এফবিসিসিআই কি পুতুল সংগঠনে পরিণত হচ্ছে?

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়াই বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পরিচালকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাছাই করা হয় নেতৃত্ব। এসব নেতাদের বেশিরভাগই আবার সরকার সমর্থিত। ফলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়াই বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পরিচালকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাছাই করা হয় নেতৃত্ব। এসব নেতাদের বেশিরভাগই আবার সরকার সমর্থিত। ফলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই-এর কয়েকজন সাবেক পরিচালক ও সভাপতি পদপ্রার্থী জানান, গত এক দশক ধরে এফবিসিসিআই-এর পরিচালকরা অসম্পূর্ণ নির্বাচন বা তাদের পছন্দ মতো নতুন নেতা বাছাই করে আসছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, গত কয়েক বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের ভুয়া ভোটার এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করছে।

ফেডারেশেনের বিদায়ী সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিমও সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচালকদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সভাপতি হয়েছিলেন।

এবারও একইভাবে করা হয়েছে নেতা নির্বাচন।

এফবিসিসিআই-এর নির্বাচন বোর্ডের একজন সদস্য জানান, আগামী ৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন থেকে চার জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় ৪৬ জন পরিচালকের সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

ফলে নির্বাচন বোর্ড ৪৬ জন প্রার্থীকেই বিজয়ী ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ১৬টি অ্যাসোসিয়েশন এবং ১৬টি চেম্বার থেকে মনোনীত ৩২ জন পরিচালক ২০২১-২৩ সালের জন্য এফবিসিসিআই বোর্ডে যোগ দেবেন।

সোমবার নির্বাচন বোর্ডের চূড়ান্ত পর্যালোচনায় বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিনের প্যানেল থেকে সব পরিচালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায়, সম্ভবত তিনিই হতে যাচ্ছেন নতুন সভাপতি।

চেম্বার গ্রুপ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় শেখ ফজলে ফাহিমের আগের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনও একইভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এছাড়া আবদুল মাতলুব আহমদ, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, এ কে আজাদ ও আনিসুল হক সকলেই সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই ফেডারেশনের শীর্ষপদে আসীন হয়েছিলেন।

এফবিসিসিআই-এর একজন সাবেক সভাপতি পদপ্রার্থী বলেন, ‘সরকার সমর্থিত লোকজনরাই সব সময় এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে আসেন।’

‘এর ফলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমঝোতা করতে ব্যর্থ হচ্ছে এফবিসিসিআই।’

এফবিসিসিআই সরকারের একটি শাখায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে কারণে এটি সরকারের ব্যবসাবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সব সময় সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।’

‘যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত না হওয়ায় দুর্বল নেতৃত্বের কারণে এফবিসিসিআই তার যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে।’

এই ব্যবসায়ী আরও জানান, ভারতে জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী ফেডারেশন খুব শক্তিশালী। অনেক ক্ষেত্রে, ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বারস অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বিরোধিতা করলে সরকারের সিদ্ধান্তও বদলে যায়।

তুরস্কেও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী ফেডারেশনও খুব শক্তিশালী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই উদাহরণগুলো থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।’

এছাড়া ফেডারেশনে ভোট বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে এফবিসিসিআইয়ের এক সাবেক পরিচালক বলেন, ‘এ বছরও নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য কিছু ভোটারকে টাকা দেওয়া হয়েছে।’ (দ্য ডেইলি স্টার এই অভিযোগটি যাচাই করেনি)

এফবিসিসিআই-এর সাবেক এই পরিচালক আরও বলেন, ‘এফবিসিসিআই জাতীয় সংগঠন হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ বেশিরভাগ সভাপতি, সহসভাপতি এবং পরিচালকরা এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা সরকারের প্রভাবশালী কেউ হওয়ার জন্য এখানে আসেন।’

পরিচালকের সংখ্যা ৮০ জন করার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে সাবেক এই পরিচালক বলেন, ‘এটি এখন আর কোনো স্বাধীন সংগঠন নয়।’

এক দশক আগেও পরিচালকের সংখ্যা ছিল ২৫ জন। গত কয়েক বছরে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ জনে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাড়ানো পদগুলো অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা হয়। কারণ অনেক ব্যবসায়ী সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে এফবিসিসিআইয়ের ঘাটে নোঙ্গর বাঁধতে চান।’

তিনি বলেন, ‘এফবিসিসিআই পরিচালকদের সংখ্যা বাড়লেও, এর মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।’

প্রায় ৪০০টি অ্যাসোসিয়েশন এবং ৮৬টি চেম্বারের প্রতিনিধিরা এফবিসিসিআই নির্বাচনের ভোটার।

তিনি বলেন, ‘এফবিসিসিআই যাতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে পারে, সেজন্য সংগঠনটি পুনর্গঠন করতে এবং প্রভাবশালীদের থাবা থেকে একে রক্ষা করতে একটি কমিশন গঠন করা উচিত।’

এছাড়া তিনি বলেন, ‘ফেডারেশনে গতিশীলতা আনার জন্য এফবিসিসিআইয়ের উচিত স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে সরাসরি সদস্যপদ দেওয়া।’

নির্বাচন বোর্ডের সদস্য মো. শামসুল আলম জানান, ৫ মে তার বোর্ডের পরিচালকদের নাম ঘোষণা করার কথা ছিল।

তিনি আরও জানান, চেম্বার গ্রুপের প্রায় ৪৮৮ জন এবং অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের এক হাজার ৯৩১ জন ভোটার এ বছর নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। ভোটাররা ৮৬টি চেম্বার এবং ৩৮৯টি অ্যাসোসিয়েশন থেকে এসেছেন। ৮৬টি চেম্বারের মধ্যে ৭২টি ‘এ’ গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত, যাদের প্রত্যেকের ছয় জন ভোটার। এছাড়া ১৪টি ‘বি’ গ্রেডের চেম্বার, যাদের প্রত্যেকের চার জন করে ভোটার রয়েছে।

৩৮৯টি অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে চারটি ‘বি’ গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত, যাদের প্রত্যেকের তিনটি করে ভোট রয়েছে। বাকি অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রত্যেকের পাঁচটি করে ভোট রয়েছে।

শামসুল আলম জানান, কোভিড-১৯-এর কারণে অনেকে ঢাকায় ভোট দিতে আসতে পারবেন না বলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালকদের মনোনীত করা হয়েছে।

Comments

The Daily Star  | English
Awami League's peace rally

Relatives in UZ Polls: AL chief’s directive for MPs largely unheeded

Awami League lawmakers’ urge to tighten their grip on the grassroots seems to be prevailing over the party president’s directive to have their family members and close relatives withdraw from the upazila parishad polls.

4h ago