নারীর প্রতি সহিংসতায় দায়ী পদ্ধতিগত ত্রুটি: এইচআরডব্লিউ

বাংলাদেশে সহিংসতার শিকার নারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাব ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এমনটাই।

বাংলাদেশে সহিংসতার শিকার নারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাব ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এমনটাই।

সহিংসতার পর বেঁচে যাওয়া নারী ও শিশুদের সাক্ষাৎকার এবং জরিপের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাটি এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

নারীর নিরাপত্তায় কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার অভাবে ভুক্তভোগীরা অনিরাপদ থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটির একটি অনুলিপি পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পরে শাটডাউন চলাকালীন দেশে সহিংসতা বেড়েছে। জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের এক-চতুর্থাংশ প্রথমবারের মতো সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

‘আই স্লিপ অন মাই ওন ডেথবেড: ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট ওমেন অ্যান্ড গার্লস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের ৬৫ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে ৫০টি সাক্ষাৎকার রয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে সরকারের প্রতিবন্ধকতার জায়গাগুলো এতে তুলে ধরা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ’র দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির সময় নারী ও মেয়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ বাংলাদেশ সরকারকে কাঠামোগত সংস্কারের জরুরি বার্তা দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের উচিত দেশজুড়ে সহজে সুবিধা নেওয়া যায় এমন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা, আইনি সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার খবর জানানো ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করা।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে অন্তত ২৩৫ জন নারীকে তাদের স্বামী বা তার পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছে।

নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে মাল্টি-সেক্টরাল প্রোগ্রামের তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ও শিশুদের জন্য সরকারের নয়টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের একটির মাধ্যমে মামলা দায়েরকারী ১১ হাজার জনের মধ্যে মাত্র ১৬০ জন তাদের প্রতি সহিংসতার বিচার পেয়েছেন।

জাস্টিস অডিট অনুসারে, ২০১৬ সালে বিচারাধীন এক লাখ ৭০ হাজার নারী ও শিশু মামলার মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন আদালত। যার মধ্যে অভিযুক্তদের মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে নারী ও শিশুরা প্রায়শই এই আইনের অধীনে যথাযথ আইনি প্রতিকারের পান না এবং নির্যাতনকারীদের খুব কমই শাস্তি দেওয়া হয়।

জমে থাকা ৩৭ লাখ মামলা এই সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে মামলার শুনানি চলতে থাকে বছরের পর বছর ধরে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য সরকার পরিচালিত আনুমানিক ২১টি এবং এনজিও পরিচালিত ১৫টি আশ্রয় কেন্দ্র যথেষ্ট নয়।

সম্মতি, যৌনতা ও সম্পর্কের বিষয়ে এবং নারী ও শিশুদের অধিকার সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে স্কুলে আরও বেশি প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডসহ শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া নারীদের জন্য সহজ এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিটি জেলায় স্থাপনসহ সারা দেশে তাদের সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদালতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য উপস্থাপনে পুলিশ এবং পাবলিক প্রসিকিউটরদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয় প্রতিবেদনের সুপারিশে।

এতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সব মামলার জন্য একটি কেন্দ্রীভূত অনলাইন ফাইলিং সিস্টেম গঠনের এবং বিনা খরচে প্রাসঙ্গিক মামলার তথ্য ও প্রতিবেদন সবপক্ষ যেন পায় তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে অ্যাসিড সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের সাফল্যের প্রশংসা করা হয়েছে। ২০০২ সালে অ্যাসিড হামলার অভিযোগ করা হয়েছিল ৫০০টি। নাটকীয়ভাবে যা কমে ২০২০ সালে মাত্র ২১টিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মী নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার মামলায় ব্যর্থতার পেছনে পাবলিক প্রসিকিউটরদের অবহেলা দেখতে পান। রাজনৈতিক-ভিত্তিতে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ হওয়ায় তাদের জবাবদিহিতা খুবই কম।

তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা দেখা হয় না এবং প্রায়শই ফৌজদারি আইনে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে বা প্রয়োজনে আদালতে সাক্ষীকে উপস্থিত করতে তারা ব্যর্থ হন।

সহিংসতার পর বেঁচে যাওয়া নারী ও শিশু এবং মানবাধিকার কর্মীরা জানান, পাবলিক প্রসিকিউটররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষের কাছ থেকে ঘুষ চান। যদি আসামি বেশি টাকা দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে প্রসিকিউটররা আসামির কম সাজা প্রার্থনা করেন কিংবা সব প্রমাণ উপস্থাপন না করে মামলাটি ইচ্ছে করে হেরে যান।

বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী বা সাক্ষী নিরাপত্তা আইন নেই। নারী অধিকার আইনজীবীরা বলছেন, এটি কার্যকরভাবে মামলা তদন্ত করতে মারাত্মক বাধা হিসেবে কাজ করে।

Comments

The Daily Star  | English
Aerial view of geneva camp.

Mohammadpur Geneva Camp: Narcos clashing over new heroin spot

Mohammadpur Geneva Camp, where narcotics trade is rampant, has been witnessing clashes every day since the day after Eid-ul-Fitr.

12h ago