অর্থনীতি

অবশেষে প্রণোদনা তহবিলের দেখা পেলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

শুরুতে অনীহা প্রকাশ করলেও অবশেষে ব্যাংকগুলো মহামারিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে।
cmsme-entrepreneurs-1.jpg
স্টার ফাইল ছবি

শুরুতে অনীহা প্রকাশ করলেও অবশেষে ব্যাংকগুলো মহামারিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে।

এ মুহূর্তে এই খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ অন্যান্য খাত, যেমন: বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ঋণকেও ছাড়িয়ে গেছে। বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতে খুব দ্রুত ঋণ পেয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী সিএমএসএমই খাতের জন্য গত বছরের ১৩ এপ্রিলে ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে মার্চ পর্যন্ত ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ ৯১ হাজার ৪২৭টি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জাইদ বখত বলেন, ‘গণমাধ্যমে ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ে ঋণ বিতরণে ধীরগতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল।’

এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চাপ দেয়। প্রণোদনা তহবিল বিতরণের সময়সীমা বেশ কয়েকবার বাড়ানোর পর সর্বশেষ ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।

বখত বলেন, ‘ব্যাংকগুলো তৎপর হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’ অগ্রণী ব্যাংক তার বিতরণ লক্ষ্যমাত্রাকে ইতোমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে।

শুরুতে অনেক সিএমএসএমই প্রণোদনা প্যাকেজের তহবিল পাওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। এই প্যাকেজে সুদের হার ৯ শতাংশ, কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ায় তাদের জন্য সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে ৪ শতাংশ।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সিএমএসএমইকে কখনো ২৫ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হারে ঋণ নিতে হয়।

তবে, পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে এগিয়ে আসে, জানান বখত।

অপরদিকে, ব্যাংকগুলো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঘোষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে ঋণ বিতরণের রাশ টেনে ধরেছে। মার্চ পর্যন্ত এ ধরনের ৩ হাজার ১১৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্যাকেজের ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

বখত জানান, গতি কমে আসার পেছনে কারণ হচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে।

‘প্যাকেজটির ঘোষণার পর বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের নির্ভরযোগ্য বড় ঋণগ্রহীতাদের তহবিল পাওয়া নিশ্চিত করেছিল। তবে, এখন তারা আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে’, বলেন বখত।

সরকারি ব্যাংকগুলো অবশ্য ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার করছে না। অগ্রণী ব্যাংক এই খাতের জন্যেও ইতোমধ্যে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে গেছে বলে জানান তিনি।

গত বছরের মার্চে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আঘাত হানার পর সরকার ২৩টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দেয়, যা দেশের জিডিপি’র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১১টি হচ্ছে ঋণভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ, যার মোট তহবিলের পরিমাণ ১ লাখ ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

মার্চ পর্যন্ত এ প্রকল্পের ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।

১১টি প্যাকেজের মধ্যে সাতটি প্যাকেজ ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে ৮৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা জড়িত আছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি প্যাকেজের মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হতে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, যেহেতু খুব শিগগির মহামারি শেষ হচ্ছে না, সরকার এই প্যাকেজগুলোর মেয়াদকে আরও দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে ভাবছে।

তিনি জানান, সরকার খুব সম্ভবত ৩ জুনে ঘোষণা হতে যাওয়া বাজেটে ঋণের ক্ষেত্রে সুদের ওপর ভর্তুকি দেওয়ার জন্য ১২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখবে।

তবে, অনেকেই এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতার বাইরে ছিলেন, বিশেষ করে যারা অনানুষ্ঠানিক কাজের সঙ্গে জড়িত। উচ্চপর্যায়ের সংক্রামক ভাইরাসটির সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যাতায়াতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে এই খাতের অনেক মানুষের জীবন জীবিকার ওপর বড় ধরণের হুমকি দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাটাবেইজের অভাবে তারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আসতে পারেননি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান গত রোববার একটি ওয়েবিনারে বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য মানুষদের চিহ্নিত করার জটিলতা।’

তবে, তিনি জানান, সরকার স্থানীয় প্রতিনিধিদের সহায়তায় যাদের খুব জরুরিভাবে সাহায্য প্রয়োজন, তাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাংকে সিএমএসএমইদের কাছে ঋণ বিতরণের জন্য একটি আলাদা বুথের ব্যবস্থা করা উচিত, কারণ তারা ঋণ নেওয়ার জটিল প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমইদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের লাভ করার কথা মাথায় রাখা উচিত নয়।’ তিনি অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

এক্ষেত্রে কিছু ঋণ, খেলাপি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, কিন্তু সরকারকে এটুকু ঝুঁকি অবশ্যই নিতে হবে।

‘অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক মানুষকে কাজে নিয়োগ দেয় এবং তারা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। তারা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে এবং তাদের কোনো বলিষ্ঠ কণ্ঠও নেই’, বলেন রায়হান।

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments

The Daily Star  | English
Dhaka Airport Third Terminal: 3rd terminal to open partially in October

HSIA’s terminal-3 to open in Oct

The much anticipated third terminal of the Dhaka airport is likely to be fully ready for use in October, enhancing the passenger and cargo handling capacity.

6h ago