মাদক: প্রয়োজন সমষ্টিগত সমাধান

২০১৬ সালে বিশ্বের মাদক সমস্যা বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে, সদস্য রাষ্ট্রের সরকারগুলোকে নতুন মাদক নীতিমালা নির্ধারণ করতে এক সঙ্গে নিয়ে আসে। নতুন এই মাদক নীতিমালা মানবিক এবং নারী ও যুব সমাজসহ সকলকে সম্পৃক্ত করেছে। মাদক নীতিমালাটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়— নারী ও যুব সমাজের সম্পৃক্ততা ছাড়া মাদক নীতিমালা নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। মাদক নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রক্রিয়া অনুসরণের এখনই উৎকৃষ্ট সময়।
মিয়া সেপ্পো, বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী

আজ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস।

২০১৬ সালে বিশ্বের মাদক সমস্যা বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে, সদস্য রাষ্ট্রের সরকারগুলোকে নতুন মাদক নীতিমালা নির্ধারণ করতে এক সঙ্গে নিয়ে আসে। নতুন এই মাদক নীতিমালা মানবিক এবং নারী ও যুব সমাজসহ সকলকে সম্পৃক্ত করেছে। মাদক নীতিমালাটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়— নারী ও যুব সমাজের সম্পৃক্ততা ছাড়া মাদক নীতিমালা নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। মাদক নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রক্রিয়া অনুসরণের এখনই উৎকৃষ্ট সময়।

বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের সরকারও এই নীতিমালা সাদরে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র একত্রিত হয়ে মাদকের অপব্যবহার, এর সামাজিক ঝুঁকি হ্রাস এবং অবৈধ পাচার রোধ করার অঙ্গীকার করেছে। মাদকের অপব্যবহার থেকে তরুণ ও শিশুদের সুরক্ষা, মাদক সমস্যার কার্যকর প্রতিকার, স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের জন্য দক্ষতা ও যথাযথ সুযোগ নিশ্চিত করতে, এবং সেই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সহায়ক হতে, সমাজকে আরও স্বাস্থ্যকর করতে, শিক্ষার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে এই মাদক নীতিমালার একটিই দ্ব্যর্থহীন আবেদন: 'মানুষকে অগ্রাধিকার দিন'।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ মাদকাসক্ত। ২০১৭ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উল্লেখ করে যে, দেশের শতকরা ৮৮.৩৯ শতাংশ মাদকাসক্ত ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী। এই মাদক সমস্যাকে আরও গভীর করেছে ইয়াবা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪০,০৭৯,৪৪৩ ইয়াবা ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করে।

সুস্পষ্টভাবেই আমরা অনুধাবন করতে পারি যে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও চাহিদা হ্রাস করতে, মাদকের অবৈধ পাচার রোধ করতে বাংলাদেশের যেমন প্রয়োজন সামাজিকভাবে সুস্বাস্থ্য ও সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণ। তেমনই প্রয়োজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর প্রচেষ্টা। মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাই হলো যেকোনো মাদকবিরোধী কৌশলের মূল উপাদান যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি আস্থা তৈরি করে। মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও গণমাধ্যমে অবশ্যই তথ্য-সমৃদ্ধ ও কার্যকর প্রচারণা কার্যক্রম থাকতে হবে। এই কৌশল বাস্তবায়নে যেন মানুষ প্রান্তিকীকরণ ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নতার শিকার না হয় সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত হলেই একজন মানুষ তার মানবাধিকার ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা লাভের অধিকার হারিয়ে ফেলে না। সকল মাদকাসক্ত ব্যক্তির বৈষম্যহীন, গ্রেপ্তার ও শাস্তিমুক্ত জীবন ধারণের অধিকার রয়েছে। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার ভীতি মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা বা এর জন্য চিকিৎসা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুটি জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য বিষয়ক কমিশনের রেসুলেশন ৬১/১১ তে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী কাজে জাতিসংঘের সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। মাদকের অবৈধ পাচার রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার হ্রাস করতে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের একটি অঙ্গীকার। তবে নাগরিক সমাজের বক্তব্যে প্রতিফলিত ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযানে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মাদক বিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মতে, মাদক বিষয়ক অপরাধ অবশ্যই দেশের আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, মাদক বিষয়ক অপরাধ দমনে বিচার বহির্ভূত প্রক্রিয়া জাতিসংঘের মাদক বিষয়ক চুক্তির পরিপন্থী। অপরাধ প্রতিরোধে যে সকল সংস্থা কাজ করছে তাদের আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে ও অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারকে সম্মান দেখাতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের আড়ালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

জাতিসংঘের মহাসচিব, তার নিজ দেশের মাদক নীতিমালার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদেরকে  এই বলে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মাদকবিরোধী যুদ্ধের কার্যকারিতা এবং মানবাধিকারের উপর এর প্রভাব নিরীক্ষণ অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই-কমিশনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। বহু বছর যাবত জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা অপরাধের বিকল্প বিচারের প্রতিকারের জন্য আহবান জানিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি মাদকের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে, মাদকাসক্তদের পরিচয় গোপন ও তাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে চিকিৎসা ও মাদকের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করতে, সামাজিক একত্রীকরণের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ ও সেবার প্রচলন নিয়ে গুরুত্বারোপ করছে।

এমন কার্যক্রম ও সেবা নিয়ে জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায়, কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যেমন মাদকাসক্তদের জন্য সেবা কেন্দ্র, মাদক নীতিমালার সংশোধন, এইচ আই ভি প্রতিকারে কার্যক্রম, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাগরিক সমাজ প্রতিনিধিদের দক্ষতা বৃদ্ধি এসব কার্যক্রমের উদাহরণ। একই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করা আবশ্যক যে, এগুলো এবং এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য জনন্স্বাস্থ্য সেবার কার্যক্রমগুলো ও স্বাস্থ্য কল্যাণ যেন সুরক্ষিত থাকে।

বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই মাদকমুক্ত জীবনের, এবং একটি কার্যকর মাদক- নীতিমালার যা মানুষের মৌলিক অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখবে– দাবি রাখে। এদেশের শিশু-কিশোর ও যুব সমাজের শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের যেকোনো সহিংসতা থেকে দূরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এখনই সময়, একসঙ্গে সরকার, সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ ও জাতিসংঘের মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে সমবেত হওয়ার এবং এদেশের তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ও নিরাপদ জীবন যাপনে সহায়তা করা। এই  লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশের পাশে থাকবে জাতিসংঘ।

লেখক:

মিয়া সেপ্পো, বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী

সেরগেই কাপিনোস, আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ইউএনওডিসি দক্ষিণ এশিয়াআঞ্চলিক অফিস

Comments

The Daily Star  | English
Impact of poverty on child marriages in Rasulpur

The child brides of Rasulpur

As Meem tended to the child, a group of girls around her age strolled past the yard.

13h ago