মুক্তিযুদ্ধ

২৯ মে ১৯৭১: বরগুনা কারাগারে গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৯ মে ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সাক্ষাৎকার দেন। সেই সাক্ষাৎকারে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে যদি পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের মাটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা তো দূরে থাক কোনো প্রকারের বৈঠকের কথাও আমরা কল্পনা করতে পারি না। একমাত্র এখন কেবল বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত ঘোষণাই বাকি আছে।
বরগুনা গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৯ মে ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সাক্ষাৎকার দেন। সেই সাক্ষাৎকারে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে যদি পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের মাটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা তো দূরে থাক কোনো প্রকারের বৈঠকের কথাও আমরা কল্পনা করতে পারি না। একমাত্র এখন কেবল বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত ঘোষণাই বাকি আছে।

২৯ মে প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সকে পাঠানো একটি চিঠিতে বলেন, ইতিমধ্যে ৩৫ লাখের বেশি শরণার্থী পূর্ব বাংলা থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আমার মনে হচ্ছে  পুরো ভারতীয় উপমহাদেশই এখন ভুলবশত যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে। তিনি এই পর্যায়ে এসেও কেন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র নিন্দা জানান।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য

২৯ মে করাচিতে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো দলের এক সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে বলেন, 'এখন পিপলস পার্টিই পাকিস্তানের সবচেয়ে বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব এখন পিপিপির উপরেই বর্তায়। সুতরাং পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য পিপিপি এগিয়ে আসবে। আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ দল। জনগণ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এখন সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি। অথচ ভারত নির্লজ্জভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। ভারতীয় আক্রমণ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত। নিরীহ পাকিস্তানিরা এখন ভারতীয় বাহিনীদের হাতে মার খাচ্ছে। ভারত অযাচিতভাবে যুদ্ধে জড়াতে চাইছে। ওরা তীব্রভাবে চাইছে পাকিস্তানের বিভক্তি হোক। পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো করাই ভারতীয় ষড়যন্ত্রের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। পাকিস্তান রক্ষা করা সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। পাকিস্তান রক্ষার জন্য আমাদের যতোখানি ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আমরা তা করবো।'

২৯ মে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী মার্কিন সিনেটরদের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাক্ষাৎকারের বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি আছেন।

ঢাকায় এদিন

২৯ মে ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন ঘোষণা করে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে যেসব নাগরিক বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করেছেন তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে আসতে আহ্বান জানানো হয়। পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্রকে দিয়ে বলানো এই বিবৃতিতে বলা হয়, যারা ভারতে চলে গেছেন, নিজ নিজ আবাস ভূমিতে ফিরে যাবেন তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।

২৯ মে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নতুন করে পুনর্গঠনে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটিতে চেয়ারম্যান করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনকে। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন--জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরোর পরিচালক ড. হাসানুজ্জামান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল বারী, অধ্যাপক ড. সাইফউদ্দিন জোয়ারদার, ড. মকবুল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহর আলী, এ এফ এম আবদুর রহমান।

ভারতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এদিন

২৯ মে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং দিল্লিতে বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে এখনো অব্দি পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে চলমান গণহত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, বাস্তুহারা শরণার্থীদের বিষয়কে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দিচ্ছে। বিন্দুমাত্র মানবতা অবশিষ্ট থাকলে এই কথা বলা সম্ভব হতো না।

২৯ মে ভারত সরকার থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ পর্যন্ত ভারতে পূর্ব বাংলা থেকে আগত শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ, ৮৮ হাজার ৩৫০ জনে।

২৯ মে কলকাতায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পূরী ঠাকুর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের  কূটনৈতিক মিশন প্রধান হোসেন আলীকে মুক্তিযোদ্ধা তহবিল ও শরণার্থীদের জন্য এক লাখ টাকার অর্থ সহায়তা প্রদান করেন।

দেশজুড়ে গণহত্যা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ

বরগুনা কারাগারে গণহত্যা

২৯ মে পটুয়াখালীতে জেলা সামরিক আইন প্রশাসকের নির্দেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর একটি দল বরগুনা জেলখানায় বন্দিদের উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শহীদ হন ৫৫ জন বন্দি।

এর আগে ২৬ এপ্রিল  হানাদারেরা পটুয়াখালী জেলা শহর দখল করে। ৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর রাজা নাদির পারভেজ খানকে পটুয়াখালী জেলার সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ১৪ মে হানাদার বাহিনী একটি গানবোটে বরগুনায় বরগুনার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।  ১৫ মে তারা পাথরঘাটার কিছু বাসিন্দাকে বন্দি করে বরগুনায় নিয়ে আসে। এসময় বন্দীদের কয়েকজনকে বিশখালীর তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর বাকি বন্দীরি সবাই বরগুনা মহকুমা কারাগারে বন্দি ছিলেন। পাথরঘাটার হিন্দু ব্যবসায়ী লক্ষ্মণ দাস এবং তার তিন ছেলেকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছিলো। এরপর হানাদারেরা পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী বরগুনা ত্যাগ করার পরে, পিস কমিটির সদস্যরা ঘোষণা করলো এখন হিন্দুরা শহরে ফিরে আসতে পারে। শান্তি কমিটির কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরে অনেক বাঙালি হিন্দু বরগুনায় তাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। যারা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন তারা তাদের অফিসে যোগ দিলেন, অন্যরা তাদের দোকান খুললেন। ২৮ মে পটুয়াখালী জেলা সামরিক আইন প্রশাসক মেজর নাদের পারভেজ বরগুনায় আসে এবং ২৯ মে বরগুনা জেলখানায় প্রহসনমূলক বিচারের ব্যবস্থা করে গণহত্যা শুরু করে। তখন জেলখানার উত্তর-পশ্চিম পাশে ছিল বরগুনা জেলা স্কুল। প্রচন্ড গুলির শব্দে শহরময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সবাই দিক-বিদিক ছুটোছুটি শুরু করে দেয়। শুরু হয়ে গেছে বরগুনা কারাগারে গণহত্যা। প্রথম দিন হানাদারদের চালানো গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন ৫৫ জন। পরের দিন আবারও ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল হানাদারেরা।

২৯ মে বরিশালের গৌরনদীর বাটরা বাজারে হেমায়েত বাহিনীর অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। গোপালগঞ্জের কোটালপাড়ার রাজপুরে হেমায়েত বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়।

২৯ মে মুক্তিবাহিনীর বড় একটি দল কুমিল্লার সদর থানার ভাটপাড়া এবং সিঙ্গারবিল এলাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের উপর অ্যামবুশ করেন। এই অ্যামবুশে হানাদারদের বেশ ক্ষতি হয়।

২৯ মে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল কুমিল্লার উত্তরে রঘুরামপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি টহলরত দলের উপর অ্যামবুশ করে। এ সময় হানাদারদের সেই  দলটির ব্যাপক ক্ষতি হয়।

২৯ মে মুক্তিবাহিনীর একটি দল শালদা নদীর পশ্চিম শিবপুর, বাজরা ও সাগরতলায় হানাদার বাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। এ অতর্কিত হামলায় হানাদার বাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের মেজর দুররানি নিহত হন, সঙ্গে বেশ কয়েকজন হানাদার সেনা হতাহত হয়। এসময় হানাদার বাহিনীর বাঙ্কার গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

২৯ মে মুক্তিবাহিনীর একটি দল লাকসামে রেল স্টেশনে হামলা চালায়।

২৯ মে নওগাঁর হরতকীডাঙ্গায় পাকিস্তানি হানাদারদের উপরে অ্যামবুশ করে মুক্তিবাহিনীর একটি দল। মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের ক্ষতি হয়।

২৯ মে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া সড়কে করতোয়া নদীর সেতু ভেঙে দিয়ে যাওয়া হানাদারবাহিনির উপর অমরখানায় হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিলো তেঁতুলিয়াকে সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত রাখা।

২৯ মে চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পেট্রলপাম্পে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে।

২৯ মে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শান্তি কমিটির শাখা গঠিত হয়। নোয়াখালী সদরে আহ্বায়ক করা হয় গোলাম মোস্তফাকে, চাঁদপুরে এম এ আলম, হাজীগঞ্জে আনোয়ার হোসেন, কচুয়া থানায় আবদুল মজিদ ও মতলব থানায় ড. আব্দুল হককে আহ্বায়ক করে শান্তি কমিটির শাখা গঠন করা হয়।

তথ্যসূত্র-

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র; ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ খণ্ড

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৩০ মে ও ৩১ মে ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান, ৩০ মে ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই, তিন

আহমাদ ইশতিয়াক

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Change Maker: A carpenter’s literary paradise

Right in the heart of Jhalakathi lies a library stocked with over 8,000 books of various genres -- history, culture, poetry, and more.

5h ago