একজন এমপির প্রত্যাশা উদ্ভট উটের পিঠে চলুক স্বদেশ!

জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপি খোরশেদ আরা হক বৃহস্পতিবার সংসদে যা বলেছেন তা নিজ কানে না শুনলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। আবার নিজ কানে শুনলেও কারো কারো পক্ষে তা বিশ্বাস করা কঠিন।
Jatiya Sangsad
জাতীয় সংসদ। ছবি: ফাইল ফটো

জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপি খোরশেদ আরা হক বৃহস্পতিবার সংসদে যা বলেছেন তা নিজ কানে না শুনলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। আবার নিজ কানে শুনলেও কারো কারো পক্ষে তা বিশ্বাস করা কঠিন। এই সংসদ সদস্য আর নির্বাচন চান না। বিনা নির্বাচনেই শেখ হাসিনাকেই আরো একাধিক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান।

প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান দিলেন তার প্রত্যাশার কথা, “আমরা আর কোনো নির্বাচন চাই না। (শেখ হাসিনা) প্রধানমন্ত্রী আছেন, থাকবেন। আরও পাঁচ-দশ বছর দেশ চালাবেন।”

এমন বিরোধী দল কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। দুনিয়া জুড়ে সংসদে বিরোধী দল নির্বাচনের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকে; কখন নির্বাচন হবে। সরকারের যাবতীয় দোষ-ত্রুটি জনগণের সামনে তুলে ধরে নির্বাচনে সরকারি দলকে ধরাশায়ী করতে চায় বিরোধী দল। জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করে।

কিন্তু সংসদে সংরক্ষিত আসনের এমপি খোরশেদ আরা হক দুনিয়া জুড়ে প্রচলিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির তোয়াক্কা করেন না। তিনি তার পছন্দের কথা সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। তবে তার এই প্রত্যাশায় তার দলের চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেব খুশি হয়েছেন কিনা তা আমরা জানি না।

তবে এরশাদ সাহেবের সন্তুষ্ট না হবার কারণ আছে। কেননা তিনি আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসতে চান। সেই উদ্দেশে তিনি কিছু দিন আগে ৫৮ দলীয় জোট করেছেন; যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট। নিজ দলের এমপি যে ভাষায় কথা বলেছেন তাতে এরশাদ সাহেবের স্বপ্ন পূরণের কোনো পথ খোলা থাকলো না।

বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদও নাখোশ হওয়ার কথা। কেননা, বিরোধী দলীয় নেতাকে বলা হয় “অপেক্ষমাণ প্রধানমন্ত্রী”। প্রধানমন্ত্রী যদি কখনো আস্থা ভোটে হেরে যান, তার সরকারের পতন ঘটে তাহলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের মাধ্যমে নতুন করে সরকার গঠনের জন্য বিরোধী দলের নেতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এমনটা অবশ্য আমাদের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে কখনো ঘটেনি; অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে বলেও মনে হয় না।

তবে খোরশেদ আরা হকের প্রত্যাশায় একদিক থেকে সবার লাভবান হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। নতুন নির্বাচন না হওয়া মানে হল বর্তমান সংসদ আরও পাঁচ-দশ বছর আয়ু পাবে। তাহলে তিনিও এমপি হিসাবে থেকে যেতে পারবেন। তার নেত্রী রওশন এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আর এরশাদ সাহেব মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে থাকবেন।

খোরশেদ আরা হকের প্রত্যাশায় সব চেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল খালেদা জিয়ার বিএনপি। এই দলটি ক্ষমতায় ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। দলটি ভোটের রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে; জনগণের মন জয় করার জন্য ইতোমধ্যে ভিশন-২০৩০ দিয়েছে; ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের জন্য কী কী করবে তার লম্বা তালিকা দিয়েছে।

জাতীয় পার্টির এমপির প্রত্যাশা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরও কল্পনাতীত নিশ্চয়। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। আগামী নির্বাচনে দলটি জয়লাভ করে টানা তিন বার জয়ের হ্যাট্রিক করতে চাইছে। এমন সময় খোরশেদ আরা হকের অমন প্রস্তাব ক্ষমতাসীন দলের নতুন রেকর্ড করার পথে বাধা।

কক্সবাজার থেকে এবারই প্রথম সংসদে আসা খোরশেদ আরা হক এমন প্রত্যাশা কেন করছেন যে নির্বাচন দরকার নেই? যোগাযোগ করা হলে তিনি অবলীলায় তার প্রত্যাশার পক্ষে যুক্তি দেন। তার মতে নির্বাচন মানেই সহিংসতা; প্রাণহানি। “আমরা বুড়ো হয়েছি। আমার বয়স এখন ৭৮। এই বয়সে আর হানাহানি দেখতে চাই না। আমি আমার প্রত্যাশার কথা বলেছি।”

খোরশেদ আরা হক কি অতি সরল মনে নিজের প্রত্যাশার কথা বলেছেন? হানাহানির রাজনীতির বিপক্ষে কথা বলেছেন? কিন্তু সেটা করতে গিয়ে কী সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। হানাহানি বন্ধ করতে না বলে নির্বাচন বন্ধ করার কথা বলেছেন। তার প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে উদ্ভট উটের পিঠে দেশকে তুলে দিতে হবে। কেননা তার প্রত্যাশা অস্বাভাবিকতায় পূর্ণ। গণতন্ত্রের লেশমাত্র থাকলে কোন দেশে এমন প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হতে পারে না। আর এমন প্রত্যাশা জনগণের ভোটের অধিকার অস্বীকার করে; জনগণই যে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক তাও নাকচ হয়ে যায়। একজন জনপ্রতিনিধি এমন প্রত্যাশা করতে পারেন তা আমাদের কল্পনাতীত। এমন প্রত্যাশার মাধ্যমে খোরশেদ আরা হক কি চান উদ্ভট উটের পিঠে চলুক স্বদেশ?

তবে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, খোরশেদ আরা হক কিছু কথা বলেছেন তাতে এত সমালোচনার কি আছে। একজন নাগরিক হিসেবে তার চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা আছে। তার বাক স্বাধীনতা আছে। অধিকন্তু একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি সংসদে অনেক কিছুই বলতেই পারেন; কেননা তিনি সংসদে বক্তব্যর জন্য দায়মুক্তি ভোগ করেন। তার কোনো বক্তব্য নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না; হোক সে বক্তব্য  বেআইনি, কারো জন্য মানহানিকর অথবা আদালত অবমাননাকর। তাহলে তার প্রত্যাশা নিয়েও তো প্রশ্ন তোলা যায় না!

এমন প্রত্যাশা পূরণ কি সম্ভব? ১৯৭৫ সালে একবার সংবিধান সংশোধন করে তখনকার সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ওই নজিরের কথা তিনি উল্লেখ করেননি। তবে এমপিরা চাইলে কি না করতে পারেন! এমন প্রত্যাশা শুধু কি তার একার, নাকি আরো কেউ কেউ এমন প্রত্যাশা করেন?

তবে সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে অমন প্রত্যাশার কথা কেউ বলার আগে তার ভাবা উচিত যে জনগণের দেওয়া করে তার বেতন ভাতা হচ্ছে। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যত সময় বক্তব্য দিচ্ছেন তার জন্য প্রতি মিনিটে ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়; আর সেই টাকার যোগানদাতাও হল জনগণ। তাই জনগণের দেওয়া অর্থে বেতন ভাতা নিয়ে, তাদের অর্থে পরিচালিত সংসদে দাঁড়িয়ে নির্বাচনের বিপক্ষে কথা বলে তাদেরকে ক্ষমতাহীন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা রীতিমতো অন্যায় নয় কি?

Comments

The Daily Star  | English

Cyclone Remal: PDB cuts power production by half

PDB switched off many power plants in the coastal areas as a safety measure due to Cyclone Rema

1h ago