‘তালেবানদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথাও’

‘রোববার রাতেই কাবুল দখল হয়ে গেছে। সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানতে পারি তালেবানরা আমাদের কম্পাউন্ডে এসেছে। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। বললেন উদ্বিগ্ন না হতে। তবে, আমরা যেহেতু দেশে যেতে পারছি না সে কারণে উদ্বিগ্ন।’
ঠাকুরগাঁওয়ের মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, গাজীপুরের রাজিব বিন ইসলাম, ঠাকুরগাঁওয়ের আবু জাফর মাসুদ করিম ও ফেনীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ছবি: জুম ভিডিও থেকে নেওয়া

'রোববার রাতেই কাবুল দখল হয়ে গেছে। সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানতে পারি তালেবানরা আমাদের কম্পাউন্ডে এসেছে। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। বললেন উদ্বিগ্ন না হতে। তবে, আমরা যেহেতু দেশে যেতে পারছি না সে কারণে উদ্বিগ্ন।'

শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় দেশে ফিরতে পারেননি আফগানিস্তানে কর্মরত মুঠোফোন কোম্পানি আফগান ওয়্যারলেসের সাত বাংলাদেশি প্রকৌশলী। তাদেরই একজন নজরুল ইসলাম গত রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে এই কথাগুলো বলেন।

নজরুল ইসলাম ছাড়া আরও ছয় বাংলাদেশির গতকাল সন্ধ্যায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে কাবুল থেকে দুবাই হয়ে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু, কাবুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলার কারণে তাদের ফ্লাইট বাতিল হয়।

সাত বাংলাদেশিই মোবাইল সেবা প্রতিষ্ঠান আফগান ওয়্যারলেসে কর্মরত। আফগান ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন কোম্পানি আফগান ওয়্যারলেস বা এডব্লিউসিসি নামে পরিচিত। এটি আফগানিস্তানের প্রথম মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান।

এই সাত বাংলাদেশি হলেন: ফেনীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁওয়ের মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও আবু জাফর মাসুদ করিম, গাজীপুরের রাজিব বিন ইসলাম ও মনিরুল হক, নারায়ণগঞ্জের ইমরান হোসেন এবং গাইবান্ধার শেখ ফরিদ আহমেদ। তারা সবাই ১২ থেকে ১৮ বছর ধরে আফগানিস্তানে কর্মরত।

এই বাংলাদেশিরা কাবুলের হাজারি নাজারি এলাকায় আফগান ওয়্যারলেসের বিদেশি কর্মকর্তাদের থাকার একটি কম্পাউন্ডে আছেন। সেখানে আরও ১২ ফিলিপিনোর সঙ্গে পাকিস্তান, উগান্ডা ও নাইজেরিয়ার নাগরিকসহ মোট ২২ জন আছেন।

আফগান ওয়্যারলেসের সিনিয়র ম্যানেজার নজরুল ইসলাম গত ১৪ বছর ধরে আফগানিস্তানে। গত দুই দিনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আগেরবার তালেবানদের লড়াইয়ের সঙ্গে এবারের পার্থক্য হলো কোনো রক্তপাত বা প্রাণহানি ছাড়াই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কাবুল দখল হয়ে গেছে। গত রোববার রাতে দখলের পর সোমবার সকালে তালেবানরা আমাদের কম্পাউন্ডে এসেছিল।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের কোম্পানির অ্যাডমিন ম্যানেজার একজন আফগান। তালেবানরা আসার পর তাদের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর বললেন, "আমাদের এখানে অনেক বিদেশি আছে। তারা উদ্বিগ্ন। তোমরা তাদের একটু আশ্বস্ত করো।" এরপর তালেবানরা আমাদের বললেন তোমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তোমরা কাজ করো। এরপর তারা শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। আমাদের পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে গেলেন। এই তালেবানদের আগেরবারের চেয়ে ভিন্ন মনে হলো। তবে, সামনের দিনগুলোতে বলা যাবে তারা আসলে কেমন।'

আফগান ওয়্যারলেসের প্রকৌশল বিষয়ক দুটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। তিনি গত ১৮ বছর ধরে আফগানিস্তানে কর্মরত।

এই সময়ে আফগানিস্তানে বড় ধরনের কী কী পরিবর্তন দেখেছেন জানতে চাইলে কামরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '২০০১ সালে তালেবানদের পতনের দেড় বছর পর আমি আফগানিস্তানে আসি। গত প্রায় ১৮ বছরে আফগানিস্তান অনেকটা বদলে গেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক। প্রতিটা এলাকায় নতুন রাস্তা। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন। গত কয়েক বছর ধরে আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক চর্চা বা ভোট হচ্ছিল তা যতোই খারাপ হোক।'

তিনি আরও বলেন, 'তরুণ প্রজন্ম খুব দ্রুত এগুচ্ছে। প্রায় ১৮ বছর আগে আমরা যখন আসি তখন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ থেকে ছয় জন পড়তেন। এখন নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। সেখানে গেলে আপনি দেখবেন ছেলেদের চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থী বেশি। অনেক নারী চাকরি করছেন। ডাক্তার, প্রকৌশলী অনেক নারী। এই উন্নয়নগুলো সামনে থাকবে কিনা তা পরে বোঝা যাবে। আশা করি, গত ২০ বছরের অর্জন ধ্বংস হবে না।'

কামরুজ্জামানের মতে, 'আসলে আফগানরা নারীকে ঘরের বাইরে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এটা তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। খুব সহসা তা কাটবে না। আমাদের এমনও সহকর্মী আছেন যিনি উন্নত বিশ্বে লেখাপড়া করেছেন কিন্তু নারীরা ঘরের বাইরে যাক তা মানতে চান না।'

আফগান ওয়্যারলেসে প্রকৌশলীসহ কয়েকটি পদে নারীরা ছিলেন। এখন তাদের অবস্থা কী জানতে চাইলে আফগান ওয়্যারলেসের কন্ট্রাক্ট সেন্টার ও পাবলিক ব্রাঞ্চ এক্সচেঞ্জের প্রধান রাজিব ইসলাম বলেন, 'নারী প্রকৌশলী ও সহকর্মীরা গত দুই দিন ধরে অফিসে আসছেন না। তারা এখনো বুঝতে পারছেন না কী করবেন। কারণ এর আগে তালেবানরা নারীদের লেখাপড়া করতে দেয়নি। নানা নিপীড়ন চালিয়েছে। এবার তালেবানদের অবস্থান ঠিক কী হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের নারী সহকর্মীরা এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগবে।'

আফগান ওয়্যারলেসের সহকারী ব্যবস্থাপক মাসুদ করিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তালেবান নেতাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তারা হয়তো আগেরবারের মতো এসব বিষয়ে এবার গোঁড়ামি করবে না। তবে, তারা ইসলামি শাসন কায়েম করবেই। ইসলামের মধ্যে থেকে নারীদের যে অধিকার দেওয়া যায় সেটাই তারা দিতে চায়। তবে এসব বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা যাবে না। সামনের দিনগুলো দেখতে হবে।'

এই যে রাতারাতি কাবুল দখল, আফগানিস্তানের জনগণ কি আগে থেকে বুঝতে পেরেছিল? এ বিষয়ে কামরুজ্জামান বলেন, 'পৃথিবীর সব পরাশক্তির কবর হয়েছে আফগানিস্তানে। আসলে আফগানরা খুব আত্ম-মর্যাদাসম্পন্ন জাতি। বাইরের কোনো শক্তিকে তারা মেনে নেয় না। ব্রিটিশদের পরাজয়ের ইতিহাস পড়েছি। আর আমাদের জীবদ্দশায় রাশিয়া ও আমেরিকার পতন দেখলাম আফগানিস্তানে।'

নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সরকারের পতন ঘটবে, তালেবানরা আসবে তা সবাই বুঝতে পারছিল। তবে, কেউ কেউ ধারণা করেছিল দুই মাস বা ছয় মাসও লাগতে পারে। তালেবানরা যে এত দ্রুত আসবে তা কেউ বুঝতে পারেনি। বিশেষ করে কয়েক ঘণ্টায় কাবুল দখল হয়ে যাবে এটা অচিন্তনীয় ছিল। এখন জনগণের মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।'

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শুনলে অবাক হবেন যে তালেবানরা সব দখল করলো, কিন্তু কোথাও প্রতিরোধ বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বিমানবন্দরে যে কয়েকজন মারা গেলেন তারা প্লেনে উঠতে গিয়ে বা পদদলিত হয়ে মারা গেলেন। আফগানিস্তান দখল করতে গিয়ে এবার কাউকে মরতে হয়নি।'

আফগানিস্তানে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার কতটা হলো? প্রকৌশলী রাজিব বিন ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বিমানবন্দরসহ গত কয়েকদিনের ঘটনা আপনারা যা দেখতে পাচ্ছেন তা ফেসবুক পোস্টের কারণে। আফগানিস্তানে একটা সুবিধা হলো আপনি যে কোনো ঘটনা ফেসবুকে দিতে পারবেন। আপনি এখানে যেকোনো নেতার সমালোচনা করতে পারবেন। এখানকার ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে আসে।'

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ কেমন দেখেন? জানতে চাইলে প্রায় দেড় যুগ আফগানিস্তানে থাকা কামরুজ্জামান বলেন, 'এখুনি বলা যাবে না। তবে আফগানরা বাংলাদেশকে ভালোবাসে। আফগানিস্তান পুনর্গঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা অনেক। ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানের খাদ্য সংকটে বাংলাদেশ অনেক চাল দিয়েছিল। তারা কখনো বাংলাদেশিদের ওপর হামলা চালায়নি। নতুন সরকার ও আগামী দিনগুলো দেখে আমাদের সরকারের সম্পর্ক করা উচিত।'

আফগানিস্তানে স্থায়ী সরকার এলে বাংলাদেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'আমরা তৃতীয় কোনো দেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আফগানিস্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। আঞ্চলিক সমৃদ্ধির জন্য আমরা চাই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।'

তিনি আরও বলেন, 'আফগানিস্তানের মানুষের অনেক সক্ষমতা আছে। তারা সেটি ব্যবহার করে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সার্বিক সহযোগিতা করবে। তবে, সেজন্য স্থায়ী সরকারের প্রয়োজন। সামনের দিনে যখন আমরা বুঝব একটি স্থায়ী সরকার এসেছে, আমরা তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব।'

শরিফুল হাসান: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Comments

The Daily Star  | English

BNP revamping party, wings

The BNP has started reorganising the party to inject vigour and form a strong base to relaunch its anti-government movement.

5h ago