মুক্তিযুদ্ধ

২৪ মে ১৯৭১: ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৪ মে ঘটনাবহুল দিন। এদিন ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশের বিষয়ে বক্তব্য বিবৃতি দেওয়া হয়, একাধারে বিতর্কও হয় বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা নিয়ে। লোকসভায় এদিন সদস্যদের পাশাপাশি বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। এদিন কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও সহযোগিতার ব্যাপারে আশ্বাস দেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৪ মে ঘটনাবহুল দিন। এদিন ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশের বিষয়ে বক্তব্য বিবৃতি দেওয়া হয়, একাধারে বিতর্কও হয় বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা নিয়ে। লোকসভায় এদিন সদস্যদের পাশাপাশি বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। এদিন কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও সহযোগিতার ব্যাপারে আশ্বাস দেন।

ফণীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বে এদিন জাতীয় পরিষদের সদস্য নূরজাহান মুর্শিদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ তিন সদস্যের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল লোকসভার স্পিকার জি এম ধীলনের সঙ্গে দিল্লিতে দেখা করেন। এদিন ভারতীয় রেল কর্মচারীদের ইউনিয়ন ঘোষণা দেয়,  শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ভারতের রেল কর্মচারীরা এক দিনের সাহায্য দেবেন। এই অর্থের পরিমাণ ৭০ লাখ টাকা। এদিন ঝালকাঠির দৈহারীতে পাকিস্তানি হানাদারদের  হাতে শহীদ হন ১৭ জন নিরীহ মানুষ। দেশের বহু জায়গায় এদিন গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদারেরা। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে দেশের বহু জায়গায় যুদ্ধ হয়েছিল এদিন।

লোকসভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক

২৪ মে ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশের প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্ক হয়। এই বিতর্কের বিষয় ছিল মূলত শরণার্থী সমস্যা, পাকিস্তানের উপর চাপ প্রয়োগসহ নানা বিষয়।

লোকসভার অধিবেশনে  ইন্দিরা গান্ধী বলেন, "পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা তাদের কার্যকলাপে প্রতিবেশীদের প্রতি বন্ধুসুলভ মনোভাব এবং শান্তি ও মানবতার মৌল নীতিগুলো ধ্বংস করেছে। সমরতন্ত্র বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান। এ ব্যাপারে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব আছে। রাজনৈতিক সমাধানে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তারা যথাযথভাবে শক্তি প্রয়োগ করলেই কেবল উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি আসা সম্ভব। বিশ্ব যদি এই সমস্যার সমাধানে কিছু না করে, তাহলে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য ভারতই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তিনি আরও বলেন, আপ্রাণ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভারত সব শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে পারেনি। অনেকেই এখনো খোলা জায়গায় আছে। প্রতিদিন ৬০ হাজার করে শরণার্থী সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আসছে। এরা নানা ধর্ম, স্তরের ও বয়সের লোক। অনেকেই আহত। বাংলাদেশে এমন অবস্থা ফিরে আসা দরকার, যাতে সব শরণার্থী নিজ নিজ বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে পারে। এ জন্য তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া দরকার। এ অবস্থা সৃষ্টি করতে না পারলে উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি আসবে না। ভারতের ক্ষতি করে পাকিস্তানে এ সমস্যার সমাধান আসবে না।  পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এখন নিজেদের দুষ্কর্মের দায় ভারতের ওপর চাপাচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তান যাকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করেছে, তা ভারতেরও অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ নাগরিককে তাদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করার অধিকার কি পাকিস্তানের আছে? ভারতকে আরও অনেক বেশি বোঝা বহন করতে হতে পারে। এটি জাতীয় সমস্যা, কিন্তু মূল সমস্যাটি আন্তর্জাতিক। ভারত বিশ্ববিবেক জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের কাছেও আবেদন জানিয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধী এসময়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। এদিন একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং, পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী সুরেন্দ্রপাল সিংও লোকসভা সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

ঢাকায় ২৪ মে

২৪ মে জি এম খানের সভাপতিত্বে মগবাজারের দিলু রোডে শান্তি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় বলা হয়, “মুক্তিবাহিনী দেশের শান্তি বিনষ্ট করছে। ভারতের চর মুক্তিবাহিনীকে ধ্বংস করতে হলে আমাদের সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মক সাহায্য করতে হবে। শান্তিবাহিনী দেশের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সবরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে।” 

ভারতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এদিন

২৪ মে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ফণীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বে এদিন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নূরজাহান মুর্শিদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ তিন সদস্যের একটি  সংসদীয় প্রতিনিধিদল লোকসভার স্পিকার জি এম ধীলনের সঙ্গে দিল্লিতে দেখা করেন। এসময় তারা বাংলাদেশে শরণার্থী সমস্যা নিরসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। ভারত যে শরণার্থীদের অকাতরে সাহায্য করছে এবং ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশিদের সাহায্য করছে এজন্য বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে ভারতের অবদান স্মরণ করবে বলে জানান। একই সঙ্গে তারা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের জন্য লোকসভা স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান। লোকসভা স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের পর ফণীভূষণ মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ ও  বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি প্রদানের জন্য তারা দিল্লিতে এসেছিলেন। একই সঙ্গে তারা বলেন, 'বিশ্ববাসী আজ জানে বাংলাদেশে কী নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন নিপীড়ন চলছে। এই গণহত্যা সম্পর্কে ও শরণার্থীদের দুর্দশার  খবর আমরা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবো। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক আছে, আমরা সেখানেও আমাদের দাবি ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরবো।'

 মুক্তিযুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার আশ্বাস স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রীর

২৪ মে কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান বলেন, "মুক্তিযুদ্ধে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ  আহত হয়ে অকর্মণ্য হয়ে পড়েছেন, সরকার তাদের পুনবার্সনের ব্যবস্থা নিয়েছে।" এসময় তিনি দেশবাসীকে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এদিন

২৪ মে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তি, বৈশ্বিক স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে ও মুক্তিযুদ্ধের প্রচারণার কাজে লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেন। এইদিন তার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন  অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাঙালি গবেষক এনামুল হক।

দেশব্যাপী গণহত্যা, প্রতিরোধ যুদ্ধ ও বিবৃতি

২৪ মে সকালে পাকিস্তানি হানাদারেরা ঝালকাঠির দৈহারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে নির্মম গণহত্যা চালায়। এ সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে চালানো গুলিতে শহীদ হন ১৭ জন নিরীহ মানুষ। অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদারেরা পার্শ্ববর্তী খাড়াবাগ গ্রামের অঞ্জলি রাণীকে হাত পা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।

২৪ মে কর্নেল এম এ জি ওসমানী কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর সফর করেন। এসময় তিনি বিভিন্ন ফ্রন্টের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন, সাধারণ  মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দেন। তিনি একই সঙ্গে বলেন, 'দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গেই আছে, আমরা জয়ী হবোই। কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।'

২৪ মে সিলেটে মুক্তিবাহিনীর সুতারকান্দি চেকপোস্টে হানাদার বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় কম হলেও চতুর্দিক থেকে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনী সংগঠিত হয়ে ব্যাপক হামলা চালায়, এদিকে মুক্তিবাহিনীর গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পিছু হটেন। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের ৩৯ সৈন্য নিহত হয় ও ২ জন হানাদার সৈন্য মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বেশ কজন আহত হন এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা পড়েন।

২৪ মে ভোলা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা  মোশাররফ হোসেন শাহজাহান আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেন। তিনি এই সময়ে তার বিবৃতিতে বলেন, 'আমি সেই ব্যক্তি যার পাকিস্তানের আদর্শ ও ঐক্যের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রয়েছে। আর আমি কোনো দিনই ছয় দফার প্রতি সমর্থন প্রদান করিনি।

২৪ মে ক্যাপ্টেন অলির নেতৃত্বে এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা চট্টগ্রাম সেনাবাহিনীর ঘাঁটি চাঁদগাজী আক্রমণ করেন। মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদারেরা  চাঁদগাজী ছাড়তে বাধ্য হয়।

তথ্যসূত্র –

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম, নবম, দ্বাদশ খণ্ড।

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ২৫ মে ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান, ২৫ মে ১৯৭১

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ মে ১৯৭১

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected] 

Comments

The Daily Star  | English
fire incident in dhaka bailey road

Fire Safety in High-Rise: Owners exploit legal loopholes

Many building owners do not comply with fire safety regulations, taking advantage of conflicting legal definitions of high-rise buildings, according to urban experts.

3h ago