তাদের চোখে-মুখে এখনো অজানা ভীতি

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা অমূল্য দাশ সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থে হবিগঞ্জ শহরে বানিয়েছেন একটি বাড়ি। স্ত্রীর নামে বাড়িটির নাম রেখেছেন ‘মঞ্জুরী ভবন’। তার মেয়ের জামাইয়ের ওপর ক্ষোভের জের ধরে একদল উশৃঙ্খল যুবকের আক্রমণে তিন তলা বাড়িটি জুড়ে এখন শুধু তাণ্ডবের চিহ্ন।
তিন তলা বাড়িটি জুড়ে এখন শুধু তাণ্ডবের চিহ্ন। ছবি: সংগৃহীত

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা অমূল্য দাশ সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থে হবিগঞ্জ শহরে বানিয়েছেন একটি বাড়ি। স্ত্রীর নামে বাড়িটির নাম রেখেছেন ‘মঞ্জুরী ভবন’। তার মেয়ের জামাইয়ের ওপর ক্ষোভের জের ধরে একদল উশৃঙ্খল যুবকের আক্রমণে তিন তলা বাড়িটি জুড়ে এখন শুধু তাণ্ডবের চিহ্ন।

অমূল্য দাশের স্ত্রী মঞ্জুরী দাশ পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপক। এই দম্পতির দুই কন্যা। দুজনই লন্ডন প্রবাসী। শেষ বয়সে স্বামী-স্ত্রী থাকতে চেয়েছিলেন শান্তিতে। কিন্তু গত সোমবার এক পরিকল্পিত হামলায় সবকিছু তছনছ হওয়ায় অনেকটা বাকরুদ্ধ অমূল্য দাশ। 

চোখের সামনে বাসার দরজা, জানালা, আসবাবপত্র ভাঙচুর করে লুঠপাট করে নিয়ে গেলেও তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার শক্তি ছিল না অমূল্য দাশের। ছবি: সংগৃহীত

তার স্ত্রী মঞ্জুরী দাশ মাসখানেক আগে স্ট্রোক করে এখন শয্যাশায়ী। চোখের সামনে বাসার দরজা, জানালা, আসবাবপত্র ভাঙচুর করে লুঠপাট করে নিয়ে গেলেও তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার শক্তি ছিল না তার।

ভবনটির অন্যান্য ফ্লাটের ভাড়াটিয়ারা সর্বস্ব হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের চোখে মুখে এখনো অজানা ভীতি। নিরাপত্তার জন্য এখনো সেখানে পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে।

দৈনিক আমার হবিগঞ্জ সম্পাদক সুশান্ত দাশ গুপ্ত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শাহ আরজু নামে একজন ফেসবুকে দৈনিক আমার হবিগঞ্জের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন গত সোমবার। ঘটনার দিন বেলা ১২টার দিকে শহরের চিড়াকান্দি ও আশপাশ এলাকা ঘিরে রাখে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ যুবক। এলাকাটিতে বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারই হিন্দু।’

তিনি আরও বলেন, ‘আতংক ছড়িয়ে পড়ে সেখানকার অন্তত ১০০ বাড়িতে। পুলিশ নিরাপত্তার জন্য ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। দুপুর ১টার দিকে সমবেত যুবকরা প্রথমেই পত্রিকার অফিস লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশের বেষ্টনী ভেঙে তারা পত্রিকা অফিসের পাশে থাকা “মঞ্জুরী ভবনে” হামলা চালায়। কলাপসিবল গেট ও ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে প্রবেশ করে চালায় ভাঙচুর ও লুটপাট। ভয়ভীতি দেখিয়ে নারীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় স্বর্ণালংকার। তালা ভেঙে আলমারি থেকে টাকা-পয়সা, দামি জিনিসপত্র লুটে নেয়।’

‘এসময় হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আমি, আমার ভাগ্নে হরি ও শুভ আহত হয়েছি। ওই ভবনটি আমার শ্বশুরের বাসা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১১ রাউন্ড টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। কিন্তু ততক্ষণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বাড়ির পানির ট্যাংক, ফুল বাগান থেকে শুরু করে সব। পরবর্তীতে র‌্যাব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।’

বাড়ির ভাড়াটিয়া পঙ্কজ দেব রায় বলেন, ‘বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছোড়া হয়েছে বাড়িটি লক্ষ্য করে। পুলিশ থাকার পরেও তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে যে যেভাবে পেরেছে জিনিসপত্র লুট করেছে। হবিগঞ্জে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেছে বলে মনে হয় না। লকডাউনের কারণে বাসায় ছিলাম। নইলে আমার বৌ-বাচ্চাদের কী হতো ভগবানই জানেন।’ 

হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার নির্দেশে হবিগঞ্জ পৌর মেয়র ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম এবং জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মহিবুর রহমান মাহীর উপস্থিতিতে যুবলীগ, ছাত্রলীগের কিছু কর্মী এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ দৈনিক আমার হবিগঞ্জ সম্পাদক সুশান্ত দাশ গুপ্তের। 

তিনি বলেন, ‘ওই দুই নেতাসহ কয়েকজনের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন। গত সোমবারের ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা প্রতিশোধ চরিতার্থ করেছেন। তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এর আগে একাধিকবার পত্রিকা বন্ধের জন্য মিছিল, মানববন্ধন, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় গত বছর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আমার ও আমার আরও দুই সহকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আমাদের বেশ কিছুদিন জেলে থাকতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পত্রিকা না ছাপার জন্য সোমবার রাতে ১০ থেকে ১৫টি মোটরসাইকেলে কিছু যুবক প্রেসের কর্মচারীকে মারধর ও প্রেস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। ফলে মঙ্গলবার ও বুধবারের সংখ্যা জেলা সদরের বাইরে থেকে ছাপাতে হয়েছে।’

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মহিবুর রহমান মাহী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি নই, বরং সুশান্ত দাশ গুপ্ত নিজেই এগুলো করে আমার সুনাম নষ্ট করছে।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে হবিগঞ্জের নবনির্বাচিত মেয়র ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার হবিগঞ্জ পত্রিকা হবিগঞ্জের বিশিষ্টজনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করছে। এর জের ধরেই এই ঘটনাটি ঘটতে পারে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই ঘটনাস্থলে গিয়ে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করি। হ্যান্ডমাইক দিয়ে আমি রমজান মাসের দোহাই দিয়ে দুপক্ষকে থামাতে চেষ্টা করি।’

হবিগঞ্জ থানার ওসি মাসুক আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।’

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে হামলাকারীরা পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে মঞ্জুরী ভবনে ঢুকে পড়ে। ঘটনার তদন্ত চলছে। এখনও মামলা হয়নি। এই ঘটনায় পুলিশ সদস্য আহত হওয়ায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত মঞ্জুরী ভবন পরিদর্শন করেছেন। এসময় তাদের সঙ্গে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাচ্ছিরুল ইসলাম, সাবেক পৌর মেয়র মিজানুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা অনুপ কুমার দেব মনা, মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সামছু মিয়া সহ আরও অনেকে। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন বলেন, ‘চামচামিতে আমরা এমন পর্যায়ে গেছি যে, হিন্দুদের বাড়িতে এতো বড় সন্ত্রাসী হামলা হয়ে গেল এর প্রতিবাদে এখন পর্যন্ত হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান পরিষদ, পূজা উদযাপন কমিটির মতো সংগঠনগুলো মানববন্ধন বা মিছিল তো দূরের কথা, একটি বিবৃতি দিতেও সাহস করেনি।’

Comments

The Daily Star  | English