সার্চ কমিটিকে একইসঙ্গে নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করতে হবে

একেবারে শুরুতে সরকার বলেছিল যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়নের যথেষ্ট সময় নেই। এ আইন তৈরির জন্য সংবিধান প্রণয়নের একেবারে শুরুতে, সেই ১৯৭২ সাল থেকেই বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারপর হঠাৎ করে সরকার ঘোষণা দিলো, এ ধরনের একটি আইন তৈরির জন্য যথেষ্ট সময় আছে।

(আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সার্চ কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই এবং একইসঙ্গে করোনা সংক্রান্ত জটিলতায় অংশ নিতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।)

একেবারে শুরুতে সরকার বলেছিল যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়নের যথেষ্ট সময় নেই। এ আইন তৈরির জন্য সংবিধান প্রণয়নের একেবারে শুরুতে, সেই ১৯৭২ সাল থেকেই বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারপর হঠাৎ করে সরকার ঘোষণা দিলো, এ ধরনের একটি আইন তৈরির জন্য যথেষ্ট সময় আছে।

আইনটিকে 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২' নাম দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এই আইন দিয়ে যা বোঝায় তা হলো, 'সার্চ কমিটি' গঠন। এই কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে এই পদগুলোর জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের নাম সুপারিশ করা। এরপর রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে (যার জন্য রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ) নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।

কীভাবে এবং কেন এই 'সার্চ কমিটির' চিন্তা সামনে এলো, বিশেষ করে যখন প্রয়োজন ছিল মূলত নির্বাচন কমিশন গঠন আইনের? এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

সামনে থেকে দেখলে মনে হবে সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশনের জন্য উপযুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে তাদের কাজের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে, তারা একটি মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন। যে নির্বাচন ২ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।

ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে কিছু ঘটনাকে যতই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করুক, এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ আজও বিরাজমান। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের কারণে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সম্মান এবং একইসঙ্গে সার্বিকভাবে সংসদের সম্মানও বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিজেদের দেশে এবং বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।যার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অনেক ঈর্ষণীয় সাফল্যও ম্লান হয়েছে।

এখানে আমরা কাজী রকিবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি) কথা মনে করতে পারি। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনের সংসদ সদস্যরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি আসনে কোনো নির্বাচনই হয়নি এবং বেশিরভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কোনো সুযোগ পাননি। সংসদের বেশিরভাগ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের দখলে যায় এবং একটিও ভোট না পেলেও তারাই সরকার গঠন করেন। অর্থাৎ, বেশিরভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি এমন নির্বাচন আয়োজনের কলঙ্কজনক সম্মান খুব সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকিবউদ্দিনের দখলে। তারপরেও, একে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে  ভোট পক্ষে টানার নানা রকমের সুযোগ বেড়েছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে ক্যামব্রিজ অ্যানালাইটিস এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের অতীব শক্তিশালী ডেটা ক্রাঞ্চিং অ্যালগরিদম কাজে লাগিয়েছে, যা ভোটারদের অবচেতন মনের গভীরতম চিন্তাগুলো বুঝতে পারে এবং একজন ভোটার কোন মার্কায় ভোট দেবেন সে বিষয়টিকে প্রভাবিত করতে পারে (নিশ্চয়ই এরকম আরও অনেক সংগঠন আছে যারা ছায়ার মতো তাদের কার্যক্রম চালায় এবং এখনও যাদের হয়ত আমরা জানিনা। আমাদের কোনো ধারণাই নেই পেগাসাসের মতো ইসরায়েলে তৈরি করা নজরদারি সফটওয়্যারের কাজ কী। এটি আমরাও কিনেছি বলে গুজব শোনা যায়)। এ সব মিলিয়ে নির্বাচন এখন জনগণকে আরও অনেক বেশি পরিমাণে সূক্ষ্ম ও স্থূল কারসাজির মাধ্যমে প্রভাবিত করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন আমরা অনুধাবন করি, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার  ক্ষেত্রে বেশিরভাগ দেশে ক্ষমতাসীন দল প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি সুবিধা উপভোগ করে থাকে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং 'বন্ধুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের' সঙ্গে তাদের মধুর সম্পর্কের কারণে ক্ষমতায় থাকা দলের পক্ষে  জনমতকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা প্রতিপক্ষ দলগুলোর চেয়ে হাজার গুণে বেশি। তারা এটা বিভিন্ন ভাবে করতে পারে। যেমন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, দুর্বল নির্বাচনী এলাকাগুলোতে নির্বাচনের আগে হঠাৎ বাড়তি উন্নয়ন তহবিলের জোগান দেওয়া, বিভাজনমূলক মতাদর্শকে উস্কে দেওয়া এবং জাত, ধর্ম ও শ্রেণী বিভাজনের সুবিধা নেওয়া। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, যেমন আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন মূলত সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সঙ্গে বড় আকারের তহবিলের উৎস থাকায়, 'জনমানুষের মতপ্রকাশের' বিষয়টিকে ক্ষমতাসীন দল ঠাট্টা তামাশার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক আলী রীয়াজের একটি সুপাঠ্য কলাম দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি হাইব্রিড রাজনৈতিক শাসনের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, যে রাজনৈতিক শাসনে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ উভয় থেকে কিছু পরিমাণ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটানো হয় এবং কীভাবে এ ধরনের সরকার নির্বাচন পরিচালনা করে, সে বিষয়ে তিনি লিখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের শাসনব্যবস্থার পুরোপুরি ভিন্ন দুটি রূপ থাকে। যার একটি হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ এবং অন্যটি হচ্ছে আধিপত্যবাদী নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ। তিনি জানান, এ দুটির মাঝে মূল পার্থক্য হচ্ছে, কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেই প্রক্রিয়ায়। প্রথমটির ক্ষেত্রে, সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি উচ্চ পর্যায়ের শোষণমূলক এবং সেখানে গণমাধ্যমকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। এ ধরনের নির্বাচনে খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের এক ধরনের প্রতিযোগিতার আভাস থাকে, যার মাধ্যমে কিছুটা 'অনিশ্চয়তার' আশংকা তৈরি হয়। তবে দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায়, সেই সামান্য 'অনিশ্চয়তাটুকুও' দূর করা হয়।

তিনি স্টিভেন লেভিটস্কি ও লিউকান এ ওয়ের লেখা একটি প্রবন্ধ 'প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদের উত্থান' থেকে উদ্ধৃতি দেন, আধিপত্যবাদী নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদের ক্ষেত্রে এমন ভাবে নির্বাচনে কারসাজির বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, যে প্রতিযোগিতার বিষয়টি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায় এবং সব ধরনের অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয়। বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এ অনিশ্চয়তাকে দূর করা হয়, যার মধ্যে আছে সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং এর জন্য নির্বাচন কমিশনকে এমন একটি যন্ত্রে পরিণত হতে হয়, যেটি রাষ্ট্রের অন্যান্য যন্ত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কাজ করে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ও স্বভাবের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দলের নিজেদেরকে পুনর্গঠনে ব্যর্থতা এবং ভোটারদের হৃদয়ে ও মননে কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য স্থান পুনর্দখল করতে না পারার কারণে আমাদের নির্বাচন আরও বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট নেতৃত্ব সংকট ক্ষমতাসীনদের প্রতি কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা আসার সম্ভাবনাকে আরও কমিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কমতে থাকা গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্র, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনে কারসাজির প্রবণতা বাড়তে থাকা এবং বাংলাদেশের ২০২৬ সালের মধ্যে (করোনাভাইরাসের কারণে ২০২৪ থেকে ২ বছর পিছিয়েছে) উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এ সব কিছু মিলিয়ে যে প্রেক্ষাপট, তার মাঝেই সার্চ কমিটিকে নির্বাচন কমিশনের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের খুঁজে বের করতে হচ্ছে। নতুন এই নির্বাচন কমিশন পরবর্তী ২২ মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করবে।

সর্বশেষ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে মনে রাখতে হবে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে হলে আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক সম্প্রদায় অবশ্যই সুশাসনের মানদণ্ডের উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের চর্চা বাড়ানোর ওপর জোর দেবে।

আমরা আশা করব সার্চ কমিটি তাদের কাজকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করবে এবং একে কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা পূরণের কারিগরি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করবে না। কাজের গুণগত মানের কথা না ভেবে শুধুমাত্র প্রক্রিয়াগত দিক দিয়ে নির্ভুল হলে তা তীরে এসে তরী ডোবানোর সমতুল্য হবে। আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ কাজের সুবিশাল নৈতিক দায়িত্ব, যা আমাদের  অভিজ্ঞ সার্চ কমিটিকে বহন করতে হবে। আমরা আশা করি তারা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলবেন না যে তাদের কয়েক সপ্তাহের কাজ আমাদের দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ কিংবা অভিশাপ হতে পারে। যার প্রভাব আগামী ৫টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বছর জুড়ে দৃশ্যমান হবে।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments

The Daily Star  | English
Shipping cost hike for Red Sea Crisis

Shipping cost keeps upward trend as Red Sea Crisis lingers

Shafiur Rahman, regional operations manager of G-Star in Bangladesh, needs to send 6,146 pieces of denim trousers weighing 4,404 kilogrammes from a Gazipur-based garment factory to Amsterdam of the Netherlands.

8h ago