গেইল-ম্যাককালামের হাইপ ছাপিয়ে নায়ক মেহেদী-রশিদ

১৫৪ রানের মামুলি টার্গেট পেয়েও রংপুরের তারকা ভরপুর ব্যাটিং লাইপআপ করেছে ১৩৯ রান। গেইল-ম্যাককালামের ব্যাটিং দেখতে আসা দর্শকরা দেখেছেন আফগান লেগি রশিদ খান আর বাংলাদেশি তরুণ মেহেদী হাসানের স্পিন কারিকুরি।
ম্যাককালামকে আউট করা মেহেদীকে ঘিরে কুমিল্লার উল্লাস। ছবি: ফিরোজ আহমেদ

গ্যালারী ঠাসা দর্শকদের পয়সা বোধহয় বিফলেই গেল। ক্রিস গেইল তান্ডব তুলতে পারেননি, মুন্সিয়ানা দেখা যায়নি  ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের ব্যাটে, ১৫৪ রানের মামুলি টার্গেট পেয়েও রংপুরের তারকা ভরপুর ব্যাটিং লাইপআপ করেছে ১৩৯ রান। গেইল-ম্যাককালামের ব্যাটিং দেখতে আসা দর্শকরা দেখেছেন আফগান লেগি রশিদ খান আর বাংলাদেশি তরুণ মেহেদী হাসানের স্পিন কারিকুরি।

শনিবার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কাছে ১৪ রানে হেরেছে রংপুর রাইডার্স। এই নিয়ে টুর্নামেন্টে টানা তিন ম্যাচে হেরে একদম তলানিতে পড়ে রইল মাশরাফির দল। পাঁচ ম্যাচ থেকে চার জয় নিয়ে দুইয়ে উঠে গেছে কুমিল্লা।

২০০৯ আইপিএলের পর আবার একসঙ্গে ওপেন করতে নেমেছিলেন ক্রিস গেইল ও ব্র্যান্ডন ম্যাককালাম। এদের দুজনকে দেখতেই গ্যালারিতে তখন হইহই। কি না কি করেন, নড়েচড়ে বসছিলেন সবাই। তাদের বিপক্ষে হাত ঘোরানোর দায়িত্ব পড়ল তরুণ অফ স্পিনার মেহেদী হাসানের। সে ভার নিয়ে বুক চিতিয়েই বল করেছেন তিনি। তার বলে জড়োসড়ো গেইল, ভুগেছেন ম্যাককালাম। মুখোমুখি প্রথম বলেই ফিরতে পারতেন গেইল।  ব্যাকফুটে গিয়ে পা লাগালেও সাড়া দেননি আম্পায়ার। রিপ্লেতে দেখে নিজেকে দুর্ভাগা মনে হতে পারে মেহেদীর। এরপরও তরুণ মেহেদী দুই বিস্ফোরক ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বল করে প্রথম দুই ওভার থেকে দেন মাত্র ২ রান।

দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে আরও বাজিমাত মেহেদীর। এক ওভারে এই অফস্পিনার আউট করে দেন ম্যাককালাম ও শাহরিয়ার নাফীসকে। মেহেদীর বলে শুরু থেকেই অস্বস্তি ছিলেন ম্যাককালাম। আল-আমিনকে ছক্কা-চারে জড়তা ভাঙেন। তবে মেহেদী আবার বল করতে আসতেই কুপোকাত কিউই ব্যাটসম্যান।  বেরিয়ে এসে মারতে গিয়ে হয়েছেন স্টাম্পিং। কোন রান করার আগেই শাহরিয়ার নাফীস হয়েছেন বোল্ড।  তার আগেই অবশ্য ফিরে গিয়েছিলেন গেইল ও কুশল পেরেরা।

ব্যর্থ গেইল- ম্যাককালাম জুটি
টুর্নামেন্টে পাকিস্তানি হাসান আলির প্রথম বলেই টাইমিংইয়ে গড়বড় গেইলের। বল উঠে গিয়েছিল  আকাশে। অনেকখানি পেছনে দৌঁড়ে জায়গায় পৌঁছেও তা ধরতে পারেননি লিটন দাস। জীবন পেয়ে হাসান আলিকে টানা তিন চার মেরে তা উদযাপন করেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং দানব। কিন্তু টেকেননি বেশিক্ষণ। পরের ওভারেই রশিদ খানের গুগলিতে থতমত খেয়েছেন। ১৭ রান করে হয়েছেন এলবিডব্লিও। এখানে আবার নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতে পারেন গেইল। বল লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ করলেও আম্পায়ার দিয়েছেন আউট। এক বল পরেই আবার উইকেট। রংপুরের আরেক বড় তারকা কুশল পেরেরাও ব্যর্থ। ২ বলে খেলেই সুইপ করে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরেছেন শূন্য রানে।

রশিদ খানের লেগ স্পিন আর মেহেদী হাসানের অফ স্পিনে ৩২ রানেই রংপুর রাইডার্সের ৪ উইকেট হাওয়া। গেইল-ম্যাককালামের রোমাঞ্চকর ব্যাটিংয়ের জড়ো হওয়া ভরপুর গ্যালারিও তখন ফাঁকা হতে শুরু করেছে।

তবে তাতে দমে যাননি মিঠুন আলি আর রবি বোপারা। উইকেট পতন থামিয়েছেন, থিতু হয়ে খেলেছেন শট। তাদের ৬৭ রানের জুটিতে ম্যাচ চলে আসে শেষ পাঁচ ওভারের সমীকরণে। রানরেটের চাপে আল-আমিনের  বলে ক্যাচ তুলে ফেরেন ২৬ বলে ৩২ রান করা মিঠুন। বোপারা শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন। তবে শুরুর মন্থর ব্যাটিংয়ে নষ্ট হওয়া বলগুলো পরে পুষিয়ে নিতে পারেননি। ৪৮ বল খেলে ৪৮ রানের বেশি করতে পারেননি তিনি। জেতাতে পারেননি দলকে।

সাতে উঠে মাশরাফি ১১ বলে ১৭ করে চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে তাতে কেবল কুমিল্লার কাছেই যেতে পেরেছে রংপুরে। পেরুতে পারেনি কাঙ্খিত টার্গেট।

এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ইমরুল কায়েস আর মারলন স্যামুয়েলসের চল্লিশ পেরুনো দুটি মাঝারি সংগ্রহ পায় কুমিল্লা।  শুরুটাও খুব মাঝারি তামিমদের। ইনিংস জুড়েই থাকল গড়পড়তা ব্যাটিংয়ের ছবি। যখন বোলারদের উপর চেপে বসতে চেয়েছেন কুমিল্লার ব্যাটসম্যানরা তখনই পড়েছে উইকেট। ওদিকে পরিকল্পনা কাজে লাগিয়ে মাপা বোলিং করে গেছেন মাশরাফির বোলাররা।

শুরুতে অফ স্পিন দিয়ে বোলিং ওপেন করে তামিমকে বেশ চেপে ধরেছিলেন সোহাগ গাজী। সে চাপ থেকে বেরুতে মাশরাফির বলে এলোপাথাড়ি শটেও তামিম পেয়েছিলেন দুই চার। তাতে ঠিক স্বস্তির আভাস দিচ্ছিল না তার ব্যাট। মাশরাফির জায়গায় আক্রমণে এসে পর পর দুটি শর্ট অব লেন্থের বল দিলেন রুবেল হোসেন। এবার এগিয়ে এসে দুটিই মিড উইকেট দিয়ে সীমানা পার করেছেন কুমিল্লার অধিনায়ক। মনে হচ্ছিল ফিরে পেয়েছেন ছন্দ, হতে পারে বড় কিছুও।  তবে দুবল পর  ফের শর্ট বলেই তামিমকে কাবু করে ফেলেন রুবেল। এবার এক পা তুলে স্কয়ার লেগে খেলতে গিয়ে টপ এজ হয়ে ক্যাচ যায় শর্ট থার্ড ম্যানে ম্যাককালামের হাতে। প্রথম সাফল্য রংপুরের।

প্রথম ওভারে ৯ রান দেওয়ার পরে আক্রমণ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন মাশরাফি। তিন ওভার পরে ফিরেই আঘাত। তার নিচু হওয়া বল এগিয়ে এসে পেটাতে গিয়ে বোল্ড হয়ে ফেরেন লিটন দাস। পরের ওভারে আরও বড় সাফল্য রংপুর অধিনায়কের। আরেকটি উইকেটমুখী বল, আরেকটি উইকেট। এবার জস বাটলার হয়েছেন এলবিডব্লিও। ৫৫ রানে নেই তিন উইকেট। তবে এরপরই ইমরুল-স্যামুয়েলসের প্রতিরোধ।

এদিনও ইমরুল কায়েস ছিলেন ছন্দে। স্ট্রাইক রোটেট করেছেন, বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি মেরেছেন। তবে আবারও ফিফটির কাছে গিয়ে আউট হয়েছেন। ইমরুলের ৩২ বলে ৪৭ রানের ইনিংস থামিয়েছেন থিসিরা পেরেরা। পেরেরার রিভার্স স্যুয়িং বুঝতে বুঝতেই লেগ স্টাম্প গেছে তার। সেই পেরেরা পরে ফিরিয়েছেন শোয়েব মালিককেও। নিজের বলে ফিল্ডিং করে বুদ্ধিদীপ্ত থ্রোতে রান আউট করে দেন পাকিস্তানি মালিককে।

একপ্রান্তে মন্থর গতিতে উইকেটে পড়েছিলেন মারলন স্যামুয়েলস। শেষ ওভারের আগে ৩৪ বলে ৪১ রানের ইনিংস থেমেছে পেরার বলে। পেরেরাই বেশ খানিকটা সময় ধরে ভুগিয়েছেন তাকে। শেষ দিকে ১১ বলে ১৬ রান করে কুমিল্লাকে দেড়শ পার করান অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন। রশিদ, মেহেদীদের স্পিনে ওই রানই পরে যথেষ্ট হয়ে যায়।



গেইল-ম্যাককালামের ব্যাটিং দেখতেই শনিবার মিরপুরের গ্যালারি পুরো ভর্তি। এত দর্শকের সামনে এর আগে কখনো বল করা হয়নি মেহেদী। শুরুতে তাই ছিলেন স্নায়ুচাপে। তবে বল করতে গিয়ে সব 'টেনশন' উবে যায় তার,  'এত দর্শকের সামনে খেলতে নেমে শুরুতে খুব নার্ভাস লাগছিল। পরে একটি-দুটি বল করার পর আর কিছু মনে হয়নি।'

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স:১৫৩/৬ (তামিম ২১, লিটন ১১, ইমরুল ৪৭ , বাটলার ১, স্যামুয়েলস ৪১, মালিক ৯, সাইফুদ্দিন ১৬*  , হাসান আলি ২* ;  গাজী ০/২৪, মাশরাফি ২/২২, পেরেরা ২/২৬, রুবেল ১/৪৫)

রংপুর রাইডার্স:১৩৯/৭  (ম্যাককালাম ১৩,গেইল ১৭, পেরেরা ০, শাহরিয়ার ০,মিঠুন ৩১, বোপারা,  মাশরাফি ১৭, পেরেরা ১, গাজি )   ;মেহেদী ২/১৫, রশিদ ২/১৯, আল-আমিন ১/৩৩)

টস: রংপুর রাইডার্স

ফল: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ১৪ রানে জয়ী।  



ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মেহেদী হাসান

Comments

The Daily Star  | English

Dozens injured in midnight mayhem at JU

Police fire tear gas, pellets at quota reform protesters after BCL attack on sit-in; journalists, teacher among ‘critically injured’

4h ago