‘সাহসিকা’ রিজওয়ানা হাসান

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকা (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ—আইডব্লিউওসি) পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকা (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ—আইডব্লিউওসি) পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

২০০৭ সাল থেকে এ পুরস্কার দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলছে, শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, লৈঙ্গিক সমতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় যারা ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি নিয়ে ও ত্যাগ স্বীকার করে ব্যতিক্রমী সাহস দেখান ও নেতৃত্ব দেন, তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

এর আগে ২০০৯ সালে রিজওয়ানা হাসান পরিবেশের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার 'গোল্ডম্যান পুরস্কার' পান। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী 'টাইম' 'এনভায়রনমেন্টাল হিরো'র তালিকায় রাখে তাকে।

এ ছাড়া ২০১২ সালে এশিয়ার নোবেল হিসেবে পরিচিত ম্যাগসেসে পুরস্কার পান রিজওয়ানা।

সাম্প্রতিক পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি স্টারের। তিনি বলেন, এই অর্জন তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে নতুনভাবে অনুপ্রেরণা ও শক্তি যোগাবে।

ডেইল স্টার: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

রিজওয়ানা হাসান: আমরা যারা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করি, আমাদের সরাসরি একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মুখোমুখি হতে হয়। যারা ভূমিদস্যু, নদীদূষণ-নদী ভরাটের সঙ্গে জড়িত, যারা বন উজাড় করে কারখানা বানায়, জাহাজভাঙ্গা শিল্পের নামে মানুষ হত্যা করে। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় যে, কাগজে-কলমে, আইন-কানুনে, সংবিধানে সরকার সঠিক বিধান রাখলেও সরকারের মধ্যেই কিছু মানুষের ও সরকারের রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকে। আমাদের মতো একটি দেশে, যেখানে গণতন্ত্র প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে আছে, সেখানে এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী এবং ক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত। সুতরাং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় তাদের মুখোমুখি হওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ।

ডেইলি স্টার: বেলার প্রায় ৩ দশকের কাজে কোন ধরনের সংকটে পড়তে হয়েছে?

রিজওয়ানা হাসান: বেলা ২৭ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। আমি হয়তো নেতৃত্ব দিচ্ছি গত ২৩ বছর ধরে। এই ২৩ বছরে কিন্তু দ্বিতীয় কোনো বেলা হয়নি। গত ২-৩ বছরে আমাদের বেশ কিছু কর্মীর গায়ে হাত উঠেছে, আমরা গ্রামে যে সব মানুষের পক্ষে মামলা করেছি, তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বা অন্যান্য মিথ্যা অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে। যেখানে আমরাই সবসময় ঝুঁকিতে থাকি, সেখানে আমি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছি তারা তো আরও বেশি ঝুঁকিতে। আমি একটি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা একটি জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছি, আইনের শাসনের কথা বলছি। এটা কারও জন্যই সহজ নয়। এখানে মানুষের ভোটের অধিকারই সত্যিকার অর্থিই সংকীর্ণ। ফলে এখানে যারা ভুক্তভোগী হয়, কিছু গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য যাদের ভুগতে হয়, তারা তো আদালতে আসতে পারে না সহজে। আমি যখন তাদের প্রতিনিধিত্ব করছি, তখন আমাকে তাদের ভালনারেবিলিটিটা মাথায় রাখতে হচ্ছে, ঝুঁকির বিষয়টা মাথায় রাখতে হচ্ছে। আমি যখন কোর্টে যাচ্ছি, তখন আমি কিন্তু জানি না যে, সত্যি সত্যি ন্যায়বিচার আনতে পারবো কিনা, তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবো কিনা, এমনকি আমার নিজের অধিকারও রক্ষা করতে পারবো কিনা।

প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক সময় বিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিকার তো হই। কিছু কিছু পত্রিকা আছে ওরা লাগাতার নিউজ করতে থাকে। আবার যদি জেন্ডার অ্যাসপেক্টে বলি সেখানেও একইরকম। একটা খুনের ঘটনার বিচার চেয়ে আমরা ৬৩-৬৪ জন একসঙ্গে সই করলাম। যখন আমার সই গেল, তখনো কিন্তু দেখা গেছে ইন্টারনেটে আমার বিরুদ্ধে আজেবাজে কথা লিখছে। সাইবার বুলিং করছে।

ডেইলি স্টার: এই দীর্ঘ লড়াই কি এখন আরও কঠিন মনে হয়?

রিজওয়ানা হাসান: এটার ২ ধরনের উত্তর হতে পারে। একটা হলো, আমরা যখন প্রথম প্রথম মামলা করতাম তখন প্রতিপক্ষ এতোটা সুসংগঠিত ছিল না। এখন একটা শিপ ব্রেকারের বিরুদ্ধে মামলা করলে গোটা শিপ ব্রেকার অ্যাসোসিয়েশন দাঁড়িয়ে যায় ওই শিপব্রেকারের স্বার্থ রক্ষা করতে। এত বছরে ওরা বুঝে গেছে যে, আমি কোর্টে যাব। আর কোর্ট তো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী রায় দেবে। যখন কোনো অতিরিক্ত রাজনৈতিক স্বার্থ চলে আসে তখন এটা ব্যতিক্রম হতে পারে। এখন আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই অনেক বেশি সুসংগঠিত হয়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে ওদের যারা মিত্র, দেখা যাচ্ছে তাদের দিয়ে ওরা আইনের ধারাও বদলে ফেলছে। তাই এখনকার লড়াইটা আরও বেশি কঠিন বলে মনে হয়। তবে আশার বিষয় হলো, আমরা হয়তো ২০০০ সালে বুড়িগঙ্গা অবৈধ দখলমুক্ত করতে মামলা করেছি। এখন কিন্তু ৬৪ জেলায় নদী রক্ষা নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। এটা যে আমার কারণে হয়েছে, আমি তা বলছি না। কিন্তু বিচার ব্যবস্থা মানুষকে একটা ভরসা দিয়েছে। যেখানে আমলাতন্ত্র আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে, রাজনীতিকরা আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে, সেখানে বিচার ব্যবস্থা কিন্তু ভরসা দিয়ে রেখেছে। এই ভরসাটা আমাকে সাহস দেয়। আমি যে সমস্ত ইস্যু নিয়ে কাজ করি, যে মানুষগুলো আমার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, তারাও কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মুখ খুঁজে নিয়েছে। এটা কিন্তু একটা আশার দিক।

ডেইলি স্টার: ভবিষ্যতে কি চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে?

রিজওয়ানা হাসান: এটা নির্ভর করবে গণতন্ত্রের অবস্থার ওপর। যদি দেশে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র থাকে, সত্যিকার অর্থে মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার আসে এবং মানুষের ভোটেই কোনো দল পরাজিত হয়, তখন একটা জবাবদিহিতা থাকে। উন্নয়নের নামে সবকিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। উন্নয়নের মডেল নিয়ে এখন কথা বললেই তো আমরা দেশ বিরোধী হয়ে যাচ্ছি, স্বাধীনতা বিরোধী হয়ে যাচ্ছি। ভোটের অধিকার থাকলে এটা থাকবে না। কেউ যদি উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করে তখন কিন্তু আর জনগণ ভোট দেবে না। আমি মনে করি গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি থাকে, তাহলে আমাদের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করবে। আর আমাদের গণতন্ত্র যত বেশি সংকীর্ণ হবে নারী অধিকার, শিশু অধিকার, পরিবেশ অধিকার- যেকোনো ক্ষেত্রেই বিচার পাওয়াটা মুশকিল হয়ে যাবে।

ডেইলি স্টার: সমাজে নারীর জন্য চ্যালেঞ্জগুলো কী কী বলে মনে করেন?

রিজওয়ানা হাসান: নারীদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিবার। ছোটবেলা থেকেই নারীরা জানেন, তারা তার ভাইয়ের অর্ধেক সম্পত্তি পাবেন। পরিবারের ব্যাপারে ছেলে-মেয়ের সমান দায়িত্ব থাকলেও মেয়েটি অর্ধেক সম্পত্তি পাবেন। আমাদের সমাজে পরিবার থেকেই মেয়েদের গড়ে তোলা হয় মনস্তাত্বিকভাবেই পরাজিত করে। এখানে ধর্মকেও ব্যবহার করা হয়। কদিন আগে আমাদের সরকার প্রধান একটা কথা বলেছেন, 'কোনো ক্ষেত্রে ধর্ম মানি না, সম্পত্তির কথা এলেই ধর্ম টানি।' পরিবার আর সমাজের এই বিষয়গুলো রাষ্ট্রের মধ্যে একেবারে গেঁথে গেছে। রাষ্ট্র পাবলিক স্ফিয়ার ছাড়া প্রাইভেট স্ফিয়ারে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছে না। গণতন্ত্র যখন সংকুচিত হয়ে যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন তার ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন নারীর বিরুদ্ধে যে অপরাধ হয়, যে সাইবার বুলিং হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে নারী আরও অসহায় হয়ে যায়। দিন যত যাচ্ছে, নারী যত অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হচ্ছে, সে কিন্তু ততই বলছে যে, 'আমি এই নিয়মগুলো মানবো না'। সমাজে যে ট্যাবুগুলো আছে সেগুলো কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রচার করা হচ্ছে। নারী যত এগিয়ে যাবে, পুরুষতন্ত্র কিন্তু ততই আপনাকে আটকে রাখতে চাইবে। এখন নারীর প্রতি সহিংসতা মারাত্মক পর্যায়ে বেড়ে গেছে। যে আইনগুলো আছে সেগুলোও সহিংসতা কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যদি গণতন্ত্র কম থাকে- ধরুন আমি এমন একটা অপরাধের অভিযোগ করলাম যেখানে একজন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মানুষ জড়িত, আমি তো তখন বিচার পাবো না। এমন ঘটনা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এখন আমরা একটা ট্রানজিশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। নারীবাদী মূল্যবোধের সঙ্গে আমাদের সমাজ এখনো সম্পূর্ণভাবে পরিচিত না।

ডেইলি স্টার: পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে?

রিজওয়ানা হাসান: আমার তো সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। কারণ মাঝে মাঝেই খুব হতাশ লাগে। দেখতে পাচ্ছি, স্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে কিন্তু বিচার এনে দিতে পারছি না, রায় এনে দিতে পারছি না। আবার রায় এনে দিতে পারলেও ন্যায়বিচার এনে দিতে পারছি না। আপনি যতই সাহসী হন, এরকম অবস্থায় হতাশ হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক না। তাই যখন এ ধরনের খবর পাই, তখন আবার জেগে উঠি। তখন বুঝি যে, আমাদের ভালো কাজগুলো কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও তো দেখছে, মূল্যায়ন তো হচ্ছে। আর যখন অনেক অভিনন্দন বার্তা পেতে থাকি, যেমন গত রাতে এতো অভিনন্দন, শুভেচ্ছাবার্তা এসেছে, তখন মনের মধ্যে অন্যরকম নিশ্চয়তা আসে। এটা তো অবশ্যই অনেক বড় দায়িত্ব। আপনি এ ধরনের স্বীকৃতি পেলে সবাই তো দেখতে থাকবে যে, আপনি কী করেন। আমি খুশি হয়েছি। এটা আমাকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুনভাবে অনুপ্রেরণা ও শক্তি যোগাবে।

Comments

The Daily Star  | English
Annual registration of Geographical Indication tags

Rushed GI status raises questions over efficacy

In an unprecedented move, the Ministry of Industries in Bangladesh has issued preliminary approvals for 10 products to be awarded geological indication (GI) status in a span of just eight days recently.

11h ago