প্রশ্ন-উত্তরে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার প্রমাণ

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ‘রক্তে জমাট বাঁধা’সহ নানাবিধ সংশয় দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ইউরোপে এই সংশয় প্রকট আকার ধারণ করেছিল। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ যখন ভ্যাকসিন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে সংশয় বাড়ে। আশঙ্কা তৈরি হয় যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কার্যকর কি না। এটি নিলে বড় ধরনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে কি না। গবেষণায় ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই আশঙ্কাগুলো সঠিক ছিল না।
oxford-vaccine
ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ‘রক্তে জমাট বাঁধা’সহ নানাবিধ সংশয় দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ইউরোপে এই সংশয় প্রকট আকার ধারণ করেছিল। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ যখন ভ্যাকসিন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে সংশয় বাড়ে। আশঙ্কা তৈরি হয় যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কার্যকর কি না। এটি নিলে বড় ধরনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে কি না। গবেষণায় ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই আশঙ্কাগুলো সঠিক ছিল না।

তবুও, প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল এবং কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব সংশয় বা আশঙ্কা দেখা দেয়, সেই বিষয়গুলো নিয়ে ইংল্যান্ডের দ্য ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের জ্যেষ্ঠ গবেষক, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. খোন্দকার মেহেদী আকরামের সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা। তাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দ্য ডেইলি স্টারের পাঠকদের জন্যে তুলে ধরা হলো।

বায়ো মেডিকেল সাইন্স গবেষক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম। ছবি: সংগৃহীত

গোলাম মোর্তোজা: অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদন হচ্ছে। যার নাম কোভিশিল্ড। এই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নেওয়ার পর দেহে ‘রক্ত জমাট বাঁধা’র খবরে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জার্মানিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ যখন এই ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলো, তখন পৃথিবীব্যাপী সংশয়-সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ল। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সর্বশেষ অবস্থান আপনার থেকে জানতে চাই।

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: বিশ্বব্যাপী যেমন ভ্যাকসিন কার্যক্রম পুরোদমে চলছে, ঠিক তেমনি কিন্তু করোনার নতুন ঢেউও শুরু হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানে নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই অবস্থা। প্যারিসসহ ফ্রান্সের বেশকিছু জায়গায় আবারও লকডাউন দেওয়া হয়েছে। মার্চের শেষ বা এপ্রিলে ইউকেতেও তৃতীয় ঢেউ শুরু হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলমান পরিস্থিতিতে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে ইউরোপের কিছু দেশ একযোগে ভ্যাকসিন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করায় সার্বিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের মনে দ্বিধা কাজ করছে যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন দিলে দেহে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা সত্যিই ঘটে কি না। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৩০ শতাংশ মানুষ অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দ্বিধায় আছে। এখন এই পরিস্থিতিতে যারা হেলথ রেগুলেটর, যাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর ভ্যাকসিনটি নিরাপদ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাদের মাথাব্যথা আরও বেড়ে যায়। কারণ, তাদের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সাধারণ মানুষকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেগুলেটরি বডি এমা (ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি) বিষয়টি নিয়ে অ্যানালাইসিস করেছে। তাদের স্বাভাবিক যে বোর্ড আছে, তারচেয়ে আরও শক্তিশালী বোর্ড নিয়ে তারা অ্যানালাইসিসটি করেছে। যেসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশগুলো ভ্যাকসিন কার্যক্রম স্থগিত করেছে, এমা সেগুলো বিশ্লেষণ করেছে। সবশেষে গত শুক্রবার তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকরী। এর সঙ্গে ‘রক্ত জমাট বাঁধাজনিত’ সমস্যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ধরনের মিল পাওয়া যায়নি। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ডের দুই কোটি ভ্যাকসিনগ্রহীতার মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার যে ২৫টি ঘটনার কথা এসেছে এবং যার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি ভ্যাকসিন কার্যক্রম স্থগিত করেছিল, সেগুলোর সঙ্গে ভ্যাকসিন নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে এমা। এমার এই ঘোষণার পর কিন্তু জার্মানি-ফ্রান্স আবার তাদের ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করেছে।

মোর্তোজা: এটা খুবই ভালো সংবাদ যে, ভ্যাকসিনের সঙ্গে দেহে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা আমার, আপনার বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বক্তব্য নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী-গবেষকদের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার তথ্য-সমৃদ্ধ বক্তব্য। এর মধ্য দিয়ে রক্ত জমাট বাঁধাজনিত সংশয়-সন্দেহ নিশ্চয়ই কেটে যাবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসছে। ‘টিকা নেওয়ার ১২ দিন পর করোনায় আক্রান্ত’, ‘টিকা নেওয়ার এক মাস পর করোনায় মৃত্যু’, ‘টিকা নেওয়ার পরেও করোনায় আক্রান্ত হলেন’, এই ধরনের সংবাদ গণমাধ্যমে আসছে। এ ধরনের সংবাদে সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগে যে, তাহলে টিকা সুরক্ষা দিচ্ছে না?

ড. আকরাম: খুব পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে এই নিউজগুলোর শিরোনাম নেতিবাচক বার্তা দেয়। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরপরই তো একজন মানুষ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়ে যায় না। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ নেওয়ার ২২ দিন পর থেকে কার্যকারিতা শুরু হয়। অর্থাৎ প্রথম ২১ দিন কোনো কার্যকারিতা থাকে না। ২২তম দিন থেকে আমরা আশা করতে পারি যে ভ্যাকসিনগ্রহীতার দেহে ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা তৈরি হবে। এখানেও কিন্তু শতভাগ সুরক্ষা নয়। এটা মানুষকে বুঝতে হবে। ভ্যাকসিন নেওয়া মানে শতভাগ সুরক্ষা নয়, জীবন রক্ষা। সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা এক জিনিস, আর জীবন বাঁচা আরেক জিনিস। গবেষণার ডেটার ওপর আমাদেরকে নির্ভর করতে হয়।

এখন যিনি ভ্যাকসিন নেওয়ার এক মাস পরে করোনায় মারা গেলেন, তিনি হয়তো আক্রান্তই হয়েছিলেন ১৪ দিন আগে। করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন, সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর তারা মারা যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত আরেকটি বিষয় হলো তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু, তিনি হয়তো মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে। ভারতে ভ্যাকসিন নেওয়ার পর একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরীক্ষা করে দেখা গেল যে, তিনি হৃদরোগে মারা গেছেন। বাংলাদেশেও ভ্যাকসিন নেওয়ার পর কেউ মারা গেলে এই পরীক্ষাটা করতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও তা করছে। যেহেতু ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, সেহেতু প্রতিটি ডেটাই বিশ্লেষণ করতে হবে।

একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই, ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ যদি এক শ জনকে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের মধ্যে ২৪ জনের কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেহেতু প্রথম ডোজের পর সর্বোচ্চ কার্যকারিতা ৭৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে সেই ২৪ শতাংশের করোনা পজিটিভ আসবে। কিন্তু, তাদের অবস্থা গুরুতর হবে না বা হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে না। আবার যারা দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন, তাদের মধ্যেও প্রায় ২০ শতাংশের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু, তাদের ক্ষেত্রেও সেটা মাইল্ড সংক্রমণ হবে, অবস্থা গুরুতর হবে না। কিন্তু, প্রথম ডোজ নেওয়ার পর থেকে ২১ দিন পর্যন্ত সবারই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মোদ্দা কথা, ভ্যাকসিন নেওয়ার উপকারিতা বহুবিদ। এটি মৃত্যু প্রায় শতভাগ ঠেকাতে কার্যকর। কিন্তু, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।

মোর্তোজা: বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সবার দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, সেটা পরীক্ষা করা তো সম্ভব না। কিন্তু, যেহেতু বিভ্রান্তি আছে, তাই কিছু সংখ্যকের পরীক্ষা করে সেটা জানানো দরকার কি না যে, তাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলো কি না?

ড. আকরাম: ভ্যাকসিন নেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটা পরীক্ষা করার কিটটি এখন অ্যাভেইলেভল। যেহেতু সন্দেহ বা বিভ্রান্তি রয়েছে, কাজেই সেটা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। আমি যতটুকু জানি, আইসিডিডিআর,বি ইতোমধ্যে এই কাজটি শুরু করেছে। আমি মনে করি বাংলাদেশ এখন একটা অ্যান্টিবডি কিট অনুমোদন দিতে পারে। কেউ নিজেরটা পরীক্ষা করেও দেখতে পারে। তবে, মানসম্মত অ্যান্টিবডি কিট হতে হবে এবং যারা পরীক্ষা করবে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে নতুন কোনো বিভ্রান্তি আবার না ছড়ায়।

মোর্তোজা: নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। ইংল্যান্ডের নতুন স্ট্রেইন বাংলাদেশে যাতে ঢুকতে না পারে, ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকেই তো আমরা সরকারকে সতর্ক করছিলাম। কিন্তু, সরকারকে তো সতর্ক হতে দেখা গেল না। এখনো বাংলাদেশের আরটি-পিসিআরে নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করা যায় না। তিন মাস আগেও বলা হয়েছে, এই সক্ষমতা অর্জন করা হবে। এখনো তাই বলা হচ্ছে। এখন নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করার জন্যে আরটি-পিসিআরে থ্রি-জিন পরীক্ষা কিট ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে টু-জিন পরীক্ষা কিট। এসব তথ্য তো আমরা সরকারকে লিখে, বলে জানিয়েছি। যতদূর জানি, বিশ্ববাজারে মানসম্পন্ন থ্রি-জিন কিট তো সহজলভ্য।

ড. আকরাম: বাংলাদেশে আবার সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণের যে ধরন, তা দেখে বোঝা যায় যে, এর পেছনে নতুন স্ট্রেইনের প্রভাব রয়েছে। আমি মনে করি শহরাঞ্চলে নতুন স্ট্রেইনটা ছড়িয়ে পড়ার কারণেই সংক্রমণ আবার বাড়ছে। এখন ছড়িয়ে পড়ুক বা না পড়ুক, বিষয় হচ্ছে আমরা তা শনাক্ত করতে পারি কি না। থ্রি-জিন আরটি-পিসিআরে পরীক্ষা করে সেটির তথ্য-উপাত্ত সম্প্রতি নেচার জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। আমি শুরু থেকেই বলে আসছি যে, থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা নির্দিষ্টভাবে যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইনটাকে শনাক্ত করে। থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষার জন্যে বাজারে স্বনামধন্য কোম্পানির কিট অ্যাভেইলেভল।

এটা ঠিক যে, থ্রি-জিন কিট দিয়ে পরীক্ষা করার যেই থার্মোসাইক্লার মেশিন, সেটা আমাদের সব পরীক্ষা কেন্দ্রে নাও থাকতে পারে। কিন্তু, প্রতিটা কেন্দ্রে তো আমাদের এই মেশিনটা দরকার নেই। দরকার থ্রি-জিন পরীক্ষা কিট।

কেউ যদি অনলাইনে ‘এস জিন ড্রপ আউট’ লিখে সার্চ দেয়, তাহলে থ্রি-জিন পরীক্ষা সম্পর্কে গবেষণার ফল, রিকমেন্ডেশন সবই পাওয়া যাবে। এটা সম্পর্কে জানা বা বোঝা কঠিন কিছু না। যুক্তরাজ্যে নতুন ধরন যে এত শনাক্ত হয়েছে, এই থ্রি-জিন পরীক্ষার মাধ্যমেই হয়েছে। এই সক্ষমতা অর্জনের জন্যে দরকার আন্তরিক উদ্যোগ।

মোর্তোজা: বাংলাদেশে ১০টা নমুনায় যুক্তরাজ্যের ধরন শনাক্ত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে। এখন এখানে বিষয়টি কি এমন যে, আমাদের থ্রি-জিন কিট দরকার নেই। আমরা জিনোম সিকোয়েন্সিং করেই শনাক্ত করব?

ড. আকরাম: জিনোম সিকোয়েন্সিং করে যে শনাক্ত করা হবে, সেই ক্যাপাসিটি তো বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশে হাজারো নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে হবে। কারণ, যে ফ্রিকোয়েন্সি রেট আমরা বলি, সেটা কিন্তু অনেক কম। এক হাজার নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং করলে সাতটি নমুনার মধ্যে ইউকে ভ্যারিয়েন্টের মিউটেশনটা পাওয়া যাবে। এখন বাংলাদেশে কি প্রতিদিন এক হাজার নমুনা সিকোয়েন্সিং করা সম্ভব? না। তাহলে কী করা সম্ভব? থ্রি-জিন কিটের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে পারে। দৈনিক গড়ে যে ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে, সেটা যদি থ্রি-জিন কিট দিয়ে করা হয়, তাহলে মিউটেশন থাকলে শনাক্ত করা সম্ভব।

মোর্তোজা: ভ্যাকসিন বিষয়ে আরও কিছু তথ্য জানার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ লক্ষণীয়। ভ্যাকসিন যখন তৈরি হয়েছিল, তখন তো ভাইরাসের এই রূপান্তর হয়নি। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা বা ব্রাজিলের স্ট্রেইনটি আসেনি। এখন নতুন স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে যে গবেষণা চলছে, তার সর্বশেষ ফলাফল বিষয়ে আমাদের ধারণা দিতে পারেন কি না?

ড. আকরাম: গবেষণার সর্বশেষ ফলাফল বলছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নতুন ইউকে স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে কার্যকর। অক্সফোর্ডের আরেকটি গবেষণা যেটা তারা এখনো প্রকাশ করেনি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করেছে দেখেছে যে, ইউকে ভ্যারিয়েন্টের ওপর অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা তিন গুণ কমে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে নয় গুণ কমে গেছে। আর ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা সাড়ে ছয় গুণ কমে গেছে। তারা ল্যাবে যে পরীক্ষাটা করেছে, তাতে দেখা গেছে, নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলোর ওপর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে গেছে। যেমন: ধরুন কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আমাদের শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা দিয়ে এক হাজার করোনাভাইরাস কিল করা যায়। কিন্তু, ইউকের নতুন ধরনটির ক্ষেত্রে এই এক হাজার থেকে তিন গুণ কমে যাবে। অর্থাৎ সুরক্ষার মাত্রা কমে যাবে। তবে, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত যে গবেষণা, তা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করছেন যে, ইউকে ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেও কোভিশিল্ড একইভাবে কার্যকর। কিন্তু, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইউকে ভ্যারিয়েন্টের ওপরও কার্যকারিতা কিছুটা কমে গেছে। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, আমরা এখন আর ভ্যাকসিন নেব না। ল্যাব পরীক্ষায় কার্যকারিতা কমতে দেখা গেলেও বাস্তবে কিন্তু ভ্যাকসিন আমাদেরকে সুরক্ষা দিচ্ছে। যদি সুরক্ষা কিছুটা কমে গিয়েও থাকে, তাও ভ্যাকসিন অবশ্যই নিতে হবে।

নেচার জার্নালে আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউকে ভ্যারিয়েন্টের ওপর কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আগের মতোই রয়েছে। সবমিলিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তাই আমাদেরকে অবশ্যই ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং ভ্যাকসিন নেওয়ার পক্ষেই অবস্থান করতে হবে। ভ্যাকসিন যে জীবন রক্ষায় কার্যকরী, সেখানে কোনো ধরনের দ্বিধা নেই।

মোর্তোজা: ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আসলে কতদিন? প্রায় সব মানুষের প্রশ্ন এটা। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি শরীরে কতদিন থাকবে? এখন পর্যন্ত হওয়া গবেষণা কী বলছে? বিশেষ করে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে?

ড. আকরাম: এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্যে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। ভ্যাকসিন দেওয়ার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণায় প্রকৃত তথ্য জানা যায়। কারণ ভ্যাকসিনের বয়স এখনো বেশিদিন নয়। সম্প্রতি ল্যানসেটে একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। উহানের বিজ্ঞানীরা তাদের বৃহৎ জনগণের রক্তের সেরাম পরীক্ষা করে দেখেছে, আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হলে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা কমপক্ষে নয় মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকে। আশা করা হচ্ছে, ভ্যাকসিনও কমপক্ষে নয় মাস সুরক্ষা দেবেই। বরঞ্চ ভ্যাকসিন যেহেতু যথাযথ একটি পদ্ধতি, সেহেতু ধারণা করা হচ্ছে ভ্যাকসিন নেওয়ার পর নয় মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত কার্যকারিতা পাওয়া যেতে পারে। তবে, এখনো এ বিষয়ে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেই। যেটা বলা যায়, এতদিন আমরা জানতাম না যে, ন্যাচারাল ইমিউনিটি কতদিন পর্যন্ত থাকে। কিন্তু, এই গবেষণায় দেখা গেল কমপক্ষে নয় মাস পর্যন্ত তা থাকে।

মোর্তোজা: অনেকে প্রথম ডোজ নিয়েছেন। কিন্তু, বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় এখন আর দ্বিতীয় ডোজ নেবেন না বলে চিন্তা করছেন। এই চিন্তা করাটা ভুল বা ক্ষতিকর তা কী আপনি পরিষ্কার করে বলবেন?

ড. আকরাম: এটা অত্যন্ত ভুল চিন্তা। কেউ যদি প্রথম ডোজ নিয়ে থাকে এবং তার যদি কিছু উপসর্গ দেখা না দেয়, যেমন: প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে না হয়, শরীরে যদি লাল-লাল ফুসকুড়ি দেখা না দেয়, চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ না হয় কিংবা মারাত্মক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া না হয়, তাহলে নির্দ্বিধায়-নির্ভয়ে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। তবে, যদি ভ্যাকসিন নেওয়ার পর চার থেকে ১৪ দিনের মধ্যে কারো তীব্র মাথাব্যথা থাকে এবং সেই ব্যথা যদি চার দিনেরও বেশি সময় থাকে, কেউ যদি অজ্ঞান হয়ে যায় বা চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এটার চিকিৎসা আছে। এতেও ভয়ের কোনো কারণ নেই। এটা শুধু সতর্কতামূলক বার্তা। তবে, বাংলাদেশ বা ভারতে এখন পর্যন্ত কারো এরকম হয়নি।

এই যে বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর কথা বললাম কিংবা রক্ত জমাট বাঁধার খবর শোনা যাচ্ছে, মনে রাখতে হবে, প্রতি ১০ লাখ মানুষে একজনের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে। সেই হিসাবে বাংলাদেশে যেহেতু প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচ জনের রক্ত জমাট বাঁধাজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, বাংলাদেশে কারো মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়নি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার যে ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশ দিচ্ছে, সেটি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকরী একটি টিকা। বিভ্রান্তি যেমন আছে, তেমনি সেই বিভ্রান্তি নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে এবং গবেষণার তথ্য মানুষকে প্রতিনিয়ত জানানো হচ্ছে। কোনো কিছুই গোপন রাখা হচ্ছে না। তাই কোনো ধরনের বিভ্রান্তিতে না থেকে নিঃসংকোচে ভ্যাকসিন নিতে হবে।

আরও পড়ুন:

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন কতটা সুরক্ষা নিশ্চিত করে?

ভ্যাকসিন নিলেও করোনায় আক্রান্তের সম্ভাবনা থাকে?

৪ সপ্তাহের পার্থক্যে দ্বিতীয় ডোজে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫৩ শতাংশ, ১২ সপ্তাহে ৮৩ শতাংশ

ভ্যাকসিন নেওয়া এবং না নেওয়া, মানুষ চিহ্নিত হবে দুই দলে

করোনার নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হয় না বাংলাদেশের পিসিআর পরীক্ষায়

মত-দ্বিমত ‘করোনাভাইরাসে দ্বিতীয়বার আক্রান্তের সম্ভাবনা নেই?’

ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধা ও বিতর্ক কেন?

ভ্যাকসিন কবে পাব এবং অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ‘ভুল ডোজ’র আশাবাদ

যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইন দেশে শনাক্ত: ‘দেরিতে জানিয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছি’\

করোনার নতুন স্ট্রেইন: করছি কী, করণীয় কী

করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ‘কিছুটা কমতে পারে’

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কারণে রক্ত জমাট বাঁধা এবং আমাদের যত ভ্রান্তি!

বিভ্রান্তি নয়, নির্দ্বিধায় ভ্যাকসিন নিতে হবে

Comments

The Daily Star  | English
Awami League's peace rally

Relatives in UZ Polls: AL chief’s directive for MPs largely unheeded

Awami League lawmakers’ urge to tighten their grip on the grassroots seems to be prevailing over the party president’s directive to have their family members and close relatives withdraw from the upazila parishad polls.

7h ago