১০ রেল ইঞ্জিন ক্রয় প্রকল্প: একটি ‘ভালো কাজে’ শাস্তির দৃষ্টান্ত

রেল মন্ত্রণালয় তাদের একজন প্রকল্প পরিচালককে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, যিনি ১০টি রেল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) সরবরাহ চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে হুন্দাই রোটেম কোম্পানির (এইচআরসি) প্রাপ্য অর্থ আটকে দিয়েছিলেন। তাকে বদলি করে তার জুনিয়র একজনের অধীনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
railway-ministry-1.jpg

রেল মন্ত্রণালয় তাদের একজন প্রকল্প পরিচালককে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, যিনি ১০টি রেল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) সরবরাহ চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে হুন্দাই রোটেম কোম্পানির (এইচআরসি) প্রাপ্য অর্থ আটকে দিয়েছিলেন। তাকে বদলি করে তার জুনিয়র একজনের অধীনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

রেলগাড়ির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ইঞ্জিনগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা করতে একটি টেকনিক্যাল কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়ার পরপরই বদলির সিদ্ধান্তটি এলো। ইতোমধ্যে আরও দুটি কমিটির অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।

একটি কমিটি হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের গ্রেড-৩ কর্মকর্তা নূর আহমেদ হোসেন এই ১০টি লোকোমোটিভসহ আরও অন্যান্য পণ্য ক্রয় প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, যাকে বদলি করা হয়েছে।

গত বুধবার মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানা যায়, নূর আহমেদের পরিবর্তে আরেকটি প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নূর আহমেদের আগে হাসান মনসুর ‘১০ লোকোমোটিভ’ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন।

একই প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয় যে, আরেকটি প্রকল্পের পরিচালক পার্থ সরকার রেলওয়ের হাসান মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হবেন এবং পার্থর স্থলাভিষিক্ত হবেন রেলওয়ের যুগ্ম-মহাপরিচালক (যান্ত্রিক) তাবাসসুম বিনতে ইসলাম।

প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, কিন্তু এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে নুর আহমেদকে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (ইস্ট জোন) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান মহাপরিচালক এবং নুর আহমেদ দুজনই বিসিএস’র ১০ম ব্যাচের এবং ফলাফলের মেধাক্রম অনুসারে নবনিযুক্ত অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক জ্যেষ্ঠ বলে রেলওয়ের এক সূত্রে জানা গেছে।

মধ্যমসারির এক রেলওয়ে কর্মকর্তা এই সংবাদদাতাকে বলেন, ‘এ ধরনের নিয়োগ একেবারেই যে হয় না তা নয়, তবে এটি নিঃসন্দেহে অদ্ভুত’। যোগাযোগ করা হলে নুর আহমেদ বলেন, ‘আমি আইনি সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবছি’। এ ছাড়া, তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন: অনেক ঘটনার পরিসমাপ্তি

৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে কেনা ডিজেল চালিত মিটার গেজ লোকোমোটিভগুলোকে চট্টগ্রাম বন্দরে গত সেপ্টেম্বরে খালাস করা হয়েছে। সম্প্রতি পাহাড়তলির রেলওয়ে ওয়ার্কশপে সেগুলো নিয়ে আসা হয়েছে।

রেলওয়ের কমিশনিং কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, সরবরাহকৃত ইঞ্জিনগুলোর চারটি মূল কারিগরি উপাদান- ইঞ্জিন, অল্টারনেটর, কমপ্রেসর ও ট্র্যাকশন মোটর চুক্তিতে উল্লেখিত বর্ণনার সঙ্গে মিলছে না।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ হুন্দাইকে প্রাপ্য অর্থের ৬৫ শতাংশ আটকে দেয় এবং রেলমন্ত্রী গত অক্টোবর এ অনিয়মের তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তখন থেকে লোকোমোটিভগুলো ওয়ার্কশপে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন ও ভূমি) ফারুকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার প্রতিবেদনটির একটি অনুলিপি সংগ্রহ করেছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লোকোমোটিভ সরবরাহ না করার জন্য হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। এ ছাড়াও, প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন করার দায়িত্বে থাকা সিসিআইসি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, হুন্দাই অল্টারনেটরের মডেল টিএ৯-১২সিএ৯এসই সরবরাহ করেছে, কিন্তু চুক্তিতে উল্লেখ ছিল টিএ১২-সিএ৯ এর কথা।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি মডেলের মধ্যে শক্তি উৎপাদনের সামর্থ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এ ছাড়াও, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের সব রেলপথকে ডুয়েল গেজ লাইনে রূপান্তরিত করা হবে। সরকার রেলওয়েকে নির্দেশ দিয়েছিল এমন লোকোমোটিভ কিনতে যেগুলোকে কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে মিটার এবং ব্রড উভয় গেজেই চালানো যাবে।

কিন্তু টিএ৯-১২সিএ৯এসই অল্টারনেটর থাকার কারণে এই ইঞ্জিনগুলো ব্রড গেজে চলবে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

প্রকল্পের পরিচালক শুধু হুন্দাইকে অর্থ প্রদানই থামাননি, তিনি একইসঙ্গে ‘রেলওয়ের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা’র নামে অভিযোগ এনেছেন যে, তাদের যোগসাজশেই হতে যাচ্ছিল এ অনৈতিক কাজটি।

হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না, গত ১০ মার্চ এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন।

তিনি জানান, চুক্তিতে উল্লেখিত ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অল্টারনেটর ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। তার ভাষ্যমতে, সবচেয়ে উপযুক্ত অল্টারনেটর মডেল টিএ-০৯ কেন এই প্রকল্পের জন্য প্রথমেই নির্বাচিত হয়নি, সেটা তারা আগে খতিয়ে দেখবেন।

রেলওয়ে গত ২৩ মার্চ বুয়েটের যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং তাদেরকে দশ কার্যদিবসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল যোগাযোগ করা হলে কমিটির প্রধান জানান যে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে তারা এখনো কাজ শুরু করতে পারেননি।

দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

Comments

The Daily Star  | English
Dhaka Airport Third Terminal: 3rd terminal to open partially in October

HSIA’s terminal-3 to open in Oct

The much anticipated third terminal of the Dhaka airport is likely to be fully ready for use in October, enhancing the passenger and cargo handling capacity.

10h ago