রাবির ৩ শিক্ষার্থীকে মারধর করলেন রাকসু-শিবির নেতারা

নিজস্ব সংবাদদাতা, রাবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী অভিযোগে এক শিক্ষার্থীসহ তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর করেছেন রাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।

সোমবার দুপুর ও বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দফায় দফায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে এক নারী শিক্ষার্থী একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীর প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়।

রোববার সংস্কৃত বিভাগের ওই নারী শিক্ষার্থী একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি তাকে হুমকি দিয়েছেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রোববার রাতে সভায় বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় মহসিন আলমের সঙ্গে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, একই বিভাগের হাসিব ও সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।

পরে এ বিষয়ে সোমবার দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিযোগ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এসজিএস এস এম সালমান সাব্বিরসহ অন্যরা। এ সময় রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন ঘেঁটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হীল গালিবসহ কয়েক জন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি পাওয়ার দাবি করেন। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তরে জিএস আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রক্টর সেখানে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করেন, এরপর আনাস ও অন্যরা কার্যালয় ত্যাগ করেন।

এ ঘটনার জেরে বিকেল তিনটার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে হামলা করেন। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপরে পাল্টা হামলা চালালে তারা সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে যান।

পরে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক, সহকারী সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য সদস্য এবং ছাত্রশিবিরের কর্মীরাও সেখানে জড়ো হন।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এ সময় রাকসু জিএস আম্মার দূর থেকে ওই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন। গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীরাও পাল্টা গালাগালি করেন। একপর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠকক্ষের ভেতরে নিয়ে যান। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত অনুযায়ী, পরে শিবির ও রাকসু নেতারা পাঠকক্ষের ফটক থেকে প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোটা দিয়ে তাদের মারধর করেন।

পরে তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করার অভিযোগ ওঠে।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন। আহত শিক্ষার্থীরা তখনও ভেতরে ছিলেন।

কিছুক্ষণ পর সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহত শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে ভেতরের গেট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় দুইজন আবারও তার ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। মাহমুদুলকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সামনেই বারবার লাথি মারা হয়। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পরে রাকসু নেতা ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ‘এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কোনো স্থান নেই’ স্লোগান দেন।
এরপর বিকেল সাড়ে চারটা থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মীর বিচারের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিবিরের নেতাকর্মীরা।

হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠকক্ষে উপস্থিত থাকা পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘আমরা পড়ছিলাম, এমন সময় তারা হঠাৎ রিডিং রুমে ঢুকে পড়ে। যাকে পেয়েছে তাকেই ছাত্রলীগ আখ্যা দিয়ে মারধর করেছে। লাইব্রেরিতে পড়তে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতিও তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে।’

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মীর অভিযোগে অভিযুক্ত আনাস বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তারা আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেয়। সালাহউদ্দিন আম্মার তার লোকজন নিয়ে প্রক্টর কার্যালয়েই আমাকে মারধর শুরু করে। পরে আমাদের বের হতে দেওয়া হয় এবং আমরা লাইব্রেরিতে যাই। রাকসু ভবনের সামনে অন্য কারও সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। এরপর আম্মার তার লোকজন নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে আমাদের মারধর করে। আমাকে কমপক্ষে ২০০টিরও বেশি আঘাত করা হয়েছে।’

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কর্মীর অভিযোগ অস্বীকার করে আনাস জানান, তার কয়েকজন বন্ধু আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের সঙ্গে তোলা কিছু ছবির কারণেই এ অভিযোগ তোলা হয়েছে।

হামলায় ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, ‘শিবিরের কেউ এতে জড়িত ছিল না। রাকসুর ভাইদের ওপর হামলার খবর শুনে আমরা এখানে ছুটে আসি। এসে এই পরিস্থিতি দেখি।’

হামলার ভিডিও ফুটেজে শিবিরের নেতাকর্মীদের দেখা যাওয়ার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার দাবি করেন, ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা’ রাকসু ভবনে হামলা চালিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছে ওই ছাত্রলীগ নেতাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম, কিন্তু তারা কিছুই করেনি। আমাদের ওপর হামলা হওয়ার পর আমরা বাধ্য হয়ে এখানে (লাইব্রেরি ভবনে) আসি।’

রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, প্রশাসন ও পুলিশ তাদের আশ্বাস দিয়েছে যে, রাকসু নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের আটক করা হয়েছে।

এদিকে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে আটকের পরে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে শিবির ও রাকসু নেতারা।

আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গোলাম কবীর বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। তাদের পূর্বের কোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। বর্তমানে তারা দুইজন চিকিৎসাধীন।’

প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘পূর্বের ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রক্টর দপ্তরে একটি বিচার শালিস বসে। এখানে রাকসু জি এস সালাহউদ্দিন আম্মার একজন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ বলে অভিযুক্ত করে এবং পুলিশে ধরিয়ে দিতে বলে। সেখানে তাদের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীদের হাতাহাতি হয়। এরই প্রেক্ষিতে রাকসু ভবনে হাতাহাতি এবং লাইব্রেরিতে মারধরের সব ঘটনা ঘটে।’

প্রক্টর আরও বলেন, ‘এরপর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুলিশ আনাস ও হাসানকে আটক করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির জন্য ভিসি স্যার দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।’

(নোট: ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই রাত ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হয়েছে।)