বিচারপতি অপসারণে সংসদের ক্ষমতা ‘ইতিহাসের দুর্ঘটনা’!

গত তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের। কিন্তু ১৭০১ সালে ‘এক্ট অব সেটেলমেন্ট’ এর মাধ্যমে পার্লামেন্ট ওই ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে একবারের জন্য হলেও ওই ক্ষমতা প্রয়োগ হয়েছে বলে রেকর্ড নেই।

গত তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের। কিন্তু ১৭০১ সালে ‘এক্ট অব সেটেলমেন্ট’ এর মাধ্যমে পার্লামেন্ট ওই ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে একবারের জন্য হলেও ওই ক্ষমতা প্রয়োগ হয়েছে বলে রেকর্ড নেই।

আসলে কখনো প্রয়োজনই দেখা দেয়নি। কারণ বিচারপতি নিয়োগের সময় এত বেশি যাচাইবাছাই করা হয় যে, একবার কাউকে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর তাকে অপসারণ করতে হবে তেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি।

তবু কেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এই ক্ষমতা অহেতুক ধরে রেখেছে? এটা স্রেফ মর্যাদার লড়াইয়ে জয়ী হওয়া। এক সময় ইংল্যান্ডে বিচারপতিদের অপসারণ করার ক্ষমতা ছিল শুধু রাজার। সে দেশের পার্লামেন্টের সাথে রাজার দ্বন্দ্বের ইতিহাস কারো অজানা নয়। এমপিদের গ্রেফতার করতে রাজার সেনাবাহিনী পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করার নজির রয়েছে সেখানে। কয়েক জন স্পিকারকে প্রাণ দিতে হয়েছে এমপিদের বাক স্বাধীনতা এবং সংসদের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে। একজন রাজাকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে পার্লামেন্ট।

সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একসময় পার্লামেন্ট জয়লাভ করে এবং অন্য অনেক ক্ষমতার মতো বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতাও তারা রাজার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। এ জন্য বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পার্লামেন্টকে নিজের কাছে নেওয়ার ঘটনাকে ‘ইতিহাসের দুর্ঘটনা’ হিসাবে অভিহিত করা হয়।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় আমাদের হাইকোর্ট যখন বললেন, সংসদের কাছে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ‘ইতিহাসের দুর্ঘটনা’ সেই কথা ছিল ঐতিহাসিক তথ্যর পুনর্ব্যক্তি। কিন্তু সেটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হল না। আমাদের কোনো কোনো মন্ত্রী হাইকোর্টের বিচারপতিদের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন। ইতিহাস জেনে অথবা না জেনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের সমালোচনায় মুখর তারা হতেই পারেন। তবে কেউ মানুক আর না মানুক ইতিহাস বদলে যাবে না।

বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যারা আমাদের জাতীয় সংসদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করতে চান তাদের জন্য কিছু অস্বস্তিকর তথ্য বলি। যে ‘ওয়েস্টমিনিস্টার মডেল অব ডেমোক্রেসি’ অনুসরণ করে সংসদের কাছে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রেখে আমরা গর্বের ঢেকুর তুলতে চাইছি সেই ব্রিটিশদের দ্বারা একসময় শাসিত দেশগুলোতেই এই পদ্ধতি অনুসরণের রেকর্ড জোরালো নয়। কমনওয়েলথভুক্ত ৪৮টি দেশের বিচারক নিয়োগ এবং অপসারণ পদ্ধতি নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১৬টি দেশে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে আছে। বাকি ৩২টি দেশে সংসদকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সে সব দেশে বিচারপতি অপসারণের জন্য ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

কমনওয়েলথ সচিবালয় ২০১৫ সালে গবেষণাটি প্রকাশ করেছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, যেসব দেশের সংসদ বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পেয়েছে সেই সব দেশে বিচারক নিয়োগের জন্য নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত আলাদা কমিশন বা পদ্ধতি গড়ে তোলা হয়েছে। ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশেই দীর্ঘ দিন থেকে ‘জুডিশিয়াল এপয়েন্টমেন্ট কমিশন’ কাজ করছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগের সময়ই তার যোগ্যতা, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, অতীত রেকর্ড সব কিছু পর্যালোচনা করা হয় যেন তাকে কখনো অপসারণের প্রয়োজনই দেখা না দেয়।

কিন্তু আমরা চলছি উল্টো পথে। আমাদের সংবিধান চার দশকের বেশি সময় ধরে বলছে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য আইন করার কথা যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিতর্ক মুক্ত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই আইন করা হয়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর গুরুত্ব না দিয়ে আমরা বিচারপতি অপসারণ পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছি দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই। শুরুতে বিচারপতি অপসারণের জন্য সংসদকে ক্ষমতা দিলাম। কয়েক বছর পার হতে না হতেই সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সব ক্ষমতা দিলাম রাষ্ট্রপতিকে। আবার কয়েক বছর যেতে না যেতে সেটাতেও পরিবর্তন আনলাম। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দিলাম।

দীর্ঘ দিন ধরে সেটাই বহাল রইলো। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হল সেই সংসদ মনে করল বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা তার কাছেই থাকা বাঞ্ছনীয়। তাতে নাকি তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার হয়। সংবিধান সংশোধন করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলুপ্ত করা হল। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়া হল; যেমনটা ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ছিল।

কিন্তু ওই বছরই হাইকোর্ট উক্ত সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করলেন। সরকার হাইকোর্টের রায় মানতে নারাজ, তাই আপিল করা হল। আপিলের শুনানিতে সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল জোরালোভাবে যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, সংসদের মান মর্যাদা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছেই থাকা উচিত।

বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পেলেই কি সংসদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে? সংসদ আরো কার্যকরী হবে এবং দেশের সু-শাসন প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে? এসবের কোনটাই নয়। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ফিরে পেলেই সংসদ যে তার কর্মকাণ্ড ভালোভাবে পালন করতে পারবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেননা এই দুটো বিষয়ের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই। বরং আশঙ্কা করা হয় যে, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদ ফিরে পেলে বিচার বিভাগের উপর সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে। অপসারণের ক্ষমতার প্রয়োগের চেয়ে উচিত বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো বেশি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করা। সৎ ও যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া। সে জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃতে একটা বিচারপতি নিয়োগ কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে যদি বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা যায়, যদি সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায় তাহলে অপসারণের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা কার কাছে থাকলো সেটা মুখ বিষয় হবে না। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা কার কাছে থাকবে না থাকবে সেটা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান দুর্বল গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ; যেটা দেখা গিয়েছিল তিনশ বছর আগের ইংল্যান্ডে। সে সময় ইংল্যান্ডে যে পরিস্থিতি ছিল আমরা নিশ্চয় তেমন অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি না। তাহলে কেন ‘ইতিহাসের দুর্ঘটনায়’ পাওয়া ক্ষমতা ফিরে পেতে আমরা উঠেপড়ে লেগেছি?

Comments

The Daily Star  | English

Cow running amok in a shopping mall: It’s not a ‘moo’ point

Animals in Bangladesh are losing their homes because people are taking over their spaces.

1h ago