শীর্ষ খবর

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দখলদারদের ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব আইনপ্রণেতার

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল চট্টগ্রামের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্যের বেদখল হওয়া বনভূমি অবৈধ দখলদারদের ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য জাফর আলম।
কক্সবাজারের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সবুজের মাঝে টিনের ছাদযুক্ত মাটির ঘর। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিবেশ ও বন সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য জাফর আলম সম্প্রতি প্রস্তাব করেছেন, এই রিজার্ভ অরণ্যের ছয়শ একর জায়গা খাস জমিতে পরিণত করার। যাতে স্থানীয়দের কাছে ইজারা দেওয়া যায়। ছবিটি সম্প্রতি তোলা হয়েছে। ছবি: মোস্তফা ইউসুফ

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল চট্টগ্রামের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্যের বেদখল হওয়া বনভূমি অবৈধ দখলদারদের ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য জাফর আলম।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজার-০১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের এ সংসদ সদস্য প্রায় ছয়শ একর বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরে তা বনভূমির মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের নামে ইজারা দিতে ডিও লেটার দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে।

যে বনভূমিটি ইজারার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন।

ডিও লেটারে তিনি চকরিয়া উপজেলার চুনতি অভয়ারণ্যের হারবাং ও রিজার্ভ হারবাং এলাকার বসতিস্থাপনকারীদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, কক্সবাজার জেলার দ্বীপ এলাকা মহেশখালি ও কুতুবদিয়া থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা এখানে বসবাস করছে।

তিনি আরও লিখেছেন, এখানে বসবাস করা লোকজন বংশপরম্পরায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা-মসজিদ, বিদ্যুৎ, হাট-বাজার সবকিছু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু, জায়গাটি বনবিভাগের নামে হওয়ার তারা অবৈধ দখলদার হিসেবে আছে।

‘তাই জায়গাটি বনবিভাগের আওতামুক্ত করার জন্য মাননীয় সচিব ভূমি মন্ত্রণালয় ও সচিব বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় বরাবর প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রেরণের জন্য বিষয়টি আপনার নিকট প্রেরণ করা হলো, জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া ডিও লেটারে তিনি উল্লেখ করেছেন।

সংসদ সদস্যের চাওয়া ছয়শ একর বনভূমি ১৯৮৬ সাল থেকে চুনতি বন্যপ্রাণীয় অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত।

সম্প্রতি হারবাং এলাকার ভিলেজার পাড়া যেটি সংসদ সদস্যের প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত এলাকা পরিদর্শনে যান এই প্রতিবেদক। সরেজমিনে দেখা যায়, ওই এলাকায় বনবিভাগের ছড়ানো ছিটানো বনায়ন থাকলেও এমনভাবে সেখানে বসতি গড়ে উঠেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই সেখানে একসময় বনাঞ্চল ছিল।

সেখানে খোরশেদ আলম নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। খোরশেদের পিতা এখানে প্রথম বসতিস্থাপনকারীদের একজন।

‘১৯৫২ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর যে ১৬ পরিবারকে এখানে পুনর্বাসন করা হয়েছে তাদের মধ্যে আমার পরিবার একটি। এখানে যারা বসবাস করছেন তার মধ্যে প্রায় হাজার তিনেক মানুষ আছেন যারা প্রকৃত অর্থে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। বাকিরা দেশের নানা অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসবাস করছেন,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন খোরশেদ।

‘তবে, আমরা যেহেতু ভূমিহীন তাই সরকার আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করে বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সেটি আমাদের নামে বরাদ্দ দিতে পারেন,’ তিনি যোগ করেন।

বন আইন-১৯২৭ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া বনভূমি বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কমতে থাকা বনভূমি রক্ষায় মন্ত্রী পরিষদ ২০১৫ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যেখানে বনভূমির ভেতর দিয়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বন বিভাগের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।

জেলা প্রশাসনের তৎপরতা

সংসদ সদস্য জাফর আলমের প্রস্তাব পাওয়ার পর চলতি বছরের জুনে জেলা প্রশাসন তার উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

পরে চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের স্থানীয় তহশিলদার হারবাং ও রিজার্ভ হারবাং এলাকার ঘুরে প্রতিবেদন তৈরি করেন। প্রতিবেদনে ওই অঞ্চলে হাজার খানেক ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসার ও গাছপালা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তা ইজারাযোগ্য বলে মত দেন।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ডেপুটি রেভিনিউ কালেক্টর (আরডিসি) মোস্তাফা জাবেদ কায়সার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা বন বিভাগের কাছে তাদের মতামত চেয়েছি। এটা যেহেতু কাগজে-কলমে বনবিভাগের জায়গা, তাই যতক্ষণ না এটার শ্রেণি পরিবর্তন হচ্ছে ততক্ষণ আমরা লিজ দিতে পারি না।’

বন বিভাগের আপত্তি থাকলে বিষয়টি আর এগোবে না বলেও জানান তিনি।

সংসদ সদস্য জাফর আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি আমি মানবিকভাবে দেখেছি। মানুষগুলো অসহায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি যাতে কিছু করা যায় কিনা। এটার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’

বন বিভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেয়াজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের আমাদের কাছে মতামত চাওয়ার কোনো দরকার ছিল না। এভাবে বনভূমি ইজারা দেওয়ার প্রস্তাবটি অবিশ্বাস্য।’

‘গাছপালা নেই বলে যে প্রতিবেদনটি তহশিল অফিস দিয়েছে সেটা অজ্ঞতাপ্রসূত। বনের মধ্যে কিছু খোলা জায়গা থাকে যেখানে বন্যপ্রাণীরা নিজেদের মতো করে সময় কাটায়। দেশে বনভূমির পরিমাণ কমছে নানা কারণে, তার মধ্যে এ ধরনের একটি প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এটার প্রতিবাদ জানাই,’ বলেন তিনি।

Comments