মুক্তিযুদ্ধ

১৭ মে ১৯৭১: কাঠিপাড়া ও শিবচর গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৭ মে ছিল ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন সামাজিক কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী ও সমস্যা সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। ভারতের দৈনিক সংবাদপত্র দ্য স্টেটসম্যান ইন্দিরা গান্ধীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল "ভুল সময়ে কোনো স্বীকৃতি নয়।"

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৭ মে ছিল ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন সামাজিক কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তানের  শরণার্থী ও সমস্যা সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। ভারতের দৈনিক সংবাদপত্র দ্য স্টেটসম্যান ইন্দিরা গান্ধীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল "ভুল সময়ে কোনো স্বীকৃতি নয়।" 

কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিচেল শার্প দেশটির পার্লামেন্টে বাংলাদেশের শরণার্থী ও মানবিক বিপর্যয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাপের কথা জানান। পূর্ব জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটো উইনজার বার্লিনে বাংলাদেশের শরণার্থীদের বিষয়ে ভারতকে পূর্ব জার্মানির সহায়তার কথা জানান। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর টিক্কা খান উপসামরিক আইন প্রশাসকদের ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার দেন। ঢাকায় এদিন শান্তি কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘শান্তি ও সংহতি কমিটি’ নামকরণ করা হয়। ঝালকাঠির কাঠিপাড়া ও মাদারীপুরের শিবচরে পৈশাচিক গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি হানাদারেরা। দেশের বহু জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের বিবৃতি

১৭ মে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের প্রতিনিধিদলের সদস্য টমাস জ্যামিসন দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারত সরকার শরণার্থীদের জন্য ৬ মাসের সাহায্য চেয়েছে। তারা আশা করছে ৬ মাসের মধ্যেই শরণার্থীরা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন।

অন্যদিকে ভারত সরকার জাতিসংঘের কাছে আপতকালীন এই ৬ মাসের জন্য ২০০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানায়। এর আগে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভারতের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ভারতের কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন মন্ত্রী রঘুনাথ কেসব খাদিলকার ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এসময় তিনি বলেন, "৬ মাসের মধ্যেই শরণার্থী সমস্যা সমাধান হবে। ভারত ৬ মাসের সাহায্য চেয়েছে।"

জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন সামাজিক কমিটিকে বলেন, ভারতে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আগমনের ফলে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা নয়, একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

১৭ মে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিচেল শার্প দেশটির পার্লামেন্টে দেয়া এক বক্তব্যে ভারতের হাইকমিশনার অশোক লালকৃষ্ণের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, "পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আগত সকল শরণার্থীকে জরুরিভিত্তিতে সেবা প্রদানের জন্য কানাডা প্রস্তুত রয়েছে একথা আমি রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছি।"

১৭ মে পূর্ব জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটো উইনজার বার্লিনে এক সভায় বলেন, "ভারতের রাষ্ট্রদূত জি সি আজমানি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আগত  শরণার্থীদের জন্য সরকারের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিল। আমি তাকে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস প্রদান করেছি শরণার্থীদের সব রকম মানবিক সাহায্য দেয়া হবে।"

১৭ মে রেডক্রসের প্রতিনিধি ফারে ওটারসন সাংবাদিকদের জানান যুদ্ধে আহত ও অসুস্থ শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য নরওয়ে থেকে শিগগির চিকিৎসক ও নার্সদের একটি দল পশ্চিমবঙ্গে আসবে।

ভারতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগ 

 ১৭ মে লক্ষ্ণৌতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য সংখ্যালঘুদের একটি সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বলা হয় ৮ জুন এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এদিন কে ডি মালব্যকে সভাপতি ও নব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাফরকে সাধারণ সম্পাদক করে সম্মেলনের জন্য একটি কমিটি নির্দিষ্ট করা হয়।

১৭ মে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যও সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের ত্রাণ সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একটি চাহিদাপত্র প্রস্তুত করা হয়। অন্যদিকে ত্রাণ সহায়তার সামগ্রী যেন দ্রুত ছাড় করা হয় সেজন্য তিন জন মন্ত্রী দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে আগের দিন কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে শরণার্থীদের অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।

দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন

ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা ‘ভুল সময়ে কোন স্বীকৃতি নয়’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, ‘বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার মতো বহুল আলোচিত বিষয়টি এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকার সবচেয়ে জরুরি বিষয় হিসেবে দেখছে না। প্রধান বিবেচনার ব্যাপার হলো কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উক্ত স্বীকৃতি বাংলাদেশের মানুষকে এই মুহূর্তে কোনো সাহায্য করবে কিনা।’

ঢাকায় এদিন

১৭ মে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর টিক্কা খান উপসামরিক আইন প্রশাসকদের পুলিশ অফিসার বা ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার প্রদান করেন। এই ক্ষমতাবলে তারা যে কোনো ব্যক্তিকে আটক করে হাজতে প্রেরণ, সিভিল প্রিজনে প্রেরণ ও গ্রেপ্তাসহ অপরাধের তদন্ত করতে পারবে। এই কুখ্যাত আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টসহ কোনো আদালতে কেউ আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না।

১৭ মে মোহাম্মদপুরে শান্তি কমিটির নেতা আবুল কাশেম এমএনএ'র বাড়িতে শান্তি কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর জেনারেল (অব.) ওমরাহ খান। সভায় বক্তারা দেশদ্রোহীদের (মুক্তিযোদ্ধা) বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়।

১৬ মে শান্তি কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘শান্তি ও সংহতি কমিটি’ করার পর ১৭ মে। দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী খান, সুলেমান ওসমানী, আনোয়ারুল হক, সাবির আলী, নইম মালিক এবং এ এইচ মালিককে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির নির্বাহী পরিষদে সংযোজন করা হয়। দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী খান, সৈয়দ খাজা খয়রুদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক গোলাম আজম, আফতাব আহমদ খান, আবুল কাশেম, মো. সাব্বির আলী, জহুর আহমদ, মেজর (অব.) আফসার উদ্দিন, এ কে রফিকুল হাসান, মোজাফফর আহমদ, এ এ মল্লিক, এস এম জিয়াউল হক, আফতাব আহমদ সিদ্দিকী, এ এইচ মালিক, মো. নুরুল আইন, আনকার মালিক, মকবুল ইকবাল, এস এইচ হাসান, এ এন মালিক, আয়েশারুল হক, আখতার হামিদ খান, হাসান রাজা, সুলমান ওসমানী ও তোহা বিন হাবিবকে নিয়ে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট প্রাদেশিক শান্তি কমিটির সাধারণ পরিষদ গঠন করা হয়।

পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ অনুপ্রবেশকারী ও দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধা) রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ যাতে আর প্রসার লাভ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারের সাথে সহযোগিতা করার জন্য জনগণের প্রতি নির্দেশ দেয়।

ঢাকার বাইরে গণহত্যা ও প্রতিরোধযুদ্ধ

কাঠিপাড়া গণহত্যা

১৭ মে পাকিস্তানি হানাদারেরা নারিকেলবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার আবদুল খালেক মাস্টারের সহযোগিতায় ঝালকাঠির রাজাপুরের কাঠিপাড়ায় আসে। হানাদারদের আসার খবর পেয়ে কাঠিপাড়া, নারিকেল বাড়িয়া ও নৈকাঠি গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী শতাধিক নিরীহ মানুষ প্রাণের ভয়ে কাঠিপাড়া ঠাকুরবাড়ীর ঘন জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। নৈকাঠি ইউনিয়নের সাতুরিয়া গ্রামের চেয়ারম্যান হামেদ জমাদার ও তার দুই ছেলে বেলায়েত জমাদার ও মিল্লাত জমাদ্দার এসময় হানাদারদের খবর দিলে হানাদারেরা জঙ্গল ঘেরাও করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পুরুষদের হত্যা করে। পুরুষদের হত্যা করে তারা নারীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। এই গণহত্যায় শহীদ হন প্রায় অর্ধশত মানুষ।

শিবচর গণহত্যা

১৭ মে বেলা ১১টার দিকে ৪০-৪২ জনের পাকিস্তানি হানাদারদের একটি দল কয়েকটিভাগে বিভক্ত হয়ে মাদারীপুর ক্যাম্প থেকে লঞ্চে করে শিবচরের উৎরাইলে নামে। এরপর স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় হানাদারেরা শিবচরের চর শ্যামাইল হয়ে গুলালতা, বাহেরচর, উমেদপুর গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। পুরুষদের ব্রাশফায়ারে হত্যা করে, নারীদের ধর্ষণ করে। সবশেষে শতাধিক বাড়িতে লুটপাট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই গণহত্যায় বিশের বেশি মানুষ শহীদ হন।

১৭ মে মুক্তিবাহিনীর ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ থানা আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের এই অভিযানে ২ জন পুলিশ ও ৯ জন রাজাকার নিহত হয় এবং বহু অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা উদ্ধার করে।

১৭ মে রাজশাহী অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর হামলায় তিন জন হানাদার সেনা নিহত হয়।

১৭ মে  বরিশালে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের উপর অতর্কিত হামলা চালালে পাকিস্তানি হানাদারদের এক ক্যাপ্টেন ও পাঁচ সেনা নিহত হয়।

১৬ এবং ১৭ মে রংপুরে ১১টি রেলব্রিজ ধ্বংস করে মুক্তিবাহিনী। মূলত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেন সড়কপথে সরাসরি এগুতে না পারে এই জন্যই এই সমস্ত ব্রিজ ধ্বংস করা হয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস সেক্টর ২, ৫, ৭ম খণ্ড

আনন্দবাজার পত্রিকা ১৮ মে ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান, ১৮ মে ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ১৮ মে ১৯৭১

দ্য স্টেটসম্যান, ১৭ মে ১৯৭১

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

আরও পড়ুন-

১৬ মে ১৯৭১: যুগীশো, পালশা ও হাসামদিয়ায় গণহত্যা

১৫ মে ১৯৭১: পাথরঘাটা ও কেতনার বিল গণহত্যা

১৪ মে ১৯৭১: বাড়িয়া ও নড়িয়ায় গণহত্যা

১৩ মে ১৯৭১: ডেমরা ও সাতানিখিলে নির্মম গণহত্যা

১২ মে ১৯৭১: সাতবাড়িয়া গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক তৎপরতাময় দিন

৩ মে ১৯৭১: টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন- ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী

১ মে ১৯৭১: ‘বাংলাদেশ এখন একটি চিরন্তন সত্য ও বাস্তবতা’ ভারতীয় শিল্পমন্ত্রী

Comments

The Daily Star  | English
Shipping cost hike for Red Sea Crisis

Shipping cost keeps upward trend as Red Sea Crisis lingers

Shafiur Rahman, regional operations manager of G-Star in Bangladesh, needs to send 6,146 pieces of denim trousers weighing 4,404 kilogrammes from a Gazipur-based garment factory to Amsterdam of the Netherlands.

4h ago