জনপ্রিয়তায় আওয়ামী লীগ, বিএনপির ধারেকাছেও নেই ব্রিটেনের কোনো দল!

শুনতে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের রেকর্ড করে আমাদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের অবস্থান ব্রিটেনের কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি থেকে অনেক উপরে নিয়ে গেছে। প্রধান দুই ব্রিটিশ রাজনৈতিক দল অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দুই দলের সেই রেকর্ড ভাঙা তো দূরের কথা, ছুঁতেও পারবে বলে মনে হয় না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তবে কি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্রিটিশদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল থেকেও অনেক এগিয়ে?

শুনতে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের রেকর্ড করে আমাদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের অবস্থান ব্রিটেনের কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি থেকে অনেক উপরে নিয়ে গেছে। প্রধান দুই ব্রিটিশ রাজনৈতিক দল অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দুই দলের সেই রেকর্ড ভাঙা তো দূরের কথা, ছুঁতেও পারবে বলে মনে হয় না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তবে কি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্রিটিশদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল থেকেও অনেক এগিয়ে?

আওয়ামী লীগ তিন বার ও বিএনপি দুই বার দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭৩ সালে প্রথম এবং পরে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে দুই-তৃতীয়াংশর অনেক বেশি আসনে জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে, বিএনপি ১৯৭৯ এবং ১৯৯৬ সালে দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে। জাতীয় পার্টিও একবার সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে, ১৯৮৮ সালে। দেখা যাচ্ছে, তাদের সব রেকর্ড হয়েছে গত চার দশকে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মধ্যে কেউ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সেই রেকর্ডকে পাকাপোক্ত করবে বলে ধরা যায়।

এবার দেখা যাক ব্রিটেনের দুই প্রধান দলের রেকর্ড। ১৮৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত কনজারভেটিভ পার্টি নির্বাচনে জয়লাভ করে ২০ বারের বেশি সরকার গঠন করেছে। কিন্তু মাত্র একবার সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছিল তারা; সেটাও প্রায় ৮৮ বছর আগে। ১৯৩১ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি ৬১৫ আসনের মধ্যে ৪৭০টি আসনে জয়লাভ করে। সেই প্রথম এবং শেষ। তার পর কেটে গেছে দীর্ঘ অনেক বছর। আর দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ ভাগ্যে জোটেনি। ১৯৩১ সালের পর সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল দলটি ১৯৮৩ সালে; মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে সেবার কনজারভেটিভরা ৬৫০ আসনে মধ্যে ৩৯৭টি আসনে জয় পায়।

অন্যদিকে লেবার পার্টির ভাগ্য যেন আমাদের জাতীয় পার্টির চেয়েও খারাপ! ১১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত দলটির ভাগ্যে দুই-তৃতীয়াংশের শিকে একবারও ছিঁড়েনি। নির্বাচনে জয়লাভ করে দলটি ১০ বার সরকার গঠন করেছে, কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ আসন কখনো পায়নি। ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে দলটি ৬৫৯ আসনের মধ্যে ৪১৯ টি আসনে জয়লাভ করে; ওটাই ছিল লেবারের সবচেয়ে বড় জয়।

দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের রেকর্ড যেমন আছে, তেমনি বাজে, লজ্জাজনক ফলাফলেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের প্রধান দুই দলকে। যেমন, বিএনপি ২০০১ সালে প্রায় ২০০ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে; কিন্তু পরবর্তী ২০০৮ সালের নির্বাচনে পায় মোটে ২৭টি আসন। আওয়ামী লীগকেও এমন ফলাফলের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে দলটি; কিন্তু পরবর্তী ২০০১ সালের নির্বাচনে পায় মাত্র ৬২ আসন। আর জাতীয় পার্টি ১৯৯০ সালে ক্ষমতাচ্যুত হবার পর আর কখনো ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি।

সেই দিক থেকে ব্রিটেনের দল দুটির ভাগ্য ভালো বলা যায়। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় যেমন তারা পায় না তেমনি তাদেরকে কখনো নির্বাচনে অমন ভরাডুবির লজ্জা পেতে হয় না। দুই-তৃতীয়াংশ আসন না পাওয়া এবং ফলাফলে ভরাডুবি না হওয়ার কারণগুলো একে অন্যর সাথে সম্পর্কিত। একই ভাবে আমাদের দেশে দলগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ এবং ফলাফলে ভরাডুবি হওয়ার কারণগুলোও একে অন্যর সাথে সম্পর্কিত।

বিষয়টিকে স্পষ্ট করে এভাবে বলা যায়, একটি দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান। আর অন্যটিতে গণতন্ত্র দুর্বল ও ভঙ্গুর। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে। সংসদ যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করায় সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে না। প্রত্যেক কাজে তাকে সংসদে জবাবদিহি করতে হয়। সংসদ ছাড়াও স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসন বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিচার বিভাগের কারণে সরকার বেপরোয়া আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।

আবার দক্ষ ও পেশাদার আমলাতন্ত্র, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নানা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। এতে করে সরকার যেমন খামখেয়ালী ও প্রতিহিংসামূলক কাজ করতে পারে না, তেমনি সরকারি দলের নেতা কর্মীরা বেপরোয়া আচরণ করতে পারে না। সরকারকে যেমন সীমিত আকারে ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হয়; তেমনি সরকারি দলের নেতা কর্মীদেরকেও আইন কানুন মেনে চলতে হয়। এ কারণে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা অত বেশি অজনপ্রিয় হয় না যে কারণে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুতের পাশাপাশি ফলাফলে ভরাডুবি হবে। এমন ভারসাম্যর জন্য ক্ষমতাসীন দল অনেক নির্বাচনে বিগত নির্বাচনের চেয়ে ভালো ফল করেছে। টানা দুই বা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাও সেখানে স্বাভাবিক ঘটনা।

আবার একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীদলের কর্মকাণ্ডও জনগণ বিচার বিশ্লেষণ করে। সংসদে সরকারকে জবাবদিহি করতে তাদের ভূমিকা, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের অবস্থান বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা কমা এবং বাড়াতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। শুধু সরকারি দলের উপর অতিষ্ঠ হয়ে জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাবে এমন আশা করে বিরোধী দল বসে থাকতে পারে না। সরকারের কিছু ভুল পদক্ষেপ এবং নিজেদের কাজের মাধ্যমে বিরোধী দলকে জনগণের মন জয় করে ক্ষমতায় ফিরতে হয়। শুধু সরকারবিরোধী নেতিবাচক ভোটে কাজ হয় না।

গত একশ বছরে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করলে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশের উল্লেখিত চিত্র পাওয়া যায়। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফলও তাই বলে। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ ২০১০ সাল থেকে ক্ষমতায়। এই নির্বাচনে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। তবে ২০১৫ সালের থেকে এবার ১২টি আসন কম পেয়ে ৩১৮টি আসন পেয়েছে। অন্য দিকে বিরোধী দল লেবার ২০১৫ সালের চেয়ে ২৯টি আসন বেশি পেয়েছে। পার্লামেন্টে এখন তাদের সিট সংখ্যা ২৬১।

অন্যদিকে, একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর গণতন্ত্রের সংসদকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয় না। সংসদ সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ঘাটতি দেখা যায়; সরকার নানা ভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আমলাতন্ত্র, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নানা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারে না; সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। সরকার যেমন খামখেয়ালী ও প্রতিহিংসামূলক কাজ করে, তেমনি সরকারি দলের নেতা কর্মীরাও বেপরোয়া আচরণ করে। সুশাসনের অভাব প্রকট হয়ে উঠে। জনগণের ভেতর ক্ষোভ জন্মায়। নির্বাচনে তার প্রকাশ ঘটে সরকারি দলের ভরাডুবিতে। নেতিবাচক ভোটে বিরোধী দল বিপুল আসনে জয়লাভ করে।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা শুরুর পর বিগত নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে সদ্য বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলের লজ্জাজনক পরাজয় ও বিরোধী দলের বিপুল জয়ের পেছনে দুর্বল ও ভঙ্গুর গণগন্ত্রের চিত্র পাওয়া যায়। আর নির্বাচনকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার যে অপকৌশল অতীতে দেখা গেছে সেটাও আমাদের ভঙ্গুর ও দুর্বল গণতন্ত্রেরই বৈশিষ্ট্য।

ওয়েস্টমিনিস্টার মডেল অব পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির জন্মস্থান যুক্তরাজ্যর সাথে আমাদের তুলনা কতটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন না তুলে আমাদের উচিত গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুবিধা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকার অসুবিধাগুলো বিবেচনা করা। নির্বাচনী গণতন্ত্র চর্চার জন্য সুসংগঠিত ও দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হয় এমন রাজনৈতিক দলের বিকল্প নেই। এক সময় অনেকেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মত আমদের এখানেও দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতেন। আমাদের প্রধান দুই দলকে আরো বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। দল যেন প্রকৃত অর্থেই জনগণের সম্পদে পরিণত হয় সেটা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

উপরোক্ত তুলনামূলক আলোচনা থেকে এই উপসংহারে আসা যায় যে, একটি দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে সকলেই তার সুবিধা পায়। শক্তিশালী গণতন্ত্র কারো জন অমঙ্গল বয়ে আনে না। সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয় পক্ষই গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুবিধা ভোগ করে। আর গণতন্ত্র থাকলে দেশে আইনের শাসন থাকে, জনগণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। জনসেবা করার জন্যই যে রাজনীতি সেটা প্রমাণ করতে হলে গণতন্ত্রের বিকল্প নেই।

Comments

The Daily Star  | English

Personal data up for sale online!

Some government employees are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Centre has found.

6h ago