তুলা নিয়ে ভাবতে হবে এখনই

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তুলার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তুলা ব্যবহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রথম তিনে যথাক্রমে আছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে নিজস্ব শক্তিশালী টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাত রয়েছে।
স্টার ফাইল ছবি

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তুলার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তুলা ব্যবহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রথম তিনে যথাক্রমে আছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে নিজস্ব শক্তিশালী টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাত রয়েছে।

তুলা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্পে ব্যবহৃত প্রধান উপাদান। করোনা মহামারির প্রভাবে বৈশ্বিকভাবে তুলার চাহিদা হ্রাস পেলেও স্থানীয় বস্ত্র কারখানায় এর চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ২০২১-২২ বিপণন বছরে বাংলাদেশ তুলা আমদানির জন্য লক্ষ্যমাত্রা সাত দশমিক ছয় মিলিয়ন বেল সম্ভাব্য হিসেবে ধরা হয়েছে। ২০২১-২২ বিপণন বছরে স্থানীয়ভাবে তুলা ব্যবহারের পরিমাণ সাত দশমিক নয় মিলিয়ন বেল সম্ভাব্য হিসেবে ধরা হয়েছে। যা ২০২০-২১ বিপণন বছরে ব্যবহৃত তুলার পরিমাণের প্রায় সমান।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর করোনা মহামারি প্রভাব ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে এবং এর সঙ্গে ইয়ার্ন, ফ্যাব্রিক এবং তৈরি পোশাকের চাহিদাও অব্যাহত রয়েছে।

কাজেই প্রাকৃতিক মূল্যবান সম্পদ এই তুলাকে কিভাবে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায় তা ভেবে দেখার সময় হয়েছে। সেই সঙ্গে রিসাইকেলড তুলা কীভাবে কাজে লাগানোর যায় তাও খুঁজে বের করতে হবে।

কাঁচামাল হিসেবে তুলার ওপর আমাদের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের দেশের শেয়ার প্রায় ২০ শতাংশ। ডেনিম রপ্তানিতে ইউরোপের বাজারেও বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। সকল রপ্তানিকৃত ডেনিম পণ্য কটন থেকে প্রস্তুতকৃত।

এখানে যে বিষয়টি আমাদের সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে সেটি হলো কটন বর্জ্য। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলো থেকে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। যার মধ্যে আড়াই লাখ টন ছিল সম্পূর্ণরূপে তুলার বর্জ্য। বিজিএমইএর উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় হয়। ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের কাছে রিসাইকেলড বর্জ্য ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাকের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলো থেকে উৎপাদিত বর্জ্য কীভাবে রিসাইকেল করে পুনরায় ব্যবহার করা যায় সেই পন্থাগুলো নিয়ে কাজ করার বিষয়ে বিজিএমইএ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদন পরবর্তী ফ্যাশন বর্জ্যকে পুনরায় নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশে টেক্সটাইল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার লক্ষ্যে গত বছর একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যেখানে ৫০টিরও বেশি ব্র্যান্ড, ম্যানুফ্যাকচারার, রিসাইকেলার ও এনজিও অংশগ্রহণের জন্য সই করেছে। ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ম্যানুফ্যাকচারার ও রিসাইকেলারদের মধ্যে সার্কুলার ফ্যাশন নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এ প্রকল্পটি একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। টেক্সটাইল রিসাইক্লিং এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আমি বহুদিন যাবত চেষ্টা করছি। বিভিন্ন দেশে ভ্রমণকালে আমি দেখেছি, উৎপাদন পরবর্তী ফ্যাশন বর্জ্যকে পুনরায় নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যাধুনিক মেশিন ব্যবহার হচ্ছে। অন্যমত শীর্ষ কটন ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে তুলার বর্জ্য রিসাইকেল করে পুনরায় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সিনথেটিক ফাইবারের চেয়ে সেলুলসিক ফাইবার হিসেবে সমধিক পরিচিত তুলার তন্তুকে রিসাইকেল করা সহজ। যেহেতু পোশাক উৎপাদনে আমাদের দেশে তুলার তন্তুর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, সেহেতু এদিক থেকে আমাদের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে ভোক্তা, ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের কাছে রিসাইকেল্ড কটন থেকে প্রস্তুত করা পোশাকের কদর ও চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বলতে গেলে প্রায় প্রতিটা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের রিসাইকেল্ড কটনের তৈরি পোশাকের সংগ্রহ রয়েছে। ফলে কটন রিসাইকেলের মাধ্যমে একদিকে যেমন তুলার বর্জ্যের সদ্ব্যবহার করা যাবে এবং অন্যদিকে রিসাইকেল্ড কটনের তৈরি পোশাকের জন্য ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা পূরণ করা যাবে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাইমার্ক সম্প্রতি সাসটেইনেবল লাউঞ্জওয়্যার কালেকশন এনেছে। যা তৈরিতে রিসাইকেল্ড উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য আরও বেশি পরিমাণ রিসাইকেল্ড উপাদান ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাকের ব্যবহার বাড়ানো। এই নতুন পোশাকের কালেকশন সার্কুলার ফ্যাশন বিজনেস 'রিকোভার' কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত। 'রিকোভার' উপরোল্লিখিত সার্কুলার ফ্যাশন পার্টনারশিপ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী একটি প্রতিষ্ঠান।

প্রাইমার্ক আট টুকরা বিশিষ্ট একটি পোশাকের কালেকশন তৈরি করেছে। যেখানে প্রত্যেকটি পণ্য তৈরির উপাদানের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিমাণ রিসাইকেল করা তুলা রয়েছে। আর এই কাজটি করার জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন, তা অবশ্যই আমাদের পোশাক কারখানাগুলোর আওতার বাইরে নয়। অথচ এই ধরণের পণ্য বাজারে প্রিমিয়াম মূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে।

তুলার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো এর দীর্ঘস্বায়ীত্বতা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলা উৎপাদনকারী শীর্ষ ছয়টি দেশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রাজিল, পাকিস্তান ও তুরস্ক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে আগামী ২০ বছরের মধ্যে দাবানল, খরা ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বস্তুতপক্ষে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে বিশ্বের তুলা উৎপাদনকারী মোট অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ তুলা উৎপাদনের যে মৌসুম তার সময়সীমা হ্রাস পাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারণ তুলা উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ তাপমাত্রা প্রয়োজন তুলা উৎপন্নকারী অঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা তার চেয়ে বেশি বাড়ছে। তাছাড়া, প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প ও অনেক ক্ষেত্রে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে তুলা উৎপন্ন হয় এমন অঞ্চলগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমন তথ্যই উঠে এসেছে গবেষণা থেকে।

তুলা ব্যবহারকারী শীর্ষ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এমন সংবাদ নিশ্চয় সুখকর নয়। কারণ এমনটি হলে বাংলাদেশের চাহিদা অনুপাতে তুলার প্রাপ্যতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপরোল্লিখিত গবেষণাটি আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময়ের একটি সম্ভাব্য পূর্বাভাস দিয়েছে। কাজেই এটি আমাদের পোশাক ও বস্ত্র শিল্প সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই একটি চিন্তার বিষয়। কারণ আমাদের পোশাক ও বস্ত্র খাত তুলার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

আগামী কয়েক বছর জুড়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে, এমনটাই পূর্বাভাস রয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা ও নীতিতে সেরকমই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ রপ্তানি বৃদ্ধি মানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি। এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে আমাদের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হুমকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমানে বিশ্ব বাজারে বিভিন্ন কারণে তুলার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো, অনেক ব্র্যান্ড চীনের জিনজিয়াংয়ে উৎপাদিত তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাক ক্রয়ে অনিচ্ছুক। বিশ্বব্যাপী তুলার সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলস্বরূপ তুলার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপরোল্লিখি বিষয়গুলো মাথায় রেখে আগামী বছরগুলোতে কীভাবে আমরা তুলার প্রাপ্যতা ঠিক রাখব, তুলার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে কটন রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিতে গভীরভাবে নজর দেব এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও গ্রহণ করব সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে আমি মনে করি।

 

মোস্তাফিজ উদ্দিন: ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

'Why haven't my parents come to see me?'

9-year-old keeps asking while being treated at burn institute

1h ago