জলবায়ুর আলোচনায় ভোগবাদ নিয়েও কথা বলতে হবে

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আয়োজনে ‘লিডারস সামিট অন ক্লাইমেট’ শীর্ষক সম্মেলন শেষ হলো। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছেন।
Climate change
ছবি: রয়টার্স ফাইল ফটো

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আয়োজনে ‘লিডারস সামিট অন ক্লাইমেট’ শীর্ষক সম্মেলন শেষ হলো। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছেন।

এক.  ২০৩০ সালের মধ্যে আমেরিকা কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে ২০০৫ সালের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনবে।

দুই. আমেরিকা জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে অর্থ-সাহায্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াবে।

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু ইস্যুতে যে গোঁয়ার্তুমি করছিলেন, বাইডেন তার থেকে বেরিয়ে এসে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একে স্বাগত জানিয়েছেন সবাই।

এর ঠিক দুই দিন আগে তথা গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এক ভয়ঙ্কর বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছে। তারা বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ বিপদজনকভাবে বেড়ে যাবে।

এছাড়াও, জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, গত বছর বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে এ বছরও। (প্রথম আলো, ২১ এপ্রিল ২০২১)

আইইএ বলেছে, করোনার ধাক্কায় থমকে যাওয়া অর্থনীতি সচল করতে এ বছর অতিরিক্ত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহারও বাড়বে। ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ অনেক বেড়ে যাবে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে এই সম্মেলন এবং সেই সম্মেলনে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশের এই প্রতিশ্রুতি। ব্যাপারটি ভেবে দেখবার মতো। যদিও সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন ও ভারত নতুন কোনো অঙ্গীকার করেনি।

চীনের প্রেসিডেন্ট অবশ্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্রগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেছেন (সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ২২ এপ্রিল ২০২১)।

জাপান বলেছে, দেশটি ২০৩০ এর মধ্যে ২০১৩ সালের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ ৪৬ শতাংশ কমিয়ে আনবে। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি আশাব্যঞ্জক। বিশেষত, অধিকাংশ দেশ যখন প্যারিস চুক্তির চেয়ে বৃহত্তর টার্গেটের কথা বলছে।

কিন্তু, তারা কি তাদের পণ্য ও সেবা ব্যবহারের পরিমাণ কমাবে? নাগরিকদের অতি-ভোগবাদিতায় রাশ টানতে উদ্যোগ নেবে? না কি শুধু পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই অর্জন করার পরিকল্পনা?

উত্তর হচ্ছে, ভোগবাদী সমাজ বা রাষ্ট্র পণ্য ও সেবার পরিমাণ কমানোর কথা ভাবে না।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাটা হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে এমন সব ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ কমবে, তা কিন্তু নেতারা বলেন না। তাদের এই কথার অর্থ, তাদের দেশের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমাবেন। সেটাই মন্দের ভালো। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো সেই প্রতিশ্রুতিটাও দিতে চাননি।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর সহজ ও সস্তা পথ হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বেশি হয় এমন শিল্প দেশের বাইরে অপেক্ষাকৃত গরিব দেশে স্থানান্তর করা। বিশ্বায়নের অন্যতম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটি। এতে কিছু পরিবহন খরচ যুক্ত হয় বটে। কিন্তু, উৎপাদন খরচও কমে যায় অনেকগুণ। বাড়তি লাভ, ওই দরিদ্র দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার, যার ছায়া কখনো কখনো রাজনীতিতেও পড়ে।

পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে জীবাশ্ম জ্বালানিখাতে আমেরিকার ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও এই সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক দূত জন কেরি বলেছেন, দেশের বাইরেও জীবাশ্ম জ্বালানিখাতে বিনিয়োগ কমাবে তার দেশ। সেটি খুব সহসা হবে তেমনটি আশা করা বোধ হয় কষ্ট-কল্পনা হবে।

বরং দ্বিতীয় যে প্রতিশ্রুতি তারা দিচ্ছে, অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত গরিব ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো, সেটায় বরং বেশি ভরসা রাখা যায়।

যদিও গরিব দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির মুখে ফেলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে গরু মেরে জুতাদানের (জুতাটি ওই গরুর চামড়া দিয়েই বানানো) যে কৌশল শিল্পোন্নত দেশগুলো নিয়েছে, তাতে গরিব দেশগুলোর খুব লাভ হচ্ছে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের জন্যেই মূলত আজকের এই জলবায়ু সংকট। অপেক্ষাকৃত কম শিল্পোন্নত, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর ভূমিকা এতে খুবই কম। কিন্তু, সেই কম ভূমিকা রাখা দেশগুলোর কোনো কোনোটি আবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ তেমনই একটি দেশ যে জলবায়ু বিষয়ে ক্ষতিকর কাজ করেছে কম; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশকে এই অর্থসাহায্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে দায়ী দেশগুলো এক প্রকার দায়মুক্তি খুঁজছে। এবং বোধ হয় তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত দায়মুক্তি পেয়েও যাচ্ছে।

পরিবেশবিষয়ক আলোচনায় আমাদের পণ্য ও সেবা ব্যবহারের পরিমাণ নিয়ে খুব আলোচনা হয় না। পণ্য ও সেবা, তা যতোটা অদরকারি হোক না কেন, সেগুলো মানুষকে ব্যবহার করাতে হবে। এটাই ভোগবাদী আদর্শের মূলকথা। তা না হলে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ হবে না এবং বিশ্বের সেরা ধনীদের সম্পদ বাড়বে না। দেশের জিডিপি বাড়বে না।

সুতরাং বাজার অর্থনীতির নামে গ্রাহককে বেশি করে পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করার সব ব্যবস্থা করতে হবে। যেটা তার প্রয়োজন নেই , সেটা ছাড়া তার দিন চলবে না এরকম ভাবনা একদিকে তার মাথায় ঢুকাতে হবে; অন্যদিকে পণ্যটি যাতে সে বেশিদিন ব্যবহার করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

সেই পণ্যটি অল্পদিনে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণেই হোক; বা আপডেটেড ভার্সনের নামেই হোক— তা বেশিদিন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। আপডেটেড ভার্সনের (যেমন ফোনের নতুন মডেল, কাপড়ের নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড) পণ্যকে ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জোর চেষ্টা পৃথিবীজুড়ে। এর জন্যে কোম্পানিগুলো প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। ফলে প্রচুর পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ হচ্ছে এবং হবে। পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের এই প্রক্রিয়ায় জলবায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সব আয়োজন থাকছে।

উদাহরণ হিসেবে কাপড় ও জুতার কথাই ধরা যাক। ২০১৮ সালে এই খাত থেকে সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে তা ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের মোট কার্বন নিঃসরণের চেয়ে বেশি (২ দশমিক ১ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড)। এটা ওই বছরের সারা পৃথিবীর মোট কার্বন নিঃসরণের শতকরা চার ভাগের মতো। (ফ্যাশন অ্যান্ড কার্বন এমিশনস: ক্রাঞ্চ টাইম/ ভোগ বিজনেস/ ২৬ আগস্ট ২০২০)

তাছাড়া, পৃথিবীর পানি দূষণের একটা বড় অংশের দায় কাপড় ও চামড়া শিল্পের। সেটা কাপড় বা চামড়া পরিষ্কার করা ও রঙ করার প্রক্রিয়া থেকেই হোক; অথবা পলেস্টার কাপড় ধোয়ার সময় প্রতিবার প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা পানিতে মিশে নদী ও সমুদ্রে মিশে যাওয়া হোক।

আমেরিকার বাজারের অন্তত ৪০ ভাগ কাপড় চীন থেকে যায়। চীনের পুরো এনার্জি সেক্টর ব্যাপকভাবে কয়লা-নির্ভর, যা পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জ্বালানি। তাহলে উপায় কী? চীন তো এই সম্মেলনে নতুন কোনো অঙ্গীকার করল না।

বাংলাদেশের বস্ত্র ও চামড়া শিল্পেরও এ বিষয়ে দুর্নাম আছে। বিশেষত বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপির ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা লক্ষ্য করার মতো। চামড়া শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারে যাওয়ার পরে এতো বছরেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ‘অপারেশনাল’ হয়নি। ফলে বুড়িগঙ্গার বদলে এখন বর্জ্যগুলো ধলেশ্বরীতে মিশছে। পরিবেশের সার্বিক বিবেচনায় কোনো লাভ হয়নি।

সম্প্রতি, বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলখাত বেশ কয়েকটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের পরিবেশবান্ধব গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষে। সর্বোচ্চ রেটিং প্লাটিনাম গ্রেডেও বাংলাদেশের ফ্যাক্টরির সংখ্যা বেশি। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০)  বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব হিসেবে স্বীকৃত (সার্টিফাইড) গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির সংখ্যা ১২৫। টেক্সটাইল ফোকাসের  এক প্রতিবেদনে (১ অক্টোবর ২০২০) বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ৫০০ পরিবেশবান্ধব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। পরিবেশবান্ধব ফ্যাক্টরিতে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৪ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম, পানির ব্যবহার কমবেশি ৪০ শতাংশ কম। কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ ৩৩ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশ কম।

প্রশ্ন হচ্ছে এই যে বিলিয়ন বিলিয়ন পিস কাপড় তৈরি ও বাজারজাতকরণ হচ্ছে এর পুরোটাই কি অত্যাবশ্যকীয়? না, ফাস্ট ফ্যাশনের এই যুগে মানুষ সস্তায় পাবে (সস্তার ভার বহন করবে মূলত শ্রমিক), কিনবে প্রচুর, প্রতিটি ব্যবহার করবে কম এবং ছুঁড়ে ফেলে দেবে। এটাই নিয়ম। বছরে এক হাজার ৫০০ মিলিয়নের বেশি মোবাইল ফোনসেট বিক্রি হয় (স্ট্যাটিসটা.কম)। কতগুলো ফোনসেট নতুন ব্যবহারকারী কেনেন আর কতগুলো আসলেই বদলানো দরকার হয়? ক্রেতার সামনে ইল্যুশন আছে আধুনিক-আপডেটেড ও ফ্যাশন সচেতন হওয়ার। সুতরাং সে নতুন মডেল কেনে। নতুন ফোন কেনার জন্য কিডনি বিক্রির সংবাদও পত্রিকায় দেখা যায়। অন্য যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রেও এরকম উদাহরণ দেওয়া যায়।

এই যে ওয়ান-টাইম না হলেও ফিউ-টাইম ব্যবহারের পণ্য সেগুলো প্রচুর বর্জ্যও তৈরি করছে। প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য বড় হুমকি। অতএব এই অতিরিক্ত ভোগবাদিতার পরিবেশের ওপর প্রভাব দুই দিকেই– এক. এসব পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে গিয়ে কার্বন নিঃসরণ হয়; এবং দুই. এগুলো বর্জ্য হিসেবে পরিবেশের জন্য আবারও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সেগুলোর অযথা বেশি উৎপাদন আমরা চালিয়ে যেতে চাই।

সেজন্যই আমাদের জলবায়ুবিষয়ক আলোচনার টেবিলে পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও ব্যবহার কমানোর কথা থাকে না। উৎপাদনের পরিমাণকে ঠিক রেখে, বা আরও বাড়িয়ে; প্রক্রিয়াকে মেডিফাই করার মধ্য দিয়ে আমরা জলবায়ুবিষয়ক চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে চাচ্ছি।

কিন্তু, যেসব পণ্য ও সেবা উৎপাদন, ব্যবহার ও ডিসপোজাল প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ক্ষতি হয়, এড়িয়ে যাওয়ার মতো ক্ষেত্রে সেগুলো কম ব্যবহার করাটা হতে পারতো জলবায়ু সমস্যার সবচেয়ে টেকসই সমাধান।

আমরা খেয়াল করলাম, এই জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে ঘরে বসে অংশগ্রহণ করলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তার জন্য জন কেরি হাজার হাজার মাইল আকাশভ্রমণ করে এলেন আমন্ত্রণ জানাতে। পরিবেশবিষয়ক একটি শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হলো ‘এড়িয়ে যাওয়া যেত’ এমন একটি কার্বন নিঃসরণের ঘটনা দিয়ে।

ভার্চুয়াল সম্মেলনের আমন্ত্রণ ভার্চুয়াল করা গেল না। জলবায়ু নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে একজন জলবায়ু বিষয়ে অজ্ঞ মানুষের এই আকাশভ্রমণ বিষয়ে কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। বরং জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে হবে এই কথা বলার জন্যই অনেকে বিদেশভ্রমণ করে থাকেন। যদিও উড়োজাহাজ কার্বন নিঃসরণের একটি বড় উৎস— একথা কারো অজানা নয়।

এখন আসা যাক বাইডেনের অন্য প্রতিশ্রুতি, আর্থিক সহায়তা, বিষয়ে। বিদেশ থেকে এই খাতে টাকা পেলেও সেটা কতটা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাবে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে। বাংলাদেশে জলবায়ু তহবিলের নেওয়া প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে এই ভয় আরও গাঢ় হয়।

জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের ওয়েবসাইটে প্রকল্প ও বাজেট ট্যাবটি বর্তমানে আন্ডার কনস্ট্রাকশন দেখাচ্ছে বলে হালনাগাদ তথ্য দেওয়া যাচ্ছে না। তবে ২০১৭ সালে টিআইবির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের ১১টি প্রকল্পের মধ্যে কয়েকটিই পার্ক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প ছিল। শুধুমাত্র পিরোজপুর জেলাতেই পিরোজপুর রিভারভিউ ইকো পার্ক’র (ডিসি পার্ক) সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন, ভাণ্ডারিয়া থানা ইকো পার্ক উন্নয়ন ও সংস্কার এবং পিরোজপুর পুলিশ লাইন ইকো পার্ক নির্মাণ— এ রকম তিনটি প্রকল্প ছিল।

দেখা যাচ্ছে, আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য সৌন্দর্য বর্ধন। তাতে পরিবেশের কতটা উন্নয়ন হবে বলা মুশকিল। পর্যটনের বিকাশ হলেও হতে পারে। পর্যটনের নামে প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস তো এমনিতে হচ্ছেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়।

এই যে পার্ক সংস্কার করে জলবায়ুর ক্ষতি মোকাবেলার চেষ্টা এটা কতকটা অফিসের বারান্দায় ফুলের টব রেখে গ্রিন অফিস তৈরি করার চেষ্টার মতো। কার্বন নিঃসরণে অবদান রাখবে না বা খুবই কম অবদান রাখবে এমন একটি অফিস দেখতে গ্রিন না হলেও সেটাই আসল গ্রিন অফিস।

সেই অফিসে এনার্জির ব্যবহার সম্ভাব্য কম পর্যায়ে থাকবে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হবে। কাগজের ব্যবহার একবারে কম হবে। কারণ কাগজ তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ (গাছ কাটা) ও কাগজ তৈরির প্রক্রিয়াতে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার হবে না বা একেবারেই কম হবে। এই তালিকা আরও দীর্ঘ করা যায়। সেখানে বারান্দার ফুলগাছ আবশ্যকীয় নয়।

একটা অন্যরকম উদাহরণ দিই। এই ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে সেটা পূরণ করে দেওয়ার জন্য সচেতন উদ্যোগ নেয় ২০১৭ সালে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অফিস হওয়ায় আকাশভ্রমণ তাদের কার্বন নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস। সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও অন্যান্য ব্যাপারগুলো তো আছেই। যাই হোক, তারা তাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হিসাব করে কুতুবদিয়ার একটি চরে গাছ লাগানোর প্রকল্প নেয় ২০১৭ সালে ‘কার্বন নিউট্রাল’ প্রকল্পের মাধ্যমে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বনবিভাগের সহায়তায় তারা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

এই প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবহৃত প্রতিটি ব্যাটারি (তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামে সাউন্ড সিস্টেমের জন্য প্রচুর ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়), প্রতিষ্ঠানটির হেড অফিস যে দেশে সেখানে পাঠিয়ে দেয় রিসাইকেল করার জন্য। কারণ বাংলাদেশে ব্যাটারি রিসাইকেল করার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা হাতের কাছে নেই। প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার এটা একটা উদাহরণ হতে পারে।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত শুক্রবার কার্বন নিঃসরণ কমানো ও জলবায়ু তহবিল সম্মেলনের এই দুটো প্রতিশ্রুতির ব্যাপারেই বাংলাদেশ আশাবাদী বলে জানিয়েছেন। আমরা আশাবাদী থাকতে চাই।

এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রতিবছর আমরা আমাদের জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই জলবায়ু সহনশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যয় করি।’

সেই ব্যয়ের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ফলাফল আমাদের ঘরে তুলতে হবে।

তাপস বড়ুয়া, প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ

 

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

Loan default now part of business model

Defaulting on loans is progressively becoming part of the business model to stay competitive, said Rehman Sobhan, chairman of the Centre for Policy Dialogue.

4h ago