রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়ার মানে কী?

রাজধানীর কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণের প্রতিবাদ করায় একজন নারী ও তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে ধরে নিয়ে থানা হাজতে রাখার ইস্যুতে যখন সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম, তখন একটি বাক্য বা আইনি বিধানের দিকে আমাদের মনোনিবেশ করা দরকার, সেটি হলে ‘রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদান’।

রাজধানীর কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণের প্রতিবাদ করায় একজন নারী ও তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে ধরে নিয়ে থানা হাজতে রাখার ইস্যুতে যখন সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম, তখন একটি বাক্য বা আইনি বিধানের দিকে আমাদের মনোনিবেশ করা দরকার, সেটি হলে 'রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদান'।

কলাবাগানের ঘটনায় সৈয়দা রত্না ও তার ছেলেকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সম্ভবত গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পুলিশ তাকে ১২ ঘণ্টা পরে ছেড়ে দেয় অথবা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পুলিশের ভাষ্য, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাদেরকে ধরে আনা হয়েছিল এবং সরকারি কাজে তারা আর বাধা দেবেন না—এই অঙ্গীকারে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়ার এই অভিযোগ কিংবা অজুহাত নতুন নয় এবং এই অজুহাত বা অভিযোগ যে শুধু পুলিশের তরফেই আসে তাও নয়। বরং সরকারের অন্যান্য বাহিনী ও দপ্তরের শীর্ষ পদধারী থেকে পিয়ন-চাপরাশিরাও পারলে পাবলিককে 'রাষ্ট্রীয় কাজ' শেখান।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। মাস কয়েক আগে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে লাগেজ চেক করার কাউন্টারে লম্বা লাইন দেখে কয়েকজন যাত্রী ক্ষুব্ধ হন। তারা দ্রুত লাগেজ পাস করার দাবি জানান। কারণ তাদের মধ্যে কয়েকজনের ফ্লাইট ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল। কিন্তু ওই সময়ে ডিউটির পরিবর্তন হচ্ছিলো। অর্থাৎ কম্পিউটারে যিনি ব্যাগগুলো স্ক্যান করছিলেন, তার ডিউটি শেষ এবং তার স্থলে নতুন আরেকজন বসেছেন। দায়িত্ব বুঝে নিতে কিছুটা সময় লাগে এবং এই সময়ের মধ্যে মোটামুটি একটা লম্বা লাইন তৈরি হয়ে যায়। এর মধ্যে একজন যাত্রী এই বিলম্বে ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে বললেন কাজটা দ্রুত করতে। এ নিয়ে এক কথা দুই কথা হতে হতে বিমানবন্দরের ওই কর্মী বেশ জোরে ওই যাত্রীকে বললেন, 'আপনি রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দিচ্ছেন।'

কী আশ্চর্য বিষয়! একজন যাত্রী, তার তাড়া আছে বলে দ্রুত ব্যাগ স্ক্যান করে পাস করে দেওয়ার দাবি জানালেন এবং বিলম্বের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বলে সেটিও রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদান! ফলে নাগরিকের মনে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের সংজ্ঞা কী এবং এর মানদণ্ড কী? উপরন্তু রাষ্ট্রের কোন স্তরের কর্মচারী নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের অভিযোগ আনতে পারবেন?

আরেকটি অভিজ্ঞতা বলছি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের তর্ক হচ্ছিলো। একজন তরুণ (সম্ভবত ক্রেতা) সেখানে দাঁড়িয়ে ওই দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখার পরে ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে কিছু একটা বলা শুরু করছিলেন। তখনও দেখা গেলো পুলিশ ওই তরুণকে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আটক করার হুমকি দেয় এবং তরুণটি তখন পাশ থেকে সরে যান।

রাস্তাঘাটে এবং সরকারি অফিস-আদালতে প্রতিদিনই এরকম 'রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের' অসংখ্য ঘটনা ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, কোনো একজন সরকারি কর্মচারী ঘুষ চাইবেন এবং সেটি দিতে না চাইলে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে তিনি ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন এবং একপর্যায়ে ওই কর্মচারীও তাকে বলবেন যে, আপনি রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দিচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের বিষয়ে আইন কী বলছে? তার আগে বলা দরকার, আমাদের দেশ এখনও চলছে ব্রিটিশ আইনে। আমাদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে তাড়িয়েছেন, পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছেন, কিন্তু আইন-কানুনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশের লিগ্যাসি অথবা ব্রিটিশপ্রেম ছাড়তে পারেননি। এখনও দেশের প্রধান প্রধান আইনগুলো ব্রিটিশ আমলের। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক আইনগুলো আমরা নিজেরা তৈরি করতে পারিনি। এখনও পুলিশ বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে পুলিশ আইনের মাধ্যমে, যেটি প্রণীত হয়েছে ১৮৬১ সালে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলও ১৯৪৩ সালের। আর ফৌজদারি কার্যবিধি প্রণীত হয়েছে ১৮৯৮ সালে।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচালিত হবে যে আইনে, সেটি অন্তত গত ৫০ বছর সময়কালের মধ্যে প্রণয়ন করা উচিত ছিল অথবা আইনটিকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য উপযোগী করে এটিকে এমন একটি মানবিক আইনে পরিণত করা দরকার ছিল যা বাংলাদেশের আদি সংবিধান অর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত নাগরিকদের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতো। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমত বা তর্কের অবকাশ কম যে, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জনগণের দূরত্ব এখনও ঢের এবং তারা যে ব্রিটিশ আইনে পরিচালিত হচ্ছে, সেটি একুশ শতকের বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই বেমানান—যার বড় উদাহরণ রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের অস্পষ্টতা।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদান জিনিসটা কী? অধিকাংশ অপরাধের বিবরণ রয়েছে ১৮৬০ সালে প্রণীত যে দণ্ডবিধিতে (এটিও ব্রিটিশ আমলের), তার ১৮৬ ধারায় বলা হয়েছে: Whoever voluntarily obstructs any public servant in the discharge of his public functions, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to three months, or with fine which may extend to five hundred taka, or with both.

এখানে বলা হয়েছে any public servant অর্থাৎ যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে যদি কেউ (Whoever) তার রাষ্ট্রীয় কাজে (public functions) স্বেচ্ছায় বাধা দেয় (voluntarily obstructs), তাহলে এর শাস্তি হিসেবে ৩ মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কিন্তু বাধা দেওয়ার সংজ্ঞা কী এবং এটি কে নির্ধারণ করবেন যে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী (তিনি পুলিশ হোন কিংবা সরকারের অন্য যেকোনো দপ্তরের কর্মী) যা করছিলেন সেটি আসলেই রাষ্ট্রীয় কাজ বা জনগণের জন্য কাজ?

এই অভিযোগ বহু পুরানো যে, বিশেষত রাজনৈতিক ঘটনা সংশ্লিষ্ট মামলা কিংবা যেসব ঘটনাকে রাজনৈতিক খাতে প্রবাহিত করা যায়, সেসব মামলায় দণ্ডবিধির এই ১৮৬ ধারার প্রয়োগ (মূলত অপপ্রয়োগ) হয় সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ আসামিদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের অভিযোগ আনা খুব সহজ এবং এই মামলায় সাজার পরিমাণ যতই কম হোক না কেন, অন্তত নাগরিকদের হয়রানির করার ক্ষেত্রে এর জুড়ি নেই। সবশেষ রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ যে মামলা করেছে সেখানেও পুলিশের কাজে বাধাদানের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং অজ্ঞাত অনেককে আসামি করা হয়েছে। শুধু অজ্ঞাত নয়, এমনও ২ জনকে আসামি করা হয়েছে যাদের একজন মৃত এবং একজন দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে পুলিশের দায়ের করা এইসব মামলা বা অভিযোগ বরাবরই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। জনমনে তাদের ব্যাপারে আস্থার সংকট তৈরি করে।

তবে এটা ঠিক যে, কিছু ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে নানা কারণে পুলিশ বিভিন্ন সময় বাধার সম্মুখীন হয়। যেমন নদী তীরবর্তী অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মীরা বাধার মুখে পড়েন। কোথাও আক্রান্তও হন। আবার অনেক সময় সড়ক-মহাসড়কে পরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে কিংবা বাজারে ভেজালবিরোধী অভিযানে মোবাইল কোর্টে (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনার সময় ম্যাজিস্ট্রেটকে তার কাজ করতে বাধা দেওয়া, কোনো ইঞ্জিনিয়ারকে সরকারি রাস্তা বা স্থাপনার কাজ করতে বাধা দেওয়াও সরকারি কাজে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেউ যদি বেআইনি সমাবেশের মাধ্যমে বেআইনি কর্মকাণ্ড করে এবং পুলিশ যদি শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেখানে অভিযান চালায় এবং এর বিপরীতে যদি সেখানে কেউ বাধা দেয় তাহলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়ার মামলা হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ কিংবা কমিউনিটির মানুষের জন্য একটি উন্মুক্ত স্থান সুরক্ষার দাবিতে কেউ যদি ব্যানার নিয়ে দাঁড়ান এবং ওই খোলা জায়গাটি সংরক্ষণের দাবি জানান, তাহলে সেটি কী করে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের মধ্যে পড়ে? এই মানববন্ধন বা মাঠ রক্ষার দাবিতে কথা বলা কি বেআইনি?

একটি সম্পূর্ণ আবাসিক এলাকার ভেতরের একটি পরিত্যক্ত/উন্মুক্ত স্থানেই কেন থানার জন্য ভবন নির্মাণ করতে হবে? আশেপাশে আর কোনো জায়গা নেই? মূল সড়কের পাশেও ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা ও স্থাপনা রয়েছে। সরকার চাইলে তার যেকোনো একটি স্থাপনা বা জায়গা অধিগ্রহণ করে জমি ও ভবনের মালিককে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেখানে থানার জন্য ভবন নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু যে জায়গাটিতে থানা নির্মাণের ব্যাপারে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আপত্তি রয়েছে, সেখানেই কেন এটি নির্মাণ করতে হবে? থানা তো হবে ওই এলাকার মানুষের নিরাপত্তা বিধানের জন্যই। কিন্তু দেখা গেলো, পুলিশ এই মাঠ রক্ষার দাবিতে আন্দোলনকারী একজন নারী এবং তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক (১৮ বছরের কম) সন্তানকে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের অভিযোগে ধরে নিয়ে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় থানা হাজতে আটকে রাখলো।

কথা হচ্ছে, যদি তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধাদানের অভিযোগই থাকে তাহলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে ছেড়ে দিলো কেন? গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার চাপে? তাহলে আইনের শাসনের কী হবে? আর যদি ওই নারী ও তার সন্তানকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে দীর্ঘ সময় থানা হাজতে রাখা হয় তাহলে এর জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিচার হবে না কেন?

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments

The Daily Star  | English
Dhaka Airport Third Terminal: 3rd terminal to open partially in October

Dhaka airport's terminal-3 to open in Oct

The much anticipated third terminal of the Dhaka airport is likely to be fully open in October, multiplying the passenger and cargo handling capacity.

2h ago