চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ছোট গাছের বাগানে ঝুঁকছেন আম চাষিরা

কৃষকদের আগ্রহ এখন গৌড়মতি, আম্রপালি, বারি-১১, বারি-৪ জাতের দিকে। ছবি: রবিউল হাসান

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে আমবাগানের ধরন। প্রচলিত বড় গাছের আমবাগানের স্থান দখল করছে ছোট গাছের ঘন বাগান। পুরনো বাগানগুলোর গাছের উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ ফুট হলেও উচ্চ-ফলনশীল জাতগুলোর উচ্চতা মাত্র ছয় থেকে সাত ফুট।

কৃষকদের আগ্রহ এখন গৌড়মতি, আম্রপালি, বারি-১১, বারি-৪ জাতের দিকে। এতে পুরাতন জাত ফজলি, ল্যাংড়া, খিরসাপাতের নতুন বাগান গড়ে উঠছে না। ফলে, এই জাতগুলো হুমকির মধ্যে পড়বে বলে অনেক কৃষকের ধারনা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় প্রতি বছরই আমবাগান বাড়ছে। প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে ছোট গাছের ঘন বাগানের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা। গত দশ বছরে জেলায় ১১ হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমির আমবাগান বেড়েছে। তবে, প্রচলিত জাতের জায়গায় এই ১০ বছরে উচ্চ ফলনশীল জাত আম্রপালি, বারি-৪ বেশি। অধিক মুনাফার আশায় কৃষকরা ফজলি, ল্যাংড়া, খিরসাপাতের পরিবর্তে লাগাচ্ছেন উচ্চ-ফলনশীল জাত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, ২০১১ সাল থেকে গত ১০ বছরে জেলায় আমবাগান বেড়েছে ১১ হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমির। এর প্রায় সবই উচ্চ ফলনশীল জাতের ঘন বাগান। ২০১১ সালে যেখানে বাগান ছিল ২৩ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে। সেখানে এ বছর ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার সাতশ ৩৮ হেক্টর জমি।

তিনি জানান, ২০১১ সালে আম উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৮৫ হাজার টন। গত বছর জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিল আড়াই টন। এ বছরও এই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

জেলায় পুরাতন জাত ফজলি, ল্যাংড়া, খিরসাপাতের নতুন বাগান গড়ে উঠছে না। ছবি: রবিউল হাসান

কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নাচোল, গোমস্তাপুর উপজেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে আমবাগান বাড়ছে। মূলত গৌড়মতি, যাদুভোগ, আম্রপালি, বারি-১১-সহ বিভিন্ন নাবী (দেরিতে পাকে) জাতের আমগাছ লাগাচ্ছে। আমের বাগান করলে জমির মূল্যও বাড়ে, বাগানে অন্যান্য ফসল করতে পারে। এছাড়া পরিবেশও ভালো থাকে।’

তিনি বলেন, ‘নাবী জাতের গাছ লাগানোর কারণে কৃষকরা ভালো মূল্য পায়। যেহেতু বাজারে ওই সময় প্রচলিত জাতের আম কম থাকে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলিনগর মহল্লার আমিনুল ইসলাম ৭২ বিঘা জমিতে আম বাগান করেছেন সদর উপজেলার ধি-নগর গ্রামে। তিনি জানান, চার বছর হলো তার বাগানের। প্রায় ১৩ হাজার গাছের এই বাগানে শুধু জায়গা পেয়েছে আম্রপালি ও বারি- ৪ জাতের আম গাছ। এই বাগানে একটি গাছ থেকে আরেকটির দূরত্ব মাত্র ছয় থেকে নয় ফুট। পুরো জমি তিনি লিজ নিয়েছেন ১৫ বছরের জন্য। প্রতি বছর জমির মালিককে দিতে হয় চার লাখ ২০ হাজার টাকা। গত বছর বাগান থেকে তিনি প্রায় ৯ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে চাষের কথা বিবেচনা করে এখন ঘন বাগানের দিকেই ঝুঁকছেন চাষিরা। এছাড়া ছোট গাছের উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোর বাগানই বাড়ছে। এ সব ছোট গাছের বাগানে একদিকে পরিচর্যা থেকে শুরু করে আম নামানো সহজ, অন্যদিকে কম জায়গায় বেশি ফলন পাওয়া যায়।’

একই উপজেলার হোসেনডাইং এলাকার মোতালেব হোসেন চার বিঘা জমিতে আমবাগান করেছেন। তিনিও তার বাগানে লাগিয়েছেন দেশি জাতের ল্যাংড়া, খিরসাপাত, ফজলি।

তিনি জানান, অন্য ফসলের চেয়ে আম লাভজনক। জমির চারপাশে সবাই আমবাগান করায় বাধ্য হয়েই তাকে আমবাগান করতে হয়েছে।

সদর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের তরুণ চিকিৎসক মাসুমউজ্জামান চৌধুরী একই উপজেলার ঝিলিমে তার পাঁচ বিঘা জমিতে দুই বছর আগে ৫০০ আমের চারা লাগিয়েছেন। এগুলো আম্রপালি, বারি-৪ সহ কয়েকটি উচ্চ-ফলনশীল জাত। তিনি খরচ করেছেন তিন লাখ টাকা।

গত দশ বছরে জেলায় ১১ হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমির আমবাগান বেড়েছে। ছবি: রবিউল হাসান

তিনি বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে প্রচলিত বাগান করলে গাছ লাগানো যাবে ৩০ থেকে ৩৫টি। ফলের জন্য কমপক্ষে ছয় থেকে সাত বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু, উচ্চ ফলনশীল আমগাছ অধিক পরিমাণে ঘন করে লাগানো যায়। এ ছাড়া দুই বছরেই ফল পাওয়া যায়।

তাদের মতো জেলার অনেকেই এখন এ ধরনের বাগানের দিকে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

যোগাযোগ করা হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুল ইসলাম জানান, স্বল্পমেয়াদী বাগান গড়ে ওঠায় নতুন নতুন জাতগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। বড় গাছের বাগান করলে ফল পেতে যেখানে আট থেকে নয় বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে ছোট গাছে ফল আসে তিন বছরেই।’

তিনি জানান, কৃষকরা আরও ঘন বাগান তৈরি করছে। অতীতে তারা যেমন পৈত্রিক জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে আমগাছ লাগাত। এখন কৃষকরা লিজ নিয়ে অল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছে। তাই তারা আম্রপালি, বারি-১১র মত জাতের আম চাষ করছে।

Comments

The Daily Star  | English
Remittance Earnings of Four South Asian Countries

Bangladesh back in South Asia remittance race

Bangladesh has returned to a competitive remittance growth path in line with its South Asian neighbours, with a larger-than-usual flow of money sent home by expatriates following the political changeover in August last year.

11h ago