সিলেটে ধারাবাহিক ভূমিকম্প: ছড়াচ্ছে গুজব, সচেতনতায় উদ্যোগ

সিলেটে গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চার দফা ভূমিকম্প ও তার আফটারশকের পর থেকেই একের পর এক গুজব ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গুজবের মাত্রা বেড়ে যায় রবিবার ভোররাত সাড়ে ৪টায় আরো একদফা মৃদু ভূমিকম্পে।
ভূমিকম্পবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ডাউকি ফল্ট লাইন এবং চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফোল্ড বেল্ট এর ম্যাপ

সিলেটে গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চার দফা ভূমিকম্প ও তার আফটারশকের পর থেকেই একের পর এক গুজব ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গুজবের মাত্রা বেড়ে যায় রবিবার ভোররাত সাড়ে ৪টায় আরো একদফা মৃদু ভূমিকম্পে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গুজবের সাথে যোগ হয় শেভরন বাংলাদেশের মাইনিংয়ের কারণে ভূমিকম্প হচ্ছে।

এ বিষয়ে শেভরন বাংলাদেশের কমিউনিকেশন্স ম্যানেজার শাইখ জাহিদুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে শেভরণের কোনো কর্মকাণ্ডই এসব ভূমিকম্পের জন্য দায়ী নয়।‘

এদিকে সিলেট নগরীর পনিটুলায় পাশাপাশি দুটি ছয়তলা ভবন ভূমিকম্পে হেলে পড়ার কথা জানার পর শনিবার রাতেই তা পরিদর্শনে যান সিটি মেয়রসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এই ভবন দুটি অনেক আগেই হেলে পড়েছে এবং এই ভূমিকম্পের পরে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। শনিবার দুপুর থেকেই নানা গুজবের খবর আসছে এবং তার সবই মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন’।

শনিবার সিলেট শহরের মানুষ ছাড়া অন্য কোনো জেলা বা সিলেটেরই অন্য কোনো উপজেলা থেকে এসব ভূকম্পন অনুভূত না হওয়ায় এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নিশ্চিতভাবে জানাতে না পারায় গুজব আরো বেশি ছড়াতে থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমেদ চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটি ভূমিকম্পের সঠিক কেন্দ্রস্থল জানতে অন্তত তিনটি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এর তথ্য ধারণ করতে হয়, কিন্তু এসকল ভূমিকম্প মৃদু ও অগভীর হওয়ায় কেবলমাত্র সিলেট কেন্দ্র থেকেই তার তথ্য ধারণ করা গেছে যাতে এর সম্ভাব্য কেন্দ্রস্থল ডাউকি ফল্ট লাইনের দিকেই নির্দেশ করছে।‘

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও ঢাবি আর্থ অবজারভেটরির পরিচালক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে জানান যে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল জৈন্তা উপজেলার সারি নদীর উজানের পাহাড়ি এলাকায় বলে প্রাথমিক তথ্য প্রমাণে বোঝা গেছে এবং এই এলাকা ডাউকি ফল্ট লাইনের পূর্ব প্রান্ত।

ডাউকি ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখা দেশের সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তর সীমান্তে ৩০০ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি রেখা যা শিলং মালভূমির দক্ষিণ প্রান্ত। এ ফল্ট লাইনেই ১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হয় যার ফলে সিলেট শহর, ভারতের শিলং ও গুয়াহাটি শহরের প্রায় সব ভবন ধসে পড়ে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের বলেন, ‘এই ফল্ট লাইনে যে শক্তি জমা আছে তা যে কোনো সময় ৭.৫ থেকে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। ছোট ছোট এসব ভূমিকম্প তার পূর্বাভাসও হতে পারে আবার এ ধরনের ধারাবাহিক ছোট কম্পনের মাধ্যমে ফল্ট লাইন তার শক্তি বের করে দিতে পারে যা অবশ্যই ভালো লক্ষণ।‘

তবে বিজ্ঞান এখনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানাতে সক্ষম হয়নি জানিয়ে তিনি সচেতনতা বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিতে আহবান জানান।

এদিকে ভূমিকম্পের পর শনিবার বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তরকে সাথে নিয়ে জরুরি বৈঠক আহবান করে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করে।

আজ নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী নগরীর ২২টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ।

সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল আলিম শাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অভিযানের শুরুতেই চারটি শপিং কমপ্লেক্স—মধুবন মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, রাজা ম্যানশন ও সিটি সুপার মার্কেট—বন্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বাকি ভবনগুলোকে সতর্ক করা হচ্ছে।‘

এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশন ভূমিকম্প বিষয়ে প্রস্তুতির জন্য একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম গঠন করেছে এবং একটি হটলাইন নম্বর (০১৯১১২৪৯৬৯৯) সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে সিলেটের সব প্রশাসন, দপ্তর ও সেবা স্ংস্থা সমূহে নিজ নিজ কন্ট্রোল রুম খুলতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগামী ৭ দিনের জন্য সিলেট সিটি করপোরেশনসহ সব জরুরি সেবা সংস্থা ও সহযোগী সকল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থায় থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।'

আরও পড়ুন-

সিলেটে সাড়ে ৩ ঘণ্টায় ৪ বার ভূমিকম্প, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

তিন দফা ভূমিকম্পে কাঁপলো সিলেট

সিলেটে আবার মৃদু ভূমিকম্প

Comments

The Daily Star  | English

Loan default now part of business model

Defaulting on loans is progressively becoming part of the business model to stay competitive, said Rehman Sobhan, chairman of the Centre for Policy Dialogue.

5h ago