কার বাক্সে যাবে পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী ভোট
ঝাড়খণ্ডের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো সমবেতভাবে জঙ্গলমহল নামে পরিচিত এবং উত্তরের চা-বাগানের আদিবাসীরা পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ। আজ শনিবার বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় এখানে ভোটগ্রহণ চলছে। কিন্তু, আদিবাসী ভোটের প্রতিযোগিতায় তৃণমূল কংগ্রেস নাকি বিজেপি জয়লাভ করবে, তা জানা যাবে আগামী ২ মে। কারণ, জঙ্গলমহলের রাজনীতি সবসময় গতিশীল।
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁচ জেলার ৩০টি আসনে প্রথম দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরমধ্যে প্রথম চারটিকে নিয়ে একত্রে জঙ্গলমহল গঠিত। যা বন ও পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চলকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের আধিপত্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে এই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ আদিবাসী সম্প্রদায়। সম্প্রদায়গুলো হলো— সাঁওতাল, ওরাওন, শবর, খেরিয়া, লোধা, মুন্ডা, ভূমিজ, মাহালি, ভোরা ইত্যাদি।
ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ যে ৩০টি আসনে ভোট হচ্ছে তার মধ্যে আদিবাসীরা সরাসরি ১৫টি আসনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। ১৯৭৭ সাল থেকে আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে এই অঞ্চল বামদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এ ছাড়াও, এখানে মাওবাদীদের এক ধরনের দাপট ছিল। কিন্তু, ২০১১ সালে এখানকার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। সেবার জঙ্গলমহল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে বিপুল ভোট দিয়েছিল। পরে ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২৭টি, কংগ্রেস দুটি ও আরএসপি একটি আসনে জয়লাভ করে। বিজেপি তখন এসব আসনে তৃতীয় স্থানে ছিল।
কিন্তু, ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে বিজেপি চমক দেখিয়েছিল। এখানকার ছয়টি লোকসভা আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয়লাভ করেছিল বিজেপি। এই আদিবাসী এলাকায় আরএসএস দশকের পর দশক ধরে কাজ করে আসছে। তারা এখানকার মানুষের পিছিয়ে পড়ার জন্য বাম ও তৃণমূল উভয় সরকারের উন্নয়নের অভাবকে দায়ী করেন। আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংগঠন যেমন বানভাসি কল্যাণ আশ্রম ক্রমাগত আদিবাসী এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান মাওবাদী আন্দোলন বাম আমলের শেষ দিকে এসে গতি হারিয়ে ফলে। যেমন: ২০০৮-০৯ সালের লালগড় আন্দোলনের সময় পুলিশের বিতর্কিত অবস্থান অধিকাংশ আদিবাসীকে বামদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এরপর বিরোধী দল তৃণমূল আদিবাসীদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। কিন্তু, তৃণমূল শাসনের ১০ বছর সত্ত্বেও এসব এলাকার মানুষের অবস্থার খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। দরিদ্র্য, কাজের সুযোগের অভাব, খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্নীতি এখনো এই এলাকার প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে সড়ক ও শিক্ষা সুবিধা প্রদানের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, তার কয়েকজন বিধায়ক দায়িত্বে পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আছে। এ বিষয়টিকেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে বিজেপি। যদিও জাফরান শিবির এখানে তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভয় পায়, কারণ তারা জানে— আদিবাসীদের নিজস্ব রীতি আছে।
অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতে গুলিবিদ্ধ হন। হেমন্ত তার রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকা সত্ত্বেও মমতার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু, মমতা ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চাকে কোনো আসন দিতে অস্বীকার করেন। তা সত্ত্বেও হেমন্ত তার বাংলার সহযোগীর জন্য প্রচারণা চালিয়ে জঙ্গলমহল ভ্রমণ করেছেন।
Comments