বিনিয়োগ

কমছে বেসরকারি বিনিয়োগ

করোনা মহামারি পরিস্থিতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

করোনা মহামারি পরিস্থিতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

গত কয়েক বছরে বেকারত্ব ও দারিদ্র বিমোচন খাতে যে উন্নতি হয়েছে তা বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে স্থিমিত হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অন্তর্বর্তীকালীন তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের বিপরীতে  মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ। যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন।

গত অর্থবছরের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের পূর্বাভাষের (২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ) চেয়েও এই অনুপাত কম। এই পূর্বাভাষটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে অনুপাতটি বেড়ে ২৩ দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছিল। গত বছরের মার্চ মাসে করোনাভাইরাস আঘাত হানার পর অনুপাতটি কমে ২২ দশমিক ছয় শতাংশ হয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান জানান, বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগের হার কমে যাওয়ার পেছনে নিশ্চিতভাবেই কাজ করেছে কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট নজিরবিহীন মন্দা।

তিনি বলেন, 'বিনিয়োগের হার কমে যাওয়ার পরিমাণটি বিবিএসের অন্তর্বর্তীকালীন তথ্যের চেয়েও বেশি হতে পারে।  কারণ নতুন করে লকডাউন আরোপ করায় অর্থনীতির আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে।'

অধ্যাপক রায়হান মহামারি সময়ের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটিকে পুনঃযাচাই করার ওপর জোর দেন।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, 'পরিকল্পনাটি অপরিবর্তনযোগ্য নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা সেটিকে আবারও পর্যালোচনা করতে পারি।'

তিনি জানান, সংকটময় পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছিল।

'যদি নতুন তথ্য ও পরিস্থিতির কারণে সেটিকে পুনঃযাচাই করার প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা আবারও প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের হারগুলো পর্যালোচনা করবো।'

২০২১ অর্থবছরে সার্বিক বিনিয়োগের সঙ্গে জিডিপির অনুপাত ছিল ২৯ দশমিক ৯২, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই অনুপাতটি ছিল ৩০ দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং এটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেড়ে ৩১ দশমিক ছয় শতাংশ হয়েছিল। মহামারি আঘাত হানার পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই অনুপাত কমে ৩০ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়।

তবে সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে জিডিপির অনুপাতটি মহামারির মধ্যেও বেড়েছে, কারণ সরকার অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করা ও মানুষকে সংকটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের ব্যয় বাড়িয়েছে।

সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে জিডিপির অনুপাতটি ২০২১ অর্থবছরে আট দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল, যেটি ২০২০ ও ২০১৯ অর্থবছরে যথাক্রমে আট দশমিক ৪১ শতাংশ ও আট দশমিক তিন শতাংশ ছিল।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে শিল্প ঋণ বিতরণের হার। এই সূচকটি ২০২০ অর্থবছরে আট দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ঋণ বিতরণের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ দশমিক আট শতাংশ কমেছে।

পঞ্জিকাবর্ষ ২০২০ এ ২০১৯ এর তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতের ঋণ বিতরণের পরিমাণ আট দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে। তবে ২০২১ এর প্রথম তিন মাসে এটি ২০২০ এর একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। যেটি সার্বিকভাবে এসএমই খাতের ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেও বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে ২০২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ক্রেডিট প্রবৃদ্ধির হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ৮০ এর বিপরীতে আট দশমিক ৪০ শতাংশে নেমে গেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে এটি হয়েছে।

এই সূচকটি কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে তারল্য বেড়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেড়ে জুনে ব্যাংকিং খাতে বাড়তি তারল্যের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা।

গত বছরের জুন থেকে প্রতি তিন মাস পরপর সানেম ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর সমীক্ষা চালিয়েছে।

এই সমীক্ষার ফলাফলের বরাত দিয়ে অধ্যাপক রায়হান জানান, মহামারি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলেছে। তাদের বেশিরভাগই এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

'এ কারণে তারা নতুন কোনো বিনিয়োগের দিকে যাচ্ছে না', যোগ করেন তিনি।

অল্প কিছু তৈরি পোশাক নির্মাণকারী কারখানা তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ও মাস্ক উৎপাদন শুরু করেছে।

'তবে আমরা কোনো বড় বিনিয়োগ বা নতুন বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরির উদাহরণ পাইনি', বলেন তিনি।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে মহামারি খুব খারাপ ভাবে প্রভাবিত করেছে। সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

অধ্যাপক রায়হান অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তবে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে এই সরকারি সহায়তার আওতাভুক্ত করার ক্ষেত্রে ফলাফল খুব একটা সন্তোষজনক নয় বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র নয় শতাংশ প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে তহবিল পেয়েছে। কিন্তু মাঝারি ও বড় শিল্প খাতে যথাক্রমে ৩০ ও ৪৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তহবিল পেয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, 'যেহেতু বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মহামারিতে খারাপ ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তারা এখন শুধুমাত্র ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই করছে।'

'তারা ক্ষতি পোষানোর চেষ্টায় ব্যস্ত আছেন। এ কারণে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে অনিচ্ছুক', বলেন তিনি।

তিনি জানান, গত দেড় বছরে বৈশ্বিক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গেছে।

বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান মাহবুবুল আলম।

মহামারির শুরু থেকেই অর্থনীতিবিদদের মতৈক্য ছিল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না।

বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'আমার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। আমরা আগে যে পূর্বাভাষ দিয়েছিলাম তা বিবিএসের সাম্প্রতিক তথ্য নিশ্চিত করেছে।'

মহামারির আগেও বেসরকারি বিনিয়োগের হার মাত্র ২২ শতাংশে স্থির ছিল।

মনসুর বলেন, 'কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক দুর্বলতার সমাধানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা চাইলে মহামারির মধ্যেও বিভিন্ন ধরণের সংস্কার কর্মসূচী পরিচালনা করতে পারতেন।'

'ফলশ্রুতিতে, মহামারির প্রভাব কমে এলে আমরা প্রাক-মহামারি পর্যায়ে ফিরে যেতে পারি। তবে আমরা কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতিতে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে পারবো না,' যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, অর্থনীতিকে মহামারির প্রভাব থেকে বের করে আনার জন্য সরকারের একমাত্র পথ হচ্ছে টিকাদান কর্মসূচীর গতি বাড়ানো এবং লকডাউনের উদ্যোগ সফল করা।

'ভ্যাকসিনের বিষয়টি অবজ্ঞা করে প্রবৃদ্ধির কথা বলে লাভ নেই।'

প্রতিমন্ত্রী শামসুল বলেন, সরকার অর্থায়ন, অর্থনীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্য নীতিমালার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব ধরণের উদ্যোগ নেবে। যাতে করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া গতিশীল হয়।

তিনি বলেন, 'আশা করি আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করবে এবং এটা মহামারি পূর্ব পর্যায়ে নিয়ে যাবে'।'

 

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments