে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করেছিলেন তারা। পরে তিব্বতি শরণার্থীদের জন্য নির্মিত ৪৫টির বেশি জনবসতির মধ্যে একটি চোগলামসারে আসেন।

শরণার্থী হিসেবে তিব্বতিরা সরকারি চাকরির জন্য যোগ্য নন। ভারতীয় নাগরিকত্ব বেছে না নিলে তাদের ভারতে জমি বা সম্পত্তির মালিকানাও দেওয়া হয় না। ২০১১ সালে দেড় লাখ তিব্বতি জনগোষ্ঠী ২০১৮ সালে এসে প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়।

দারিদ্র্যতা কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতেন নেইমা। তাই ১৮ বছর বয়সেই তিনি এসএফএফে যোগ দেন। তার বড় ভাই নিয়াও বলেন, ‘নেইমা জানতো যে, পরিবার তাকে বেশি দিন পড়াশোনা করাতে পারবে না। তাই সে আশা করেছিল যে, এসএফএফ-এর একটি চাকরি তাকে একটু ভালো জীবনযাপন করতে সহায়তা করবে।’

এসএফএফ-এ ৩০ বছরের বেশি সময় কাটিয়েছেন নেইমা। ১৯৯৯ সালে কারগিলের যুদ্ধে ভারতের পক্ষে কাজ করেন তিনি। নিয়াও বলেন, ‘এসএফএফকে কখনো আমাদের আসল শত্রু চীনের বিরুদ্ধে পোস্ট করা হয়নি। ভারত সরকার সচেতনভাবেই ভারত-চীন সীমান্তে তাদের পোস্ট করেনি।’

জুলাই মাসে নেইমা যখন শেষবারের মতো বাসায় যান, তখন ভারত সরকার প্রথমবারের মতো এসএফএফকে সীমান্তের পাশের অঞ্চলগুলোতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে এসএফএফ-এর দুটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে নিয়াওকে নেইমা বলেছিলেন, ‘নিয়াও, এটা আগের মতো না। এটা কারগিল বা বাংলাদেশ না। অবশেষে আমরা আমাদের শত্রুর মোকাবিলা করতে যাচ্ছি।’

নিয়াও বলেছিলেন, ‘প্রতিটি তিব্বতি চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়। কারণ সে লড়াই কেবল ভারতের পক্ষে না, আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া নিজস্ব ভূমির জন্য। এটি আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া পরিচয়ের জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ৫১ বছর বয়সী নেইমা তেমন ফিট ছিলেন না। তবুও তিনি এই অভিযানে অংশ নিতে আগ্রহী ছিলেন। নেইমা বলেন, এই লড়াই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তিনি আর জীবিত নাও ফিরতে পারেন।’

নিয়াওয়ের জন্য তার ভাইয়ের মৃত্যু শোকের হলেও বহু বছর ধরে এসএফএফ এবং তিব্বত সম্প্রদায়ের অবদান বিশ্বের অজানা ছিল। নিয়াও বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পরই বিশ্বের কাছে এসএফএফের অবদান সামনে এসেছে। জীবন দিয়ে নেইমা এই পরিবর্তন এনেছে।’

Comments

The Daily Star  | English
IMF loan conditions

3rd Loan Tranche: IMF team to focus on four key areas

During its visit to Dhaka, the International Monetary Fund’s review mission will focus on Bangladesh’s foreign exchange reserves, inflation rate, banking sector, and revenue reforms.

8h ago